Space For Advertisement

সুপ্রিম কোর্টের ১৯ দফা নিদের্শনা, আলোর দিশারী

সুপ্রিম কোর্টের ১৯ দফা নিদের্শনা, আলোর দিশারী

                বিচারক মাজদার হোসেন মামলার আলোকে অবশেষে ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনের সময় জনগণের দীর্ঘদিনের প্রতিক্ষীত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের আংশিক পৃথকীকরণের ফলে দেশের শ্রেণী পেশার মানুষ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের হৃদয় যেমন আনন্দ উল্লাসের বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে, তেমনি ১০/১১/২০১৬ ইং বৃহষ্পতিবার মানসপটে সুপ্রিম কোর্টের ১৯ দফা নির্দেশনা ও একটি অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে পরিগণিত। এই দিনে সুপ্রিম কোর্টে উপেক্ষিত জনগণের দীর্ঘদিনের আশা আকাংঙ্খার প্রতিফলনে ১৯ দফা দিক নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। নির্বাহী থেকে বিচার বিভাগের পৃথকিকরণ যেমন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, তেমনি আইন শৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থা, ম্যাজিষ্ট্রেট, বিচারক ও ট্রাইব্যুনালের ওপর সুপ্রিম কোর্টের ১৯ দফা নির্দেশনা (এঁরফব ষরহব) ও স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য আরেকটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবেই প্রনিধানযোগ্য। যদিও ৫৪ ধারার বিষয়ে ইতোপূর্বে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশনা জারী করলেও তা পুংখানুপুংখভাবে (ঊীবপঁঃব) প্রতিফলিত হয়নি। 

             জানা যায়, ১৯৯৮ সালে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির মেধাবী ছাত্র শামীম রেজা রুবেল কে ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের পর দিন ডিবি কার্যালয়ে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৪ ও ১৬৭ ধারা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট রিট করে। ২০০৩ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে ৫৪ ও ১৬৭ ধারায় কিছু ব্যাপারে সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে থাকে। ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসা বাদে প্রচলিত বিধি ৬ মাসের মধ্যে সংশোধন করতে বলা হয়। একই সঙ্গেঁ ওই ধারা সংশোধনের আগে সরকারকে ১৫ দফা নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল ২৪ মে খারিজ করে দেয় সর্বোচ্চ আদালত। তবে ৫৪ ধারা এবং ১৬৭ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি নির্দেশনা দেয়া হবে বলে জানায় আপীল বিভাগ।   

             সূত্রে জানা যায়, ১০/১১/২০১৬ ইং বৃহষ্পতিবার ১৯ দফা নীতিমালা, নির্দেশনা ও গাইড লাইন সংবলিত ওই রায়ের ৩৯৬ পৃষ্টায় পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি প্রকাশিত হয়। এই রায়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্য রয়েছে ১০ দফা নির্দেশনা এবং ম্যাজিষ্ট্রেট, বিচারক ও ট্রাইব্যুনালের জন্য রয়েছে ৯ দফা। তাছাড়া রয়েছে আরো কিছু দিক নির্দেশনা। রায়ে এসব গাইড 

লাইন বা নির্দেশনা কার্যকরের লক্ষ্যে সব ষ্টেশনকে (আইনশৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থার) অবিলম্বে জানাতে আইজিপিকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। তাছাড়া র‌্যাবের মহাপরিচালকেও (উরৎবপঃড়ৎ এবহবৎধষ) নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তিনি যেন তার ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এই গাইড লাইনটি বা নির্দেশনাটি প্রচার (সার্কুলেট) করেন। অন্যদিকে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের মাঝে নির্দেশনাটি প্রচারের জন্য ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিষ্টার জেনারেলকে (জবমরংঃবৎ এবহবৎধষ) নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে বলে জানা যায়। রায়ে বলা হয়েছে, আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন সদস্য কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর অবিলম্বে একটি মেমোরেন্ডাম তৈরী করবে। ওই কর্মকর্তা মেমোরেন্ডামে অবশ্যই গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর গ্রহণ করবেন। যেখানে তারিখ ও গ্রেফতারের সময় উল্লেখ থাকবে। গ্রেফতারের পর ওই ব্যক্তির নিকট আত্মীয়কে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। নিকট আত্মীয়ের অনুপস্থিতে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির পরামর্শ অনুযায়ী তার কোন বন্ধুকে গ্রেফতারের বিষয়টি জানাতে হবে। তবে যথাসম্ভব দ্রুত সময়ে বিষয়টি জানাতে হবে। কোন অবস্থাতেই ১২ ঘন্টার বেশী সময় দেরি করা যাবেনা। গ্রেফতারের সময় স্থান ও কোথায় আটক করা হয়েছে তাও জানাতে হবে। গ্রেফতারের কারণসহ গ্রেফতারের ঘটনা ডায়েরীতে লিপিবদ্ধ করতে হবে। যার তথ্য বা অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করা হয়েছে তার নাম, ঠিকানাও লিপিবদ্ধ করতে হবে। আটককৃত ব্যক্তির নিকটাত্মীয় বা বন্ধুর কাছে অভিযোগকারীর নাম ও অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের (ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ) ৩ ধারায় আটক রাখার জন্য কোন ব্যক্তিকে ৫৪ ধারায় আটক করা যাবেনা।      

             আইন শৃংখলা বাহিনীর কোন সদস্য কাহাকেও গ্রেফতারের সময় নিজের পরিচয় প্রকাশ করবেন। যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং যারা উপস্থিত থাকেন, তারা দাবী করলে নিজের পরিচয়পত্র দেখাবেন। গ্রেফতারের সময় শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেলে আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর ওই আঘাতের কারণ লিপিবদ্ধ করবেন এবং ওই ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য কাছের হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। ওই চিকিৎসকের কাছ থেকে (গবফরপধষ ঈবৎঃরভরপধঃব) মেডিকেল সার্টিফিকেট সংগ্রহ করবেন। যদি কোন ব্যক্তিকে তার বাসা বা ব্যবসায়িক স্থান থেকে গ্রেফতার করা না হয় তাহলে ওই ব্যক্তিকে থানায় আনার ১২ ঘন্টার মধ্যে তার নিকটাত্মীয়কে লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত করতে হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারা অনুযায়ী যখন কোন ব্যক্তিকে ম্যাজিষ্ট্রেটের সামনে হাজির করা হয় তখন সংশ্লিষ্ট আইনশৃংখলা বাহিনী তার ফরোয়াডিংয়ে (ঋড়ৎৎড়বিৎফরহম) ১৬৭ (১) ধারামতে কারণ বর্ণনা করতে হবে। অনুরূপ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কেস ডায়েওি (ঈধংব উরধৎু) ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে হস্তান্তর করবেন।   

                যদি কোন ব্যক্তিকে কোন আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কার্যবিধির ১৬৭(২) মোতাবেক কেস ডায়েরী ছাড়া উপস্থাপন করেন তবে ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত বা ট্রাইব্যুনাল ওই ব্যক্তিকে ১৬৭ ধারা অনুযায়ী মুক্তি দেবেন। এক্ষেত্রে তার কাছ থেকে একটি বন্ড নিতে হবে। যদি গ্রেফতার থাকা অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে কোনো সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেফতার দেখানোর জন্য কোন কর্মকর্তা আবেদন করেন, সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিকে যদি মামলার ডায়েরী সহ আদালতে হাজির করা না হয় এবং গ্রেফতারের আবেদন যদি দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং যদি ভিত্তিহীন হয় তবে আদালত ওই আবেদন প্রত্যাখ্যান করবেন। গ্রেফতারকৃত কাহাকেও টানা ১৫ দিনের বেশী রিমান্ড দেয়া যাবেনা। যদি ম্যাজিষ্ট্রেটের নিকট সন্তোষজনক মনে হয় এবং কেন ডায়েরীতে বর্ণিত অভিযোগ অথবা তথ্য যদি দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কেস ডায়েরীতে যদি ওই ব্যক্তি আটক রাখার জন্য তথ্য থাকে ম্যাজিষ্ট্রেট ওই ব্যক্তিকে আরো আটক রাখার আদেশ দিতে পারবেন। আইনশৃংখলা বাহিনীর কোন সদস্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কার্যক্রম করেছে এমন মনে হলে ম্যাজিষ্ট্রেট ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দন্ড বিধির ২২০ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবেন।      

                যখন আইনশৃংখলা রক্ষাবাহিনীর কোন কর্মকর্তা কোন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে যখন রিমান্ডে বা তার কাষ্টডিতে নেবেন, তখন তার দায়িত্ব হচ্ছে, নির্ধারিত সময় শেষে তাকে আদালতে হাজির করা। যদি পুলিশ রিপোর্ট বা অন্য কোনভাবে জানা যায় গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি মারা গেছেন, তাহলে ম্যাজিষ্ট্রেট মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে ভিকটিমের শারীরিক পরীক্ষার নির্দেশ 

দেবেন। যদি দেখা যায় যে, ভিকটিমের এরই মধ্যে দাফন হয়ে গেছে সেক্ষেত্রে মৃত দেহ উঠিয়ে মেডিকেল পরীক্ষার নির্দেশ দেবেন। যদি মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টে দেখা যায়, মৃত্যু হত্যাজনিত তবে ম্যাজিষ্ট্রেট হেফাজতে মৃত্যু নিবারন আইন ২০১৩ এর ১৫ ধারা অনুযায়ী ওই কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা ওই কর্মকর্তার যার কাস্টডিতে (ঈঁংঃড়ফু) মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তার বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেবেন। যদি ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে তথ্য থাকে কোনো ব্যক্তি কাষ্টডিতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তবে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী তিনি ভিকটিমকে নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে পাঠাবেন। আর মৃত্যুর ক্ষেত্রে এর কারণ নিশ্চিত করার জন্য মেডিকেল বোর্ডে রেফার করবেন। যদি মেডিকেল রিপোর্টে দেখা যায় আটক ব্যক্তিকে নির্যাতন করা হয়েছে অথবা নির্যাতনের কারণে মৃত্যু হয়েছে এক্ষেত্রে ম্যাজিষ্ট্রেট স্বপ্রণোদিত হয়ে অপরাধ আমলে নেবেন। 

                অনেক সময় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কেহ অজ্ঞাত লোকদের বিরুদ্ধে থানায় সন্দেহ ডাকাতি মামলা রুজু করে থাকলে পরবর্তী সময় যথাযথ বাদীকে অবহিত না করেই থানা পুলিশ সন্দেহবশতঃ ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করে থাকে। আদালতের নির্দেশ মোতাবেক টি আই প্যারেড করা হলে দেখা যায়, বাদী থানা থেকে প্রেরণকৃত সন্ধিগ্ধ আসামীকে সনাক্ত না করার পরও অনেক সময় নিরাপরাধ লোকেরও আইনের মারপ্যাচে জেল পোহাতে হয়। এ ধরণের বিষয়ও স্পর্শকাতর ও অমানবিক বলে অনেকেই মনে করে থাকে। নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার আগে দন্ডবিধির ৩৯৫/৩৯৭ ধারা ও ৭৪ স্পেশাল এ্যাক্টের যাঁতাকলে এ ধরণের মামলায় ভোগান্তির শেষ ছিল না বলে অনেক আইনজ্ঞরা মন্তব্য করে থাকেন। এ নিবন্ধে ১৯৭৪ সালের একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা উল্লেখ করা হলো। সেই সময় পাকুন্দিয়া থানা পুলিশ দন্ডবিধির ৩৯৫/৩৯৭ ধারা ও স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট ৭৪ (ঝঢ়বপরধষ চড়বিৎ অপঃ- ৭৪) সংযুক্ত করে এলাকার ২/৩ জন নিরপরাধী ব্যক্তিকে থানার তালদশী ও দরদরা এলাকার সন্দেহ ডাকাতি মামলায় জেলে পাঠালে দুই মামলার বাদী হিসেবে উল্লেখিত ব্যক্তিদ্বয় তাদেরকে টি আই প্যারেডে সনাক্ত করেনি। তারপরও অনেকদিন তাদের জেলে থাকতে হয়েছে। যদিও তারা বেকসুর খালাস পায়। দেশের আনাচে কানাচে এমন ধরনের অজস্র ঘটনার কথা শুনা যায়। সুপ্রিম কোর্টের ১৯ দফা নির্দেশনা যত দ্রুত বাস্তবায়িত ও প্রতিফলিত হয় ইহাই জন প্রত্যাশা। ২০০৭ সালে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ আংশিক পৃথকীকরণ যেমন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, তেমনি ১০/১১/২০১৬ ইং সুপ্রীম কোর্টের ১৯ দফা নির্দেশনার গাইড লাইনও (এঁরফষরহব) এতদিন যুগান্তকারী মাইল ফলকও বিচার বিভাগের জন্য আলোর দিশারী হিসেবেই প্রনিধানযোগ্য। এ জন্য বলা হয়েছে জ্যুডিশিয়ারী ইজ দা থ্রার্ড র‌্যাদার ব্যাক বোন ইন অ্যানি ষ্ট্রং ডেমোক্রেটিক স্টেইট সিষ্টেম অব সোসাইটি। অর্থাৎ বিচার বিভাগ তৃতীয় স্তম্ভ তথা যে কোন শক্তিশালি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর মেরুদন্ড। কেবল এই মেরুদন্ডই পারে সমাজের সব অংশকে রক্ষা করতে।  

 

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
লেখক কলামিষ্ট
মোবাইল: ০১৭১৮-৮১৪৮১৩।


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor