Space For Advertisement

প্রশ্নফাঁসের মহোৎসবে প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষার মান

প্রশ্নফাঁসের মহোৎসবে প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষার মান

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৮ নভেম্বর ২০১৭ (স্টাফ রিপোর্টার) :  শুরুতে একটি আপ্তবাক্য বলে নিইÑ চাণক্য মহোদয় বলেছেন, ‘ফাঁকির পুষ্টি বাকিতে যায়।’ মানে হলো এইÑ যারা বিনাকষ্টে শর্টকাটে কার্যোদ্ধার করতে চায়, তারা কখনো খুব একটা সুফল পায় না। মুদিকে ঠকিয়ে বাকিতে বাজার করলে শরীর এতে পুষ্টি পায় না, দিনকে দিন ক্ষয়াটে হতে হতে হাড় জিরজিরে হয়ে যায়। আমাদের চলমান পরীক্ষা পদ্ধতি ও কিয়দাংশে শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা অনেকটা তেমনই। দৃশ্যত ফল ভালো হচ্ছে। দেদার গোল্ডেন প্লাটিনাম হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যার্থীদের এতে মাথা খুলছে না। এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে এমন একজনের কাছে জানতে চাওয়া হলোÑ বলো তো বাবা, ‘আমার একটি পোষা বিড়াল আছে। তাকে আমি খাওয়াই’ ইংরেজিটা কী হবে? সে বলল, ‘আই অ্যাম অ্যা প্যাট (পেট নয়) ক্যাট অ্যান্ড আই ইট মাই ক্যাট।’ মানে, সে নিজে বিড়াল এবং সে বিড়াল খায়। হতে পারে এখানে কিঞ্চিৎ অতিশয়োক্তি আছে। তবে বিদ্যমান পরিস্থিতি খুব একটা যে উন্নত নয়Ñ এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

অস্বীকার করব না, টুকটাক নকল আমাদের সময়েও ছিল। কারণ তখন মুড়ি-মুড়কির মতো প্রশ্ন ফাঁস হতো না। দুষ্টু ছেলেমেয়ে ভাই-ভাতিজার মাধ্যমে পরীক্ষা শুরুর পর ওই প্রশ্নের কিছু সমাধান বের করে কোনোভাবে পরীক্ষার হলে সাপ্লাই দিত। কিন্তু পরীক্ষার আগেই তামাম প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের হাতে এসে যাওয়া বা স্বয়ং শিক্ষকের নিজ দায়িত্বে প্রশ্নোত্তর সরবরাহ করাÑ এমন আনাচার আগে ছিল না। এমন চিত্র বিচিত্র নয় যে, পরীক্ষার আগে অনেকেই এখন পেঁচার মতো রাতের অন্ধকারে হাতে টাকা নিয়ে প্রশ্নফাঁসের পেছনে ছোটে। রাত জেগে ওইসব প্রশ্ন ঘেঁটে উত্তর বানায়। বই পড়ার প্রতি তাদের আদৌ কোনো আগ্রহ নেই। শুধু শিক্ষার্থী নয়, কতিপয় অভিভাবকও ছেলেমেয়ের ভালো রেজাল্টের বিষয়ে এতটাই মরিয়া যে, তারাও শিক্ষার্থীকে ফাঁসকৃত প্রশ্ন কিনতে বাজারে পাঠান। ফলে যা হয় আর কী!
শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের দিকে নজর না দিয়ে বাঁকাপথে সার্টিফিকেট বাগাতে ব্যস্ত। অতঃপর তারা বিড়াল খায়! আর অভিভাবকরা ছেলেমেয়ের বিরল কীর্তিতে বগল বাজাতে শুরু করেন। তারা ধরেই নেন যে, প্রশ্নফাঁসের মধ্য দিয়ে অভাবিত সাফল্যধারী ছেলে তার জজ-ব্যারিস্টার না হয়ে যায় না, চাই কীÑ বরাত জোরে আইনস্টাইনও হতে পারে।
ওইসব ফাঁসুড়ের দৃশ্যমান তেমন কোনো বিচার হয় না। ফলে তারা মুফতে টাকা কামাতে সদা ব্যস্ত থাকে। ধরা পড়লে দুই দিনে জামিন পেয়ে যায়। কারণ তাদের টাকার জোর আছে। বলা বাহুল্য, এই জমানায় যুক্তি বা সত্যের জোরের চেয়ে টাকার জোর ঢের বেশি। শুধু প্রতিযোগিতামূলক একাডেমিক পরীক্ষা নয়, ব্যাংকসহ বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাতেও এখন দেদার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ জেগে ঘুমায় অর্থাৎ ফাঁসের ঘটনা জেনেও অস্বীকার করে। এতে শেষ রক্ষা খুব একটা হয় না। কারণ মিডিয়া এ ব্যাপারে সদা জাগ্রত। সময়মতো প্রমাণসহ জনসমক্ষে সব হাজির করে।
প্রশ্নফাঁসের কারণ নিয়ে টক শোতে বিস্তর আলোচনা হয়। নানাবিধ প্রেসক্রিপশনও আসে। এতে শর্টকাট মারার ধান্ধা বদলায় না। বিপাকে পড়ে মূলত ওইসব নীতিবান ভালো ছেলেমেয়েÑ যারা এখনো টুকলি মেরে পাস করার মতো বিবেকবিবর্জিত কাজে অভ্যস্ত হয়নি। ফলে এক রকম অসম প্রতিযোগিতা বিরাজ করে। কেউ পড়ে মোটামুটি ফল পায় আর কেউ না পড়েই প্রশ্নফাঁসের সুযোগ নিয়ে মহাভালো ফল অর্জন করে। কেউ কেউ বলেন, এসব টুকলি করে পাসে লাভ কী! চাকরি তো পাবে না। কেন পাবে না শুনি! এখন তো নিয়োগ পরীক্ষাতেও প্রশ্ন ফাঁস হয়। আরা যারা ওই কাজে অভ্যস্ত, বরাবরই তারা ব্যাকডোরের খোঁজখবর রাখে। কাকে দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করানো যায়, তাও তারা আগেভাগে জেনে নেয়। ফলে চাকরিও তাদের হয়Ñ যারা নীতি-নৈতিকতার ধার ধারে না, ব্যাকডোরে কাজ সারে।
বলা যায়, এ এক রকম দুষ্টচক্র। ওই চক্রব্যুহ ভেদ করে বেরিয়ে আসা কার্যত খুব কঠিন। কর্তাব্যক্তিরা হা-পিত্যেশ করছেন ঠিকই কিন্তু এতে পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই। বরং প্রশ্নফাঁসের জাঁতাকলে পড়ে মেধাবী ও পরিশ্রমী ছেলেমেয়েরা ক্রমেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। তাদের মা-বাবাও হতাশার সাগরে নিমজ্জিত হচ্ছেন। এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে জাতি একটি চৌর্যবৃত্তিপ্রবণ অনৈতিক পেশাজীবী শ্রেণি উপঢৌকন পাচ্ছেÑ যারা রাষ্ট্রের উপকারে লাগা দূরে থাক, মহাসর্বনাশ করছে বলে ধারণা করি।
শিক্ষার মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। কারণ এমন অবান্তর ও অসঙ্গত প্রশ্ন তোলা বেয়াকুবির নামান্তর মাত্র। প্রশ্নফাঁস নিয়ে কোনো প্রশ্ন নয়, এতে সোনার ছেলেরা ভবিষ্যতে অন্ধকার দেখবে। আমরা বেশি বেশি গোল্ডেন জিপিএ চাই। সোজা বা বাঁকাÑ পথ যাই হোক, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই/আমার সোনার হরিণ চাই।’ সরকারের এক নিয়োগ পরীক্ষায় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। ভদ্রলোক দেখতে-শুনতে খুব ভালো। তিনি আবার ডবল এমএ। নিছক কৌতুকের ছলে একজন জানতে চাইলেন, বলেন তো গ্র্যাজুয়েশন বানান কী? বিশ^াস করতে কষ্ট হয়, তিনি বারকয়েক ডাঙায় তোলা মাছের মতো অকারণ ঢোক গিলে বেশ কয়েকবার তো তো করে তুতলে শেষে যা বললেন, এতে আমার সন্দেহ হয় আদতেই গ্র্যাজুয়েশনটা পাস করেছেন কিনা!
তারপরও বলি, প্রশ্নফাঁস নিয়ে কোনো প্রশ্ন নয়। কারণ তারা জাতির ভবিষ্যৎ। একশ্রেণির লোক ওই ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থেকে তাদের রুটি-রুজির নিশ্চয়তা পাচ্ছে। আমার অবশ্য একটি ছোট্ট প্রশ্ন আছেÑ যেসব অভিভাবক এসব কাজে ছেলেমেয়েকে মদদ দিচ্ছেন, তারা আসলে কী চান! সার্টিফিকেট, যেনতেন প্রকারে চোরাইপথে একটি চাকরিÑ নাকি একজন বিবেকবান মানুষ! তর্কবাজ কেউ হয়তো বলবেনÑ ভাইসাব, দেশে কোন কাজটি ঠিকঠাক হচ্ছে, শুনি! দুর্নীতি নেই কোথায়? এই তো বিপদে ফেললেন। আপনার সঙ্গে দ্বিমত করি কী করে! আমি তো কালা বা বোবা নই। কিন্তু গোড়াতেই গলদ না করে চলছে না বুঝি! ছেলেকে একটু সুবুদ্ধি দিন। আপনি শুরুতেই বিষবৃক্ষটি পুঁতে দিলে বড় হয়ে সে বিষফলই উপহার দেবে, তাই না?
আমরা আমজনতা এই প্রশ্নফাঁসের অভিশাপ থেকে মুক্তি চাই। আমার প্রত্যাশা করি, ছেলেমেয়ে বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হোক। এ ক্ষেত্রে সবার আগে দরকার জনসচেতনতা। শুঁড়ি তার ব্যক্তিস্বার্থে মদের পেয়ালা নিয়ে বেসাতি করবেই। কিন্তু আপনাকে বুঝতে হবে মদ্যপ হওয়াটা কোনো কাজের কাজ নয়। এতে আপনার বোধ-বুদ্ধি সব লোপ পাবে। যেসব অভিভাবক ও ছেলেমেয়ে এসব বাঁকাপথ ধরছেন, তাদের বলিÑ একটু চোখ-কান খুলে সম্মুখপানে তাকান। একটু ভেবে দেখুন, বাঁকারাস্তায় গিয়ে শেষ রক্ষা হবে তো! দেশ থেকে আইন-আদালত উঠে যায়নি। কারো কারো পাপের শাস্তি হচ্ছে। মান-ইজ্জতের ভয় থাকলে
সময়ে সজাগ হোন, না হলে শুধু আপনি একা নন- দেশ উচ্ছন্নে যাবে। নকলবাজ দিয়ে আর যাই হোক, দেশের উন্নতি হয় না।
অরুণ কুমার বিশ্বাস: কথাসাহিত্যিক ও প্রথম সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড

-সূত্র : আমাদের সময় 


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor