Space For Advertisement

যানজট কমার সম্ভাবনা

যানজট কমার সম্ভাবনা

মাসুদ আহমেদ : প্রায় প্রতিদিনই দেশের সবচেয়ে বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র বলছে যে, গতকালের যানজট ছিল নজীববিহীন। তার অর্থ এর আগের দিনের রিপোর্টকৃত যানজটের ঘনত্ব ছিল পরবর্তী দিনের চেয়ে কিছুটা হলেও কম। আবার কোন কোন দিন আমরা দেখতে পাই ওই একই সংবাদপত্রে যে, যানজটে ঢাকা স্থবির কিংবা উপচে পড়া ভিড়ে জনজীবন অচল। এর কারণগুলো সম্পর্কে সাধারণত বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে রিপোর্টারগণ বা লেখকগণ দায়ী করেন, যেমন সিটি কর্পোরেশন এই সময় রাস্তা খোড়াখুঁড়ি না করলে পারতো, গ্যাস পাইপ লাইন এই সময়ে স্থাপন না করলে চলতো, বিভিন্ন ভিআইপিরা এভাবে রাস্তা ব্যবহার না করলে পারতেন, পদ পথে এত বাজার স্থাপন এবং রাস্তায় পথচারীদের হাঁটা রোধ করলে এত যানজট হতো না। এর বাইরে এবং আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে যা বলা হয় তা হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ খুব দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে মনোযোগী নয়, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং ট্রাফিক আইন মানার দিকে গাড়ি চালকদের উল্লেখযোগ্য অনীহা। এই সবগুলোকে যদি সত্যি বলেও ধরি তারপরও একটি কথা প্রণিধানযোগ্য। তা হলোÑআজকের যানজটটি নজিরবিহীন। এর কারণ কি ? আজ এবং প্রতিদিন প্রায় চারশতটি করে নতুন গাড়ি চলমান বহরের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছে। আরও হচ্ছে মোটরসাইকেল, ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহন। তৈরি হচ্ছে অন্তত কয়েকটি নতুন ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট। প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক, বিপণীবিতান এবং বিনোদন কেন্দ্র। সর্বোপরি ঢাকায় প্রবেশ করছেন প্রতিদিন অন্তত আড়াই হাজার মানুষ। তাহলে গত কালের অবস্থাটি ছিল যেখানে নজিরবিহীন অচল স্থবির এবং দম আটকানো সেখানে প্রতিদিন এই প্রবৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক অবস্থাটি হচ্ছে নিশ্চয়ই আরও কঠিন। এমনিতে শুধু ঢাকা শহর নয় সারা দেশে বছরে ২২ লাখ মানুষ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে প্রতিদিন ছয় হাজার সাতাশ জন মানুষ বাড়ছে। ফলে একটি অংশ (আড়াই হাজার) ব্যবহারকারী শহরের লভ্য রাস্তাঘাট, ফুটপাত এবং অন্যান্য স্থান এর উপর চাপ বৃদ্ধি করছেন। তারা যানবাহন ব্যবহার করছেন। ফলে রাস্তাঘাটের ও পার্কি প্লেসের সম্প্রসারণ তো দূরের কথা তা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
এদিকে নানাবিধ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ফলে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। বিজ্ঞান সম্মতভাবে গাছপালা, জলাশয়, পার্ক ইত্যাদি সংরক্ষিত রেখে রাস্তাঘাট সম্প্রসারণের আর কোন সুযোগ নেই। ফ্লাইওভার, ওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ইত্যাদির যে প্রবৃদ্ধি এবং এগুলো তৈরির আমাদের যে সক্ষমতা তা জনসংখ্যা এবং যানবাহনের প্রবৃদ্ধির চেয়ে অনেক কম। এর ফল হচ্ছে নিত্য যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পাবে। রাস্তার গুণগতমানও যান চলাচলের গতির ক্ষেত্রে একটি প্রতিবন্ধকতা। উন্নতমানের রাস্তা হলে দ্রুত গতিতে যানবাহন পার হতে পারতো। কিন্তু সংস্কৃতির কারণে অসংখ্য এবং জটিল স্পিড ব্রেকার, খানাখন্দক, ভাঙা চোরা ইত্যাদি যানবাহনের গতিকে স্থিমিত করে দিচ্ছে। এ ছাড়া পরিবহনের ফলে রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে অনেক দ্রুতগতিতে। এটি যে ফ্রিকোয়েন্সিতে মেরামত করা প্রয়োজন সেই ফ্রিকোয়েন্সিতে মেরামত করার সামর্থ কর্তৃপক্ষের নেই। প্রাণপণ চেষ্টার পর তবু রাস্তার চলমানতা রয়েছে। তাতে তার গতি আশাপ্রদ নয়। আনফিট যানবাহন, অদক্ষ চালক, অসচেতন পথচারী ইত্যাদির সংখ্যাও একই কারণে বাড়তে থাকবে। এই অবস্থায় যানজট নিরসন তো দূরের কথা এটি বাড়তে থাকবে। কারণ বর্ধিত ব্যবহার করার জন্যে বর্ধিত যানবাহন এর প্রয়োজন হবেই। উন্নত দেশে মাথা প্রতি গাড়ির সংখ্যা কোথাও কোথাও এমনকি চারটি পর্যন্ত। আমাদের এখানে এই সংখ্যা ০.০৩টি মাত্র। প্রত্যেক বস্তু বা ব্যক্তির একটি সর্বোচ্চ বহন ক্ষমতা আছে। যা অতিক্রম করলে তা ক্রমশ জীর্ণশীর্ণ এবং এক সময় ভেঙে পড়তে বাধ্য। কাজেই সামগ্রিক বিবেচনায় যানজট দূর করতে হলে চলমান সমস্ত কর্মতৎপরতার বাইরেও যা করতে হবে এবং অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তা হচ্ছে ক্রমশ রাস্তা ও যানবাহন ব্যবহারকারীর সংখ্যা হ্রাসকরণ। এ ছাড়া যানজট সমস্যার সমাধান এক অলিক কল্পনাই হিসেবে থেকে যাবে।
লেখক-বাংলাদেশের কম্পট্রোলার এন্ড অডিটর জেনারেল, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সঙ্গীতশিল্পী ও ছোট গল্পকার।

 


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor