রাজস্ব ফাঁকির অন্তরালে ভানুমতির খেলা

রাজস্ব ফাঁকির অন্তরালে ভানুমতির খেলা

                আয়কর, আবগারি শুল্ক, ভ্যাট ও আমদানী রপ্তানী শুল্ক ফাঁকি দেয়ার সাথে জড়িত ব্যবসায়ী, প্রতিষ্ঠান, এনবিআরের বিভিন্ন পর্ষদের অসাধু ও নেপথ্যে কুশীলবদের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২১ ডিসেম্বর হতে সারা দেশে সাঁড়াশি অভিযান বা শুদ্ধি অভিযান বা এনফোর্সমেন্ট কর্মসূচী চালাচ্ছে। এনফোর্সমেন্ট কর্মসূচী ২০ জানুয়ারী ২০১৭ ইং একমাস পর্যন্ত চলবে বলে জানা যায়। হাজার হাজার লিমিটেড কোম্পানী প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আসছে। এসব করদাতার শনাক্তকরণ নম্বর বা ই-টিআইএন নম্বর নেই। সূত্রে আরো জানা যায়, যৌথ মুলধন কোম্পানী ও ফার্মস নিবন্ধকের কার্যালয় বা আরজেএসসিতে নিবন্ধিত ১ লাখ ৩৭ হাজার কোম্পানীর মধ্যে ৫২ হাজার কোম্পানীর ই-টিআইএন রয়েছে। মূলতঃ আরজেএসসিতে ই-টিআইএন সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক সুযোগ না থাকার কারণে ৮৫ হাজার কোম্পানী আয়কর প্রতিষ্ঠান সরকারের কোটি কোটি টাকার ফাঁকির ভানুমতির খেলা বা তামাশা করে যাচ্ছে। কর ফাঁকির এ আমলনামা দীর্ঘদিনের। নতুন করে অবাক হওয়ার মতো তেমন কিছু আছে বলে মনে হয়না। এ সমস্ত প্রতিষ্ঠান এমনিভাবে বছরের পর বছর রাজস্ব ফাঁকি দিয়েই চলছে। এসবের সাথে এনবিআরের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কর্মচারী জড়িত থাকার কথা জানা যায়। যে কারণে এনবিআর কিছু দুর্নীতিবাজ ও অসাধু কর্মকর্তাদের বারবার সর্তক (ডধৎৎহরহম) করা সত্ত্বেও এ পথ থেকে ওরা সরে না আসার কারণে অনেকের বিরুদ্ধে নাকি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কারণে দূর্নীতিবাজ ও অসাধু কর্মকর্তাদের শাস্তির পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যাপারে সনাক্ত করণের জন্য এনবিআর দূর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন কমিশন, অডিট বিভাগসহ অন্যান্য সরকারী বিভাগ ও সংস্থার সহযোগীতার ব্যাপারে কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।    

         এনবিআর যথাযথ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে ‘জনকল্যাণ রাজস্ব’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে ৯টি কৌশল ও ৫টি নির্দেশনা ঠিক করেছে তম্মধ্যে রয়েছে- আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট অনু বিভাগের কমিশনারদের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের সর্ব কার্যালয়কে বাজেটের কর প্রস্তাব বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান, বাজেট বাস্তবায়নে সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, চেম্বার ও ঢাকার 
বাইরের বিভিন্ন পর্যায়ের সকল স্তরের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের সাথে এ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা, আগামী অর্থ বছর ১লা জুলাই ২০১৭ ইং নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন বিবেচনায় রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি পরামর্শমূলক সভা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা,  রাজস্ব সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদারে এনবিআর থেকে সব কমিশনারদের কার্যক্রম ও কমিশনারদের পক্ষ থেকে অধীনস্থ কার্যালয়গুলোর কার্যক্রম মনিটরিং। এ সমস্ত পদক্ষেপ ছাড়াও এনবিআরের আরো কিছু ব্যবস্থা গ্রহনের কথা জানা যায়।  

             ৫টি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, (ক) মাঠ পর্যায়ে এনবিআর যথেষ্ট প্রয়াস চালানো সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত অথনৈতিক কর্মকান্ডে নিয়োজিত সব প্রতিষ্টান ও ব্যক্তিকে করের আওতায় আনা যায়নি, (খ) এতদ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন (গ) পাশাপাশি চলতি ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের বাজেটে লক্ষ্য মাত্রার গতিশীলতাও বজায় রাখা প্রয়োজন (ঘ) সেক্ষেত্রে যে সমস্ত বাধা ও প্রতিবন্ধকতা আসবে তা নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যহত রাখতে হবে, (ঙ)  ভ্যাট অনলাইন প্রকল্প, ট্যাক্স অনলাইন প্রকল্প এবং অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম কার্যক্রমকে সফল করতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালাতে হবে। এনবিআর বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে দেশে করদাতার সংখ্যা ২৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান রাজস্ব জিডিপি ৮ দশমিক ৯৮ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ উন্নীতের কথা রয়েছে। অনেকেই মনে করে থাকে এ ধরণের পদক্ষেপ, কৌশল ও নির্দেশনা এনবিআর বহুবার নিলেও তা বাস্তবতার আলোর মুখ দেখেনি। এবারও “জনকল্যাণে রাজস্ব” এনবিআরের এ চিরাচরিত শ্লোগান ও অর্গানোগ্রামের কতটুকু সফল হবে তা যথেষ্ট ভেবে দেখার বিষয়। সরিষায় যদি ভুত থাকে তবে ভুত না তাড়িয়ে শত সহস্র কর্মপরিকল্পনা নিলেও, তাতে আশার চেয়ে নিরাশার আশংকাই বেশী থাকে বলে অনেকেরই ধারণা। একজন মনিষি বলেছেন, ‘ইবঃঃবৎ ষধঃব ঃযধহ হবাবৎ’ কোন কিছু একেবারে না করা অপেক্ষা বিলম্বে করাও শ্রেয়। ঢাকঢোল পিটিয়ে অনেক সময় অনেক কিছুই হয় না। তবে দরকার কান খোলা রেখে চোখ মুখ বন্ধ করে অন্ধের সাদা ছড়ি চালানো। নিবন্ধটি লেখার সময় প্রথিতযশা একজন আইন বিশেষজ্ঞ মন্তব্য করে বলেছেন, আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকির সাথে যেমনি জড়িত এনবিআরের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা, তেমনি জড়িত একশ্রেণীর কর আইনজীবী। দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া একাজটি করা যেমন দুরহ তেমনি কঠিন বটে। তাছাড়া আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ ও লক্ষ্য করলে দেখা যায়, একশ্রেণীর প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী কর ফাঁকি দেয়ার জন্যে প্রতিষ্ঠানের নামের কিছু রদবদল ঘটিয়ে থাকে। মেসার্স ভাগীরথির স্থলে মেসার্স ভাগীরধি এবং মেসার্স পূর্ণ ভান্ডারের স্থলে পূর্ণতা ভান্ডার। এসব কিছু মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এমন উদাহরণের যেন অন্ত নেই। যা ঘুরে ফিরে একই কথা ও ক্যারিশমেটিক। অর্থাৎ কোন না কোন কারণে এনবিআর, কর আইনজীবী এবং প্রতিষ্ঠানের মালিক একই সূত্রে গাঁথা। যাকে বলা যায় মুদ্রার এপিট ওপিঠ।        

             এনবিআর সূত্র যেমন বলেছে, ১ লাখ ৩৭ হাজার বা ৩৮ হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৫২ হাজারের ই-টিআইএন নম্বর আছে এবং ৮৫ হাজার প্রতিষ্ঠানের নেই কিন্তু তাদের সূত্রমতে ৮৫ হাজার কর খেলাপির ব্যাপারে তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহনের উদ্যোগের কথা জানা যায়ীন। অর্থাৎ শিয়ালের বাচ্চা হিসেবে আছে কিন্তু বাস্তবে না থাকার ব্যাপারে গল্পকার কানাই সন্যালের যেমন প্রচলিত গল্প আছে তেমনি এ প্রসঙ্গে প্রবীনদের কাছ থেকে শুনা এক দুটি উদাহরণ হাতছাড়া না করে অপূর্ণ অভিলাষ থেকে যাবে ভেবেই এ নিবন্ধে উল্লেখ করা হলো। প্রথমত এনবিআরের শ্লোগানটি যেমন চমৎকার তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নে মন মাতানো একটি মনোরম শ্লোগান। যে শ্লোগানের পরতে পরতে রয়েছে জাতীয় কল্যাণ, জাতীয় উন্নয়নের প্রবৃদ্ধি অর্জন ও জনকল্যাণের মূলমন্ত্র। অর্থাৎ জনকল্যাণে রাজস্ব এ শ্লোগানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকারই কথা। তারপর ভেবে দেখা হয়নি বাস্তবে জনকল্যাণ শব্দটির পংক্তির মধ্যে কতটুকু কল্যাণ রয়েছে বা নাই। এ নিবন্ধে সেদিকে তাড়িত না হয়ে হয়তোবা অন্য কোন নিবন্ধে জনকল্যাণ নিয়ে সম্মলিত পাঠক পাঠিকাদের নিকট তুলে ধরার ইচ্ছা রয়েছে। এনবিআরের কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে প্রবীনদের নিকট থেকে একটি শুনা গল্প উপস্থাপন করা হলো- 

ময়মনসিংহ বিভাগের মুক্তাগাছার প্রতাপশালী জমিদারের বেশ কয়েকটি পছন্দের গাভী ছিল। এই গাভীগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জমিদার বাবু বেশ কয়েকজনকে অস্থায়ী নিয়োগ করেন। কিন্তু ইতোমধ্যে একেক করে পালের চারটি পছন্দের গাভী এমনভাবে হারিয়ে যায় কোনদিন আর ফিরে আসেনি। এসব দেখে জমিদার বাবু তার বাড়ীর পাহাড়াদারদের মধ্য হতে দুইজন বিশ্বস্থ পাহারাদারকে এ ব্যাপারে তদন্ত করে জানাতে বলেন। কিন্তু জমিদারের এই বিশ্বস্থ দুইজন পাহাড়াদারদের সাথে গাভী রক্ষণাবেক্ষণের সাথে জড়িত সবারই সখ্যতা ছিল। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, আসলে গাভী রক্ষণাবেক্ষণকারীরাই একে অপরের সহযোগীতায় চারটি গাভীকে হারানোর কথা বলে গোপনে বিক্রী করে দিয়েছে। তা জেনে তদন্তে নিয়োজিত দুই পাহারাদর গাভী রক্ষণাবেক্ষণকারীদের সাথে মিলে মিশে গাভী বিক্রীর টাকার ভাগ ভাটোয়ারা পেয়ে খুশী হয়ে এই দোষ ও অপবাদ একজন নির্দোষের উপর চাপিয়ে প্রকৃত দায়ী দোষীদেরকে তদন্ত রিপোর্ট নি®কৃতি করে দেয়।  

                তা জেনে জমিদার বাবু তার বাড়ীর নির্দোষ ব্যক্তিটিকে কঠিন শাস্তি আরোপ করে। জমিদার বাবু তদন্ত রিপোর্টের আলোকে দোষী দায়ী ও গাভী বিক্রীকারী রক্ষণাবেক্ষণকারীদের যেমন পুর®কৃত করে, তেমনি মাসোহারা বৃদ্ধি করে গাভী রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত অস্থায়ী রক্ষণাবেক্ষনকারীদেরকে স্থায়ী করে দেয়। তাই এনবিআরের জনকল্যাণে রাজস্ব শ্লোগানে যদি এমন ধরণের কিছু ঘটে থাকে এবং জমিদার বাড়ীর গাভী রক্ষণাবেক্ষণকারীদের মতো তদন্তে নিয়োজিত পাহারাদারদের মতো ঘটনা ঘটে এবং বেড়ায় ক্ষেত খায়, তবে এনবিআরের ৯টি কৌশল, ৫টি নির্দেশনা ও মাসব্যাপী এনফোর্সমেন্ট কর্মসূচী (ঊহভড়ৎপবসবহঃ ঢ়ৎড়মৎধসব) লোক দেখানো ঢং বৈ অন্য কিছু না হওয়ারই কথা। তাই কথায় বলে (ঊধংু ঃড় ংধু নঁঃ ফরভভরপঁষঃ ঃড় ফড়)  অর্থাৎ বলা সহজ করা কঠিন। এ নিবন্ধে আরেকটি সংযোজন। তা হলো শুনা যায় একটি বেসরকারী জরিপে প্রাথমিকভাবে সারা দেশের অবৈধ বিলাস বহুল আলীশান বাড়ী, ফ্ল্যাট আয়ের সাথে সংগতিহীন, ব্যাংক ব্যালেন্স, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা বাণিজ্য অতি গোপনীয়তার সাথে নাকি পর্যবেক্ষন করে থাকে। তাদের পর্যবেক্ষণে নাকি কর্মরত ও অবসর প্রাপ্ত বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে রাজস্ব বিভাগের বিভিন্ন পর্ষদের কর্মকর্তাদের নামও নাকি খাটো করে দেখার সুযোগ নেই বলে জানা যায়। এনবিআরের এক মাসের এনফোর্সমেন্ট কর্মসূচী (ঊহভড়ৎপবসবহঃ ঢ়ৎড়মৎধসব) বা সাঁড়াশি অভিযান স্বার্থক ও জনকল্যাণে রাজস্ব সামনে এগিয়ে চলুক ইহাই জন প্রত্যাশা। আর যদি এত কিছুর পরও আগামী ২০১৭-১৮ অর্থ বছরে রাজস্ব হার ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি না পায়, আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকি দেয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির তথ্যানুসন্ধ্যানে এনবিআর সফলকাম হতে না পারে এবং এসব প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকার আওতায় না আনা হয় তবে হয়তো কোন বেরসিক গানের সুরের সাথে তাল মিলিয়ে ভাঙ্গা গলায় বলতে পারে, কোকিল ডাকিছ নারে আর আশায় আশায় সময় গেল, আশা পূরণ হল না আর। এনবিআর শুধু জনকল্যাণেই নয়, এনবিআর আশার আলো ও জাতীয় উন্নয়নে অন্যতম উদ্দীপক সহায়ক শক্তি। 

 


এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
লেখক কলামিষ্ট
মোবাইল: ০১৭১৮-৮১৪৮১৩।


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor