Space For Advertisement

বিভিন্ন জোটে অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও ইসির দৃশ্যপট

বিভিন্ন জোটে অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও ইসির দৃশ্যপট

 দেশে নিবন্ধনকৃত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৮টি হলেও, অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অগণিত। তাছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হওয়াতে প্যাড, সাইন বোর্ড এবং অনেক ক্ষেত্রে সাইনবোর্ড বিহীন গায়েবী (unseen) দলের সংখ্যা নির্বাচন কমিশনের নিকট না থাকারই কথা। যদিও এরই মধ্যে অনেক নতুন দল নিবন্ধনের জন্যে নির্বাচন কমিশনে আবেদন করে থাকতে পারে।

          নির্বাচন কমিশন যথারীতি তদারকি ও যাচাই বাছাই করে অনেক দলের সঠিক কার্যালয় এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মোতাবেক সবকিছু যথারীতি ঠিকঠাক না পাওয়াতে এমনিতেই অনেক রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আটকে যায়। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, ইতোপূর্বে রাজনৈতিক দলের হাল হকিকত জানতে গিয়ে অনেক দল যেমনি অস্থিত্ব সংকটে পড়ে, তেমনি অনেক দলের শুধু সাইনবোর্ড পাওয়ার কথা জানা যায় মোদির দোকান, চা দোকান, বাসা বাড়ীর দেয়াল ও ফুটপাতের বিভিন্ন স্থানে। নির্বাচন কমিশনের এমন তথ্য গণমাধ্যমেও একাধিকবার প্রকাশিত হয়ে থাকে। যে কারণে নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলবিহীন অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ব্যানারে কোন প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার এখতিয়ার দেয় নাই। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় মহাজোট, বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট ও সম্প্রতি এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির ৫৮ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোট ও অন্যান্য দলের ব্যানারে ছোট খাট রাজনৈতিক জোট থাকলেও কোনটিতেই নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিত নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই এ সমস্ত জোটে হাতে গোনা নিবন্ধিত দলের সাথে মিশে অনিবন্ধিত দল, মহাজোট, জোট ও জাতীয় জোটে শরিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এরশাদের জাতীয় জোটের ৫৮টি দলের দুটি মাত্র দলের নিবন্ধন রয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মহাজোটের শরিকদের মধ্যে অনেক দলেরই নিবন্ধন নেই। এ ব্যাপারে দেশের সুশীল সমাজ, 

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ অনেকেরই প্রশ্ন থেকে যায় যে সমস্ত দল নিবন্ধন ব্যতিত কোন প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার বৈধ অধিকার হারিয়েছে তারা কি করেই বা দেশের রাজনৈতিক দলের জোট, মহাজোটের শরিক হয়। 

             যদি প্যাড ও সাইনবোর্ড সর্বস্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে সাইনবোর্ড বিহীন গায়েবী দল হিসেবে পরিচিত এ সমস্ত দল যদি জোট, মহাজোট ও ৫৮ দলের জোটে থাকতে পারে তবে তাদের দলীয় নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তাই বা কতটুকু হতে পারে। আর নির্বাচন কমিশন যদি তাদের নিবন্ধনের কাইটেরিয়া পুংখানুপুংখভাবে রক্ষা করতে চায়। তবে যে কোন জোটে তাদেরকে সম্পৃক্ত না করার ব্যাপারে কি কোন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে না? যদিও নির্বাচন কমিশনকেও বিভিন্ন জোটে সম্পৃক্ত অনিবন্ধিত দলের নেতাদের সাথেও অনেক সময় সংলাপ করতে দেখা যায়। যা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে নিবন্ধিত জোট নেতাদের সাথে অনিবন্ধিত সাইনবোর্ড সর্বস্বদেরও দেশ বিদেশের মানুষের কম নজর কেড়েনি। 

             জানা যায়, প্যাড, সাইনবোর্ড সর্বস্ব ও গণমাধ্যমে নতুন সংযোজিত গায়েবী দলের সংখ্যা কমানোর জন্যই নাকি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের সূচনা হয়। অনেকে মনে করে থাকে যদি এই থিমকে এগিয়ে নেয়ার জন্য নিবন্ধনের প্রয়োজনীয়তা হয় তবে অনিবন্ধিনকৃত (unregistered)  দলগুলো জোটের শরিক হবেই বা কিভাবে? দেশে যখন ৭৩, ৭৯, ৮৬, ৮৮, ৯১, ৯৬ সালে অনিবন্ধিত দল নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তখন দেশের সুশীল সমাজ থেকে শ্রেণী পেশার মানুষসহ কেহই নিবন্ধন ও অনিবন্ধনের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তোলেনি। যেহেতু এ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন থেকে দেশের ৩৮টি রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেয়া হয়েছে, সেহেতু অনিবন্ধনকৃত রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন জোটে শরিক হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে যেমন নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তেমনি নির্বাচন কমিশনের এ ব্যাপারে যেমনি ভেবে দেখা দরকার তেমনি দেশের মানুষও এর ধারণা (concept) সুস্পষ্টভাবে তোলে ধরার প্রয়োজনীয়তা মনে করে থাকে। যদি এসবের কোন কিছুই করা না হয়, তবে ভবিষ্যতে ১৪, ২০, ৫৮ দলের জোট নয় ১৫৮ দলের জোট করা হলেও কাহাকেও কোন কিছু বলার অধিকার নির্বাচন কমিশন রাখেনি। এর জন্যই হয়তোবা ত্রিশংকু জাতীয় পার্টির (বিজেপি, জেপি, জাপা) একাংশের চেয়ারম্যান এইচ.এম এরশাদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ৫৮ দলের সম্মিলিত জাতীয় জোট (ইউএনএ) আরো দল নিয়ে সম্প্রসারিত করা হবে। এতে একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ও প্রথিতযশা সাংবাদিক বলেছেন, এইচ.এম এরশাদ যদি তিনশত বা ততোধিক দল নিয়ে সম্মিলিত জাতীয় জোট সম্প্রসারিত করেন এবং ১৪ দলীয় মহাজোট ও ২০ দলীয় জোট যদি আরো নতুন দল নিয়ে সম্প্রসারিত করা হয় তবে তাতে বলার যেমন কোন কিছুর উপাখ্যান অনুপস্থিত, তেমনি নতুন করে অন্য কোন ডিগবাজিকর যদি দলের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান হওয়ার জন্য ৫০০ বা আরো বেশী দলের সমন্বয়ে বিশাল জোট গঠন করে থাকে, তবে তাতে বিস্ময় প্রকাশ ছাড়া তাতেও বলার কিছু আছে বলে মনে হয় না।

          দেশে সাধারণ নির্বাচন (জাতীয় সংসদ নির্বাচন) আমলে প্রায় সময় লক্ষ্য করলে দেখা যায়, কিছু কিছু রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দলের প্রার্থী খোঁজে থাকে। রাজনৈতিক দলের ঠিকানা, মোবাইল ও কোন নম্বর দিয়ে প্রার্থীদের যোগাযোগ করতে বলা হয়। এনিয়ে দেশের অনেকেই যেমন হাসা হাসি করে তেমনি বিদেশের লোকজনও কম হাঁসি তামাশা করেনি। এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ না দিলেই নয়। বেশ কয়েক বছর আগে প্রবাসী আত্মীয়ের আমন্ত্রণে থাইল্যান্ড বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে এক অনুষ্ঠানে জনৈক বিদেশী প্রশ্ন রেখে বললেন, আপনাদের দেশে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার জন্য প্রার্থী খোঁজা হয় কেন? এ প্রশ্নের সুষ্পষ্ট উত্তর না দিয়ে বলেছিলাম, এটা আমাদের দেশের ট্রেডিশান (tradition)  তাতে বিদেশী ভদ্রলোক সন্তুষ্ট না হয়ে আরো প্রশ্ন করলে আমি ও প্রবাসী বন্ধু 

তা এড়িয়ে যেতে চাইলে, তিনি (বিদেশী) মন্তব্য করে বলেছিলেন, ইহা কোন ধরণের কালচার বা ট্রেডিশান (culture or tradition) হতে পারেনি। যা সম্পূর্ণ ভুল তথ্যের ওপরই নির্ভর (absolute wrong) অ্যাবসলিউট রঙ। দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ও নির্বাচন একই সূতায় গাঁথা একটি ফুলের মালার মতো। দেশের রাজনীতিতে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত এটি নির্বাচন কমিশনেরই একটি অর্গানোগ্রাম। গণতন্ত্রের সাথে যেমন অন্য কোন তন্ত্র না মিশে গিয়ে পানিতে সরিষার তৈলের মতো ভাসমান থাকে, তেমনি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত দুটি ধারা একই ধরণের। দেশের এতগুলো দলের মধ্যে নির্বাচন কমিশন যেহেতু নিবন্ধিত দলকে চিহ্নিত করে সেহেতু নিবন্ধিত ও অনবিন্ধিত ইস্যুটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে।

          এ নিবন্ধ লেখাটির সময় বাল্য বন্ধু মরমী শিল্পী শৈলেন একটি বাহারী কার্ডে তার জন্ম দিবসের একটি নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে হাজির। শৈলেনকে তার একটি গান শোনানোর জন্য আবদার করলে শৈলেন তার চিরাচরিত অভ্যাস অনুসারে “সাগর কুলের নাইয়ারে মাঝি কোথায় চলছ বাইয়া” এ গানটি শুরু করে দেয়। এ লেখা এবং শৈলেনের গানের কলির মাঝে অবিকল মিল ভেবে বলেছিলাম বন্ধুবর শৈলেন তুমি যে গানের কলিটি এখন শোনালে তার সাথে দেশের বর্তমান রাজনীতিরও মিল রয়েছে। অর্থাৎ কে কোন দিকে কুল কিনারা বিহীন অসীম সাগরের মাঝির মতো যেমন চলছে তার তরীর যেমন ঠিকানা নেই, তেমনি এদেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, বিচার, শাসন, প্রশাসনের অবস্থাটাও প্রায় অনেকাংশে একই রকম। দেশের বিভিন্ন জোটের আদলে যেমনিভাবে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সাথে অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো মিলিত হয়ে একই মঞ্চে নাটক করছে, তা যেমনি বেমানান তেমনি সমালোচনার বিষয়ও বটে। দেশে যদি নির্বাচন কমিশনের নিয়মনীতির আদলে অগনিত রাজনৈতিক দলের অভ্যুদয় ঘটে তাতে সমালোচনার কিছু না থাকলেও নির্বাচন কমিশনের বহির্ভূত অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ছড়াছড়ি যেমনি বেমানান তেমনি নির্বাচন কমিশন ও জোটের জন্য প্রশ্নের পর প্রশ্ন। অনেকেই মনে করে থাকে যদি এ প্রশ্নের সুরাহা না হয় তবে নতুন নতুন রাজনৈতিক দলের ঘোষনা দিয়ে ৭৩, ৭৯, ৮৬, ৯১ ও ৯৬ এর মতো দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার ভাবনাতে দোষেরই কী থাকতে পারে। হতে পারে ওয়ান ম্যান ওয়ান পার্টি। আর যদি এমনিভাবেই চলে, তবে বাল্যবন্ধু মরমী শিল্পি শৈলেনের কন্ঠের সাথে কেহ সুর মিলিয়ে একসাথে বলতে পারে “সাগর কুলের নাইয়ারে মাঝি কোথায় চলছ বাইয়া”। তবে তাতে শৈলেনের দোষই বা কোথায়? নির্বাচন কমিশন যদি তাদের বিধি বিধান পালন না করে শুধু শুধু নতুন দলের রেজিষ্ট্রেশনের (registration)) দিকে থাকায় তবে আজ হোক, কাল হোক রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন থেকে বঞ্চিতরা বলতে পারে নিবন্ধনহীন রাজনৈতিক দল নিয়ে যদি বিভিন্ন জোট হতে পারে তবে দলের নিবন্ধন না পেয়ে প্রতীক নিয়ে আমাদের নির্বাচন করতে অসুবিধা কোথায়? যা ভেবে দেখা দরকার। 

এ.কে.এম শামছুল হক রেনু
লেখক কলামিষ্ট
মোবাইল: ০১৭১৮-৮১৪৮১৩।

 


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor