Space For Advertisement

ব্রহ্মপুত্র নদের কাওনায় বেড়ী বাঁধ ও স্বপ্নিল নরসুন্দার ব্যর্থ প্রত্যাশা

ব্রহ্মপুত্র নদের কাওনায় বেড়ী বাঁধ ও স্বপ্নিল নরসুন্দার ব্যর্থ প্রত্যাশা

                 হিমালয়ের মানস সরোবর থেকে বয়ে আসা ব্রহ্মপুত্র নদ কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর ও মির্জাপুরের উপর দিয়ে অবশেষে ভৈরব বাজারের নিকট মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। অনাধিকাল থেকেই ব্রহ্মপুত্র নদ যেমনি স্মরণীয় তেমনি কিশোরগঞ্জ শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী হিসেবে নরসুন্দাও অনাধিককাল থেকেই ঐতিহ্য মন্ডিত ও ইতিহাসের ধারক বাহক। এই নরসুন্দার উপর দিয়েই বীর ঈশাখাঁ জঙ্গলবাড়ীর রাজধানী থেকে ইতিহাস খ্যাত পাকুন্দিয়ার এগারসিন্ধুর দুর্গ হয়ে সোনারগাঁওয়ের রাজধানীতে পাল তোলা স্বপ্নিল নৌকা যুগে যাতায়াত করতেন।

                  ব্রহ্মপুত্র নদের কাওনায় অপরিকল্পিত বেড়ী বাঁধ দেয়ার ফলে শাখা নদীগুলোর দু’কূলের মানুষ যেমনি দুর্দশায় নিপতিত তেমনি কিশোরগঞ্জ শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বপ্নিল নরসুন্দাকে দৃষ্টিনন্দনের ব্যাপারে রয়েছে সীমাহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, বেরসিক পরিকল্পনা। যা নাগরিকদের মনে নানা প্রশ্ন ও বিষাদের সমূহ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া আজকাল চায়ের টেবিল, অফিস আদালতসহ সর্বত্র নিয়মিত গল্পের খোড়াক হিসেবে দেখা দিয়েছে। মানুষ যা আশা করে ছিল তা হয়নি বলেই এতসব গুঞ্জন। আর যদি ব্রহ্মপুত্রের বেড়ীবাঁধে নদীর পাড়ের মানুষ ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে প্রবাহিত নরসুন্দার দুপাড়ের মানুষ উপকৃত হত সকলের মুখেই গুঞ্জরিত হত গল্প, কবিতা, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি ও পল্লীগীতির মেঠো সুর। অনেকেই মনের আনন্দে গাইতো “নাইয়ারে নায়ে বাদাম তুইলা, কোন দুরে যাও চইল্যা”। আর তাতে যুক্ত হত আউল, বাউল ও জারিগানের হরেক সুর। তাতে কৃষাণ, কৃষানিরাও ধরে রাখতে পারতোনা তাদের মনের অনাবিল আনন্দের নবান্নের গীত।

                  স্বপ্নিল নরসুন্দা উন্নয়নের ব্যাপারে কিশোরগঞ্জের নুরসুন্দা পাড়ের বিশিষ্ট ইলেক্ট্রনিক্স ব্যবসায়ী মোঃ হুমায়ুন কবীর আক্ষেপ করে জানালেন, শুনেছি স্বপ্নিল নরসুন্দার হাতীর গল্প এখন দেখছি হাতীতো দূরের কথা দৃষ্টিতে গাধার পদচারণাও অনকাংখিত।

                  ঐতিহাসিক নয়ানিভিরাম ও স্বপ্নিল নরসুন্দাতে আজ যেমনি পানি নেই, তেমনি পালতোলা বাহারী রঙ বেরঙের নৌকাও আর দৃশ্যমান হয় না। আজ নরসুন্দা নদীতে শহরের বর্জ্যরে স্তুপের পাহাড় জমে থাকতে দেখা যায়। নরসুন্দাকে স্বপ্নিল নরসুন্দা করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় (এলজিইডি) একটি মাস্টার প্ল্যান (গধংঃবৎ ঢ়ষধহ) বাস্তবায়িত করার জন্য পর্যায়ক্রমে প্রায় শত কোটি টাকার বরাদ্দ করে থাকে। তবে কিশোরগঞ্জের নাগরিক সমাজ এই প্রকল্পের ঠিকাদারের মানসম্পন্ন কাজের দাবীতে বিভিন্ন সময়ে শহরে মানববন্ধন, প্রেস কনফারেন্সসহ সরকারের নিকট দাবী জানিয়ে আসলেও বাস্তবে স্বপ্নিল নরসুন্দা গড়ে তোলার ব্যাপারে রয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি, অসদুপায় ও কাজের ফাঁকফোকর।

                 এ প্রকল্পটি দেখাশুনার ব্যাপারে স্থানীয় উপজেলা প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেয়া হলেও, বাস্তবে তিনি তার অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করার ব্যাপারে রয়েছে অগনিত অভিযোগ। নদীর পাড় রক্ষায় প্যালাসাইডিং ওয়াল করা হলেও যেমনি ৬ মাসের মধ্যে ওয়াল ধসে যাচ্ছে তেমনি নদীর পাড়ের ওয়াকওয়ে রাস্তাও অনেক জায়গায় ডেবে যাচ্ছে ও ভেঙ্গে যাচ্ছে। তাছাড়া গৌরাঙ্গ বাজার জ্ঞানদা সুন্দরী ব্রীজ থেকে বড় বাজার মাছমহল ওয়াকওয়ে রাস্তায় আবর্জনার স্তুপ থাকাতে যেমনি চলাফেরার অযোগ্য তেমনি গুরুদয়াল কলেজ ব্রীজ থেকে পাগলা মসজিদে যাওয়ার রাস্তায় বড় বড় গর্ত ও রাস্তা অসমাপ্ত থাকাতে চলাফেরার অযোগ্য হয়ে রয়েছে। স্বপ্নিল নরসুন্দার এ প্রকল্পটি আদ্যোপান্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষন করলে শুধু অনিয়ম আর অনিয়মের পাহাড় পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। প্রকল্পটির উন্নয়নের বিকাশ না হলেও জানা যায়, উক্ত প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটি নাকি বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে। প্রকল্পটির সুপারভিশনেও নাকি রয়েছে সীমাহীন গাফিলতি। প্রকল্পটি সরজমিনে পরিদর্শনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা আসলে এলাকাবাসী তাদের সামনেই প্রকল্পটির ব্যাপারে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, কাজের ফাঁকফোঁকর তুলে ধরলেও তেমন কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

                উন্নয়নের নামে এমনিভাবে আর কতদিন এ বেরসিকতা ও তামাশা চলবে এটাই আজ অনেকেরই প্রশ্ন। জনস্বার্থে এসবের আশু সমাধান অত্যাবশ্যক। সরকারী মাল দরিয়া মে ঢাল, কুছনেহি পরোয়া এ স্লোগানের অবসানই পাথেয়। জনগণের খাজনা ট্যাক্সের ঘাম জড়ানো অর্থের অপচয়, দুর্নীতি দেখার যেন কেহ নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদাসীন কর্তৃপক্ষকে বলতে হচ্ছে, স্বপ্নিল নরসুন্দা উন্নয়নের কাজের ফাঁক ফোঁকর দয়া করে দেখুন, জানুন। জাতীয় ও জনস্বার্থই হোক দুর্নীতি মুক্ত উন্নয়নের অঙ্গীকার, প্রতিশ্র“তি ও অর্গানোগ্রাম।

                ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর কাওনায় বেশ কয়েক বছর আগে বেড়ী বাঁধ নির্মাণ করায় ব্রহ্মপুত্র নদের দুটি শাখা নদী আজ প্রায় মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। ওই বেড়ী বাঁধের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তো পানি থাকেই না, তদোপরি বর্ষাকালে পানি আসে না। ফলশ্র“তিতে দুই শাখা নদীর পাড়ে পানির অভাবে বোরো ফসল করা যেমনি আদৌ সম্ভব হয়নি তেমনি শাকসব্জি ও অন্যান্য রবিশস্যের আবাদও জটিল হয়ে পড়েছে।

                  ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা নরসুন্দা নাম ধারণ করে তারাকান্দি, ঝাউগারচর হয়ে মির্জাপুরে আবার ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে মিলিত হয়েছে। অপর শাখাটিও নরসুন্দা নাম ধারণ করে পুমদী ও কিশোরগঞ্জ শহরের মাঝখান দিয়ে সিংগুয়া নদীতে এবং অপর অংশটি রঘুখালি, জঙ্গলবাড়ী হয়ে ধনু নদীতে সংযোগ হয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। ওই দুটি শাখা নদীর পানির একমাত্র উৎসস্থল ব্রহ্মপুত্র নদ। এক সময় দুটি শাখা নদী দিয়ে যেমনি পালতোলা নৌকা ও মালবাহী নৌকার বহর দেখা যেত, আজ তাতো হচ্ছেই না বরং শুষ্ক মৌসুমে নদীর তলদেশ পর্যন্ত আবাদ জমিতে পরিণত হয়েছে। নদী বিশেষজ্ঞদের মতে ব্রহ্মপুত্রের ওপর কাওনার বেড়ী বাঁধের স্থলে স্লুইচগেইটের মাধ্যমে যেমনি ব্রহ্মপুত্র নদের দুটি শাখা নদী সচল করা 


সম্ভব তেমনি এসব নদীতে পাল তোলা নৌকা চলাচল না করলেও দুই শাখা নদীর পানি দিয়ে শীতকালে বোরো ধানের চাষ করা সম্ভব। তাছাড়া প্রতুল শাকসবজিসহ রবিশস্যের আবাদও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রহ্মপুত্র নদসহ দুটি শাখা নদী খননের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমেও পানি ধরে রাখার যথেষ্ট সুযোগ বিদ্যমান। প্রায় বছর দুয়েক আগে কিশোরগঞ্জ শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদীর পুমদী, কিশোরগঞ্জ, জঙ্গলবাড়ী, রঘুখালি ও নীলগঞ্জ পর্যন্ত কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে নামমাত্র ড্রেজিং করা হলেও, যেমনি পানির মুখ দেখা যায়নি তেমনি কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বলা চলে জবাব দিহীতা না থাকার কারণে এ যেন শুভংকরের ফাঁকি।

                 আরো উল্লেখ থাকে, দুটি শাখা নদী সচল হলে, নদীর পানি সেচের মাধ্যমে যেমনি প্রচুর বোরো ধান উৎপাদন সম্ভব তেমনি মাছ চাষসহ রবিশস্যের চাষে দুই পাড়ের কৃষকদের অনাবিল সম্ভাবনাও আশাব্যঞ্জক।

                জনস্বার্থের আলোকে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের মরা প্রায় দুটি শাখা নদীকে বেড়ী বাঁধের স্থলে স্লুইচগেইটের মাধ্যমে যেমনি প্রাণ সঞ্চালন করা সম্ভব তেমনি ব্রহ্মপুত্র নদের মাধ্যমে হোসেনপুর থেকে মির্জাপুর হয়ে ভৈরব, নারায়নগঞ্জ এবং অপর দিকে কিশোরগঞ্জ হয়ে চামটা নদী বন্দরের মাধ্যমে ভৈরব, আশুগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জ, হোসেনপুর, গফরগাঁও হয়ে ময়মনসিংহ ও জামালপুরের সাথে নৌ চলাচলের মধ্য দিয়ে অবারিত নৌ বাণিজ্যের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাতে বাস ও ট্রেনে পণ্য আনা নেয়া ও যাতায়াতের চেয়ে নৌপথে পরিবহনের ফলে যেমনি ব্যয় কমানো সম্ভব তেমনি যাতায়াতেরও অবারিত সুযোগ সুবিধা বিদ্যমান।

                পরিশেষে বলা যায়, সরকারের সুষ্ঠু তদারকিতে যদি ব্রহ্মপুত্র নদের উপর পরিকল্পিতভাবে স্লুইচ গেইট নির্মাণ এবং স্বপ্নিল নরসুন্দার কাজের মান সুষ্ঠু তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয় তবে মানুষ পাবে দীর্ঘদিনের কাংখিত আশা আকাংখা ও প্রত্যাশার সুফল। ব্রহ্মপুত্রের কাওনার বাঁধ থেকে নরসুন্দার খনন ও স্বপ্নিল নরসুন্দা গড়ে তোলার লক্ষ্যে কোটি কোটি টাকা খরচের ব্যাপারে যে উপাখ্যান ও ভানুমতির খেলা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং দুদকের তা খতিয়ে দেখতে এলাকার জনগণ যথেষ্ট প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আসছে। ইহার আশু সমাধান করে ব্রহ্মপুত্রের কাওনায় বেড়ী বাঁধের স্থলে স্লুইচ গেইট এবং স্বপ্নিল নরসুন্দার আশু বাস্তবায়নই হোক প্রচেষ্টা। লাখে লাখে সৈন্য মরিল কাতারে কাতার, গুনিয়া-বাছিয়া দেখি মাত্র তের হাজার। সোনাবানের এ ধরণের পুঁথি আর কেহ শুনতে চায় না। মানুষ চায় এলাকার উন্নয়ন, অগ্রগতি, সমৃদ্ধি ও প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার।

(এ.কে.এম শামছুল হক রেনু)
লেখক কলামিষ্ট


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor