Space For Advertisement

ঢাকা অভিমুখে পাক হানাদার বাহিনীর পলায়ন ও নৃশংসতা

ঢাকা অভিমুখে পাক হানাদার বাহিনীর পলায়ন ও নৃশংসতা

           মিয়ানমারের মুসলমানদের উপর নৃশংসতা, নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, নাশকতার অমানবিক দৃশ্যপটকে এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ না থাকাতে, নিবন্ধের প্রারম্ভেই তা নিয়ে সামনে এগুতে হল। মিয়ানমার বৌদ্ধ প্রধান দেশ। তাদের ধর্মে রয়েছে জীব হত্যা মহা পাপ। আজ যেভাবে তাদের হাতে মুসলমান নারী, পুরুষ ও শিশু নির্মমভাবে নিহত হচেছ তা হয়তো ওরা কখনও ভেবে দেখেনি। যদি তা ভেবে দেখতো, তবে হয়তো এমনি পৈশাচিক কায়দায় সংখ্যালঘু মুসলমানদেরকে এমনি গা শিহরিয়ে উঠার মতো হত্যা করতে পারতো না। আজ বিশ্ব বিবেককে হার মানিয়ে মানবতার সকল দরজা জানালা বন্ধ করে কুলের শিশু থেকে শুরু করে তরুণ, যুবক, যুবতী, বৃদ্ধ, বৃদ্ধাদের উপর মিয়ানমারের মুসলমানদের উপর প্রকাশ্যে ওরা যেভাবে নারকীয় অত্যাচার, বর্বরতা ও নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে শুধু মুসলমানই নয় রক্ত মাংসের সুস্থ বিবেকের কোন মানুষের পক্ষে তা কোন মতেই সহ্য করার নয়। নির্যাতিতদের পাশে যেমনি জাতিসংঘ, ওআইসি, সৌদি আরবসহ দুনিয়ার অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহের যেভাবে এগিয়ে আসা উচিত ছিল, তবে সেভাবে কেহই এগিয়ে আসছেনা। সেখানে তাদের বর্বরতা, নাশকতা ও নৃশংসতায় শুধু মানবতাই ক্ষতবিক্ষত ও লংঘিতই হচ্ছে না সেখানে মুসলমান নারীদের উপর নেমে আসছে শ্লীলতাহানি ও চরম বর্বরতা। যা আইয়্যামে জাহেলিয়ার যুগকে হার মানাচ্ছে। বাপমায়ের চোখের সামনে ছোট ছোট ছেলে মেয়ে, তরুণ, যুবক যুবতীদের ধরে এনে নমরূদের অগ্নিকুন্ডের মতো জ্বলন্ত অগ্নিতে হাত পা বেধে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারছে। পিতা মাতা, স্বামীর সামনে যুবতী মেয়ে ও স্ত্রীকে প্রকাশ্যে গণধর্ষন করতেও কুন্ঠাবোধ করছেনা ওরা। যেখানে আন্তর্জাতিক রেডক্রস যেমনি এগিয়ে আসেনি, তেমনি মানবাধিকার সংস্থা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কেহই যেতে পারেনি। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে রাব্বুল আল আমীন, দুই কাঁধের কেরাবান কাতেবীন ফেরাস্তা ছাড়া তাদের পাশে আর কেহই নাই। সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আল আমীনের গায়েবী সাহায্যেই তাদের একমাত্র ভরসা। আবরাহার হস্তীর যুদ্ধে যেমনিভাবে আবাবীল পাখীর কংকর ও বদর যুদ্ধে যেভাবে ফেরেস্তাগণ এগিয়ে এসেছিল, এখানেও একই অবস্থা বিদ্যমান। ১৯৭১ সালে 

তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর এমনিভাবে দানব পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা, নারকীয়তা, নৃশংসতা, অমানুষিক নাশকতা, অত্যাচার নেমে আসলে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী অন্যান্য দেশ স্বাধীনতাকামী পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের পাশে না দাঁড়িয়ে পক্ষান্তরে পাক হানাদার বাহিনীকেই সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছিল। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন সরকার বঙ্গপোসাগরে তাদের হয়ে রণতরী সপ্তম নৌ বহর পাঠানোর ব্যবস্থাসহ চীনও তাদের সমর্থন যুগিয়ে ছিল। সেই সময় এমন ধরণের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটলে এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ও পরে নেপথ্যে অনেক কিছু ঘটলেও, সোভিয়েত রাশিয়া, ভারতের সরকার ও জনগণের সহযোগিতাকে আজো এ দেশের জনগণ, তা ললাটে নিয়ে স্মরণ করে থাকে। এনিয়ে জাতিসংঘ ও বিগফাইভ বা বিশ্বের পঞ্চম শক্তিধর হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, গ্রেট বৃটেন সম্পর্কে আজো রয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। যা এ নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে না গিয়ে এ নিবন্ধের মূল ধারায় চলে যেতে হল।    

             ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটি সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পরিচিত। এদিন যেমনি সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, স্থল, জল ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বোমাবর্ষণ থেকে শুরু করে দেশের সর্বত্র যেমনি তাদের স্থাপনা ও বাংকারে বোমাবর্ষন শুরু করে, তেমনি সোভিয়েত রাশিয়ার বিমান বাহিনী আগরতলা বিমানঘাঁটি থেকে উড়ে এসে হানাদারদের বাংকার ও স্থাপনায় বোমাবর্ষন করে থাকে। তাছাড়া মিত্র বাহিনী তাদের বিভিন্ন স্থাপনা ও ব্যাংকারে আক্রমণ করে তাদেরকে নাস্তানাবুদ করতে সক্ষম হয়। তদোপরি পাকবাহিনীর সেনা, নৌ ও বিমান ঘাঁটিতেও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সাঁড়াশি আক্রমণও অব্যাহত থাকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যাকে বলা হতো “গাবোড় মাইর”। সেই সময় পাক হানাদার বাহিনী তাদের দুরবস্থা ও বিপর্যয় বুঝতে পেরে রাজশাহী, যশোর, খুলনা, রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ থেকে তাদের স্থাপনা গুটিয়ে হঠাৎ করে ঢাকা অভিমুখে রওয়ানা দেয়। ঢাকা অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার সময় রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সেতু ও রেলপথের গুরুত্বপুর্ণ সেতু, বিশেষ করে হার্ডিঞ্জ ব্রীজ, ভৈরব ব্রিজ, ঘোড়াশাল ব্রীজ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়। তাছাড়া রাস্তার দুপাশের বাড়ীঘর, সরকারী বেসরকারী স্থাপনা, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার ও ধ্বংস স্তুপে পরিণত করে। পথের দুধারে নারী পুরুষ, শিশু, যুবক, যুবতী, বৃদ্ধ বৃদ্ধা যাকে পেয়েছে তাদেরকে নির্মম ও নিষ্ঠুর নৃশংসভাবে হত্যা করে। এমনকি যুবতী সুন্দরী মা বোনকে ধরে নিয়ে যায়। সেই সময় সিলেটের সালোটিকর বিমানঘাঁটি, খুলনা ও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি নৌ ফ্রিগেটও ধ্বংস করে থাকে। 

             তারপর দিন যতই যেতে থাকে তাদের উপর মুক্তিযোদ্ধাদের সাঁড়াশি আক্রমণ যেমনি তীব্র হতে থাকে, তেমনি তিন বাহিনীর অকুতোভয় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর আক্রমণ ও অপরদিকে মিত্র বাহিনীর বিমান হামলা তীব্র থেকে তীব্র আকার ধারণ করে। তদোপরি নৌবাহিনীর কামানের গোলাও থেমে থাকেনি। সেই সময় পাক হানাদার বাহিনীর ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাংকার, এমনকি গভর্ণর হাউজেও বোমা বর্ষণসহ কম্বিং অপারেশন চলতে থাকে। সশস্ত্র বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর কম্বিং অপারেশনে তাদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি রব শুরু হয়। গভর্ণর ড. এ মোতালেব মালেক, জল্লাদ টিক্কা খান, রাও ফরমান আলী নিয়াজি অন্যান্য দানবরা তাদের সুসজ্জিত গভর্ণর হাউজ ও আস্তানা পরিত্যাগ করে বাংকারে আশ্রয় নিলে সেখানেও চলে সশস্ত্র বাহিনীর কম্বিং অপারেশন ও উপর্যোপরি বম্বিং। অপরদিকে বুড়ীগঙ্গা নারায়নগঞ্জ নৌ ঘাটিঁর উপর চলে নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণ। তখন পাক হানাদার বাহিনীর করায়ত্ব, নৌবাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ যেমনিভাবে একের পর এক নৌ সেনাদের হাতে চলে আসতে থাকে। তেমনি ঢাকার একমাত্র বিমান ঘাঁটি কুর্মিটোলা বিমানঘাটি, যশোর বিমানঘাটিও রানওয়েতে থাকা বিমান যেমনি বিমান বাহিনীর নও জোয়ানদের করায়ত্ব হয়, তেমনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টসহ দেশের অধিকাংশ ক্যান্টনমেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। মোদ্দা কথা ১৬ ডিসেম্বর ৭১ জেনারেল নিয়াজি আনুষ্ঠানিকভাবে ৯৩ হাজার পাক আর্মি ও ১৯৫ জন কুখ্যাত পাক যুদ্ধাপরাধীসহ আত্মসমর্পন করলেও মূলতঃ ২১ নভেম্বরের পর থেকে দেশের একটার পর একটা পাক হানাদারদের স্থল, জল ও বিমান বাহিনীর স্থাপনা বা ছাউনি মুক্ত হয়ে পড়ে। এরই মধ্যে তদানীন্তন কিশোরগঞ্জ মহকুমা বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলা মুক্ত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর।     

             ২২ নভেম্বর কিশোরগঞ্জের জনগণের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন, বিভিন্ন তথ্য ও সূত্রে জানা যায়, ঐ দিন কিশোরগঞ্জ রেলষ্টেশন সংলগ্ন পাক হানাদার বাহিনীর আস্তানা জেলা পরিষদের ডাক বাংলো থেকে পাকবাহিনী বিশাল গাড়ীর 
বহর ও ট্রাকে করে তাদের মালছামানা নিয়ে সড়ক পথে সুখিয়া, পাকুন্দিয়া, মঠখোলা, আড়ালিয়া, চালাকচর, হাতিরদীয়া, মনোহরদী, শিবপুর, নরসিংদী, মাধবদী, ভেলানগর হয়ে ঢাকা অভিমুখে এবং অপরদিকে মিঠামইন, ইটনা, নিকলী, অষ্টগ্রাম, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর ও ভৈরবের পাক হানাদার বাহিনী রেলপথে ঢাকা অভিমুখে পলায়ন করে। সেই সময় পথে ঘাটে পাক হানাদার বাহিনী কোথায়ও বাধার সম্মুখীন না হলেও মঠখোলা বাজার সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদী পার হওয়ার সময় আড়ালিয়া ফেরী ঘাটের মাঝিদের তাৎক্ষণিক ফেরি পারে বিলম্ব হলে, সেখানে নির্মমভাবে গুলি করে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে। তাছাড়া কিশোরগঞ্জ থেকে নরসিংদী পর্যন্ত পৌঁছতে রাস্তার দুপাশের অনেকের বাড়ীঘর ও গুরুত্বপুর্ণ স্থাপনায় আগুন জ্বালিয়ে যেমন ছারখার করে যায়, তেমনি রাস্তার দুপাশে এমনিতেই গুলি করে অনেককে হত্যা করে। 

            সুখিয়া নিশ্চিন্তপুর, আঙ্গিয়াদী মঠখোলা, আড়ালিয়াসহ অন্যান্য স্থানের বয়োবৃদ্ধ, প্রবীণ ও ভোক্তভোগীরা এ কথার বর্ণনা করতে গিয়ে স্থির থাকতে পারেনি। তখনও কিশোরগঞ্জসহ এ মহকুমার সর্বত্র তাদের দোসরদের স্থাপনা ঠিকই ছিল। সবারই ধারণা ছিল পাক হানাদার বাহিনী হয়তো আবার ফিরে আসবে। সেই ভয়ে রাস্তার দুই পাশে পড়ে থাকা লাশগুলোর কোন জানাযা ও সৎকারের ব্যবস্থা না করাতে চোখের সামনে শৃগাল, কুকুর ও শকুন লাশগুলো ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শী একজনের কাছ থেকে জানা যায়, সেই সময় পাক হানদার বাহিনী সুখিয়া বাজার সংলগ্ন ব্রীজে যে কয়েকজনকে হত্যা করে ছিল তারা ব্রীজের নীচে খালের পানিতে পড়ে হাবুডুবু খেলে এবং আহাজারি করলেও ইচ্ছা থাকলেও পাকবাহিনী আসার ভয়ে তাদেরকে উদ্ধারের জন্য কেউ এগিয়ে যায়নি। সবার মনে ভয় ছিল পাক হানাদার বাহিনী আবার ফিরে আসবে এবং গোটা এলাকাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নাস্তানাবুদ করে ফেলবে। তারও আগে সুখিয়া, চন্ডিপাশা, চরপলাশ, বড় আজলদী, কোদালিয়া এলাকার কাসেম, আঙ্গুর, আঃ হাই, গোলাপ, সবজালী, মুসলিমসহ ৩৭ জন ভারতে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য যাওয়ার পথে পাক হানাদার বাহিনী তাদেরকে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি, কলবলুয়া ও রায় বাজার থেকে ধরে এনে কিশোরগঞ্জ শহরের মনিপুরঘাট ব্রীজ, যশোদল সুগার মিল সংলগ্ন নরসুন্দা নদীর ব্রীজ ও গচিহাটার সিংগুয়া নদীর উপর ধুলদিয়া রেলব্রীজে তাদেরকে হত্যা করে পানিতে লাশ ভাসিয়ে দেয়। প্রাণের ভয়ে কেহই তাদেরকে বাড়ীতে এনে লাশের দাফন কাফন করে কবর দিতে সাহস পায়নি। ইতিহাসের পাতায় যেমনি তাদের লাশ স্মরণীয় হয়ে থাকবে তেমনি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর অকুতোভয় দেশ মাতৃকার সূর্য সন্তান ও মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সুমহান বীরদের বীরত্বগাথা চির অম্লান ও জাগরুক হয়ে থাকবে। নিজ পরাধীন ভূমির স্বাধীনতার জন্য কারো রক্ত কোন দিন বৃথা যায়না। ইতিহাসে তাদের স্থান অমর, অব্যয়, অক্ষয়।         


(এ.কে.এম শামছুল হক রেনু)
লেখক কলামিষ্ট

 


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor