Space For Advertisement

এলএও সেতাফুলের দুর্নীতির তদন্ত, বদলী ও পদোন্নতি প্রসঙ্গে

এলএও সেতাফুলের দুর্নীতির তদন্ত, বদলী ও পদোন্নতি প্রসঙ্গে

       কিশোরগঞ্জ জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলএও) সেতাফুলের ৮ কোটি টাকার উপরে অনিয়ম, দূর্নীতি প্রায় ৩ মাসের অধিক সময় ধরে অভ্যন্তরিন তদন্তে ধরা পড়ে। তারপর ভূমি অধিগ্রহণ প্রাপকদের মধ্যে প্রদানের জন্য নাকি ব্যাংক থেকে ৫ কোটি টাকা উত্তোলন এবং সর্বোপরি আরো ১০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলনকালে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে উক্ত ১০ কোটি টাকার চেক জব্দ করা হয়ে থাকে। এনিয়ে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যম, মিডিয়া, সংশ্লিষ্ট দফতর, বিভাগীয় কর্মকর্তার দফতর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন সহ অন্যান্য সরকারী পর্ষদে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে থাকে। এছাড়া স্পর্শকাতর এ ঘটনাটি কিশোরগঞ্জ সহ সারা দেশে টক অব দ্যা কান্ট্রিতে রূপ নেয়। 

          উক্ত এলএও সেতাফুল যাতে বিদেশে পাড়ি দিতে না পারে এ ব্যাপারে মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে দেশের বিমান বন্দরের ইমিগ্রেশনে সতর্ক বার্তাও প্রেরণ করা হয়ে থাকে। তদোপরি এ ব্যাপারে ঢাকা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার সরেজমিনে তদন্ত করে যে মন্তব্য করেছেন, কোন কোন গণমাধ্যমে তাও প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া এর সাথে জড়িত নাটের গুরুদের সংশ্লিষ্টতাকেও অনেকেই উড়িয়ে দিচ্ছেনা। মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে দুদক ও জন প্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতি দৃষ্টি ও নির্দেশ নামাও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এরই মধ্যে ময়মনসিংহ দুদক আঞ্চলিক সমন্বয় কার্যক্রম থেকেও বিষয়টি কিশোরগঞ্জে সরেজমিনে তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ থানায় একটি এফআইআর করা হয়ে থাকে। যার ফলশ্র“তিতে উক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলএও) সেতাফুলকে পিরোজপুর থেকে সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়।

          কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায় এতসব কিছুকে পাশ কাটিয়ে তদন্ত চলাকালে কিশোরগঞ্জ জেলা থেকে তাহাকে পিরোজপুর জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে বদলী এবং ৭ দিন যেতে না যেতেই ভোলা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে পোষ্টিং লাভ করেন। দিন যতই যাচ্ছে ততই উক্ত এলএও সেতাফুল সম্পর্কে জনমনে নতুন নতুন রহস্যের দানা বাঁধতে শুরু করেছে। আসলে সেতাফুলের পেছনে কারা কলকাটি নাড়াচ্ছে, কাদের ইন্ধন, সহযোগিতা ও কারিশমায় এমতাবস্থায় বদলী, পদোন্নতি ও পোষ্টিং হচ্ছে এটাকে অনেকেই সহজভাবে মেনে নিতে পারছেনা। এছাড়া দুদকের দুর্নীতি তদন্তের পূর্ব থেকেই উক্ত এলএও কে সর্বদিক দিয়ে একটা শ্রেণী যেমনি সাহস যোগাচ্ছে তেমনি সকল দিক দিয়ে কলকাঠি নাড়াচ্ছে বলে জনশ্র“তি রয়েছে। 


             দুদক এ ব্যাপারে কাকে গ্রেফতার করবে, কাকে গ্রেফতার করবেনা, কাকে উক্ত মামলায় সম্পৃক্ত করবে, কাকে সম্পৃক্ত করবেনা এটা তাদের তদন্তের বিষয় ও তদন্তের কর্ম কৌশল বটে। আমলনামাও এর জন্য কম দায়ী নহে। তবে এ ঘটনার পর্যালোচনা ও অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, এ ব্যাপারে যদি কারো সংশ্লিষ্টতা থেকে থাকে তবে যে কোন মর্যাদাশীল কর্মকর্তাকেও দুদকের ছাড় দেয়ার কথা নয়। ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন ব্যোরো থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বহু বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে আজ এ জায়গায় এসেছে। কেউ বেরসিক দুর্নীতি করে বসে বসে কলা খাবে এবং কেউ দুর্নীতির রাঘব বোয়াল হয়ে বেঁচে যাবে, এই সুযোগ হয়তো এখন না থাকারই কথা। যে কারণে আজ ব্যাংক, বীমা, কর্পোরেশন সহ বিভিন্ন পর্ষদের দুর্নীতির রাঘব বোয়ালরা সহজে মুক্তি পাচ্ছে না। “টিআর, কাবিখার মতো হালুয়া ছে লুটেপুটে খাবিতো খাঁ” এই প্রবণতাকে বর্তমান দুদক একটু শক্ত করে সামনে এগুচ্ছে বলেই ওরা সহজে পার পাচ্ছেনা। এছাড়া দীর্ঘদিন পর দুদকের প্রতি মানুষের যে আস্থা সৃষ্টি হয়েছে যদি এর মধ্যে গলদ ঢুকে শুটকীর নাউ বিলাই চৌকিদারের মতো হয়, তবে দুদককে মানুষের আস্থায় আনা সহজসাধ্য নয় বলে দুদক তার অস্থিত্ব ধরে রাখার স্বার্থেই কালাকে ধলা, লালকে সবুজ এবং সবুজকে লাল বানানোর কারিশমা থেকে স্বকীয় ইমেজ রক্ষা করার কারণে বিকল্প কোন কিছু না ভাবারই কথা। ইতোমধ্যে দুদক ঘরানার অনেকেই দুদকের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেল জরিমানার দ্বারস্থ হচ্ছে। তাও দেখার বিষয়। 

          এলএও সেতাফুল যেহেতু গ্রেফতার হয়েছে, নিশ্চয়ই দুদক এবং আদালত তার জবানবন্দী (ংঃধঃবসবহঃ) গ্রহণ করবে। এখনো যেহেতু গোটা বিষয়টি দুদকের তদন্তাধীন তাই এ বিষয়ে কোন মন্তব্য না করে তদন্ত কার্যক্রমের অপেক্ষা করে পরবর্তী সময় এ ব্যাপারে কোন নিবন্ধে মন্তব্য করলে দোষের কিছু থাকবে বলে মনে হয় না। অনেকেই আন্দাজের ওপর মন্তব্য করে ব্যাংক থেকে সেতাফুলের টাকা উঠানো, কিশোরগঞ্জ থেকে বস্তায় ভর্তি করে ঢাকায় টাকা নিয়ে যাওয়ার কথা, কিশোরগঞ্জের কোনো এক হোটেলে ৩ দিন রাত্রি যাপন সম্পর্কে বিভিন্ন কথাবার্তা বললেও এগুলোর যেমন দালিলিক প্রমাণ নেই, তেমনি কারো আশ্রয় প্রশ্রয়ে থাকলেও অনুমান নির্ভর কোনদিকে না গিয়ে সুষ্টু তদন্তের জন্য অপেক্ষা করাটাই শ্রেয়। তবে এ কথা সত্য, এলএও সেতাফুলকে এত দিন যাবত অপেন ঘুরাঘুরির সুযোগ না দিয়ে আরো আগে ভাগে আইনের আশ্রয়ে নেয়া হলে হয়তোবা আন্দাজের ওপর কোন কিছু মন্তব্য আরো আগেই থেমে যাওয়ার কথা।    

          তবে তদন্তকালে মাইক নিয়ে যে কথা বলা যায়, সেটা হচ্ছে পিরোজপুর জেলায় এলএও হিসেবে একই পদে বদলী এবং পদোন্নতি নিয়ে এডিসি হিসেবে ভোলায় বদলী সংক্রান্ত। যার মধ্যে রয়েছে দালিলিক প্রমাণ (উড়পঁসবহঃঁৎু ঊারফবহপব) এছাড়া কার মাধ্যমে বা কোন আলাদীনের চেরাগের স্পর্শে পদোন্নতি এবং বদলীর ফাইল সঞ্চালিত হয়েছে যা দেখা ও বলার বিষয়। জানা যায়, অফিস আদালতের সামান্য বেতনের পিয়ন, চাপরাশি, নাইটগার্ড থেকে অন্যান্য পদের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারীর পদোন্নতি তো দুরের কথা শত চেষ্টা, তদবীর, সুপারীশ ও পারিবারিক দুঃখ বেদনার কথা বলেও অনেকেরই ৬ মাস, ১ বছরেও একস্থান থেকে অন্যস্থানে বদলী কার্যকর হয়না। আর একজন ১ম শ্রেণীর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দূর্নীতি, অনিয়ম ও আত্মসাতের তদন্ত চলাকালীন সময়ে ৭ দিনের মধ্যে কী করে বদলী ও পদোন্নতির  ঘটনা জনসমক্ষে চলে আসে ইহাই দেখার বিষয়। 

             জন প্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ বদলী ও পদোন্নতি কার্যক্রম চালিত হলেও এ ব্যাপারে নিশ্চয়ই ঢাকা বিভাগের তদন্ত কার্যক্রম ও ৩ মাসের বেশী সময় কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অভ্যন্তরীন তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে স্পর্শকাতর এ বিষয়টির সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম নিশ্চয়ই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মন্ত্রী পরিষদ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের না জানার কথা নয়। এছাড়া বিভাগীয় কমিশনার, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর প্রেক্ষাপটেই তো দুদক সহ অন্যান্য বিভাগের তদন্ত কার্যক্রম সামনে এগুচ্ছে এবং উক্ত এলএও সেতাফুল গ্রেফতার হয়েছে। যদি তাদেরকে এ বিষয়ে অবহিত না করা হতো তবে তো জীবরাইল (আঃ) ফেরেস্তা ওহী নিয়ে আকাশ থেকে এসে তা অবহিত করতেন না।    

         সেজন্য উক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার বদলী ও পদোন্নতির বিষয়বস্তু সারমর্ম ও নেপথ্য কারিগরদের কারিশমা ও সহযোগীতাকে কারো পক্ষেই হালকা করে না দেখারই কথা। ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার (এলএও) অনিয়ম, দূর্নীতি ও আত্মসাতের ব্যাপারে সরকারের যথেষ্ট ভাবমূর্তি জড়িত রয়েছে।  

         ইতোমধ্যে সেতাফুলের বিষয়ে অনেক কথা বেড়িয়ে আসলেও দুদকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্ভবত কারো কোন কথার আঁচড়ে না গিয়ে দালিলিক প্রমাণ নিয়েই সামনে এগুচ্ছে এবং এর মধ্যেই নির্ভর করবে উক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা কতটুকু 

দায়ী বা দোষী । এর বাইরে যাওয়ার যেমন কারো সুযোগ নেই তেমনি প্রাপ্তির চেয়ে ঘটনাকে বড় বা ছোট করে দেখারও সুযোগ না থাকারই কথা। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার বদলী ও পদোন্নতির ব্যাপারে যেহেতু দালিলিক প্রমাণ, পেপারস, ডকুমেন্ট, ফাইলপত্র সঞ্চালন করা হয়েছে, ফাইলটি আপডাউন হয়েছে তাতে যার যত সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এসব কিছুই ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট। এখান থেকে ইচ্ছা করলেই কারো নি®কৃতি পাওয়ার সুযোগ তো একেবারেই পরাহত। তাতে যদি এ ব্যাপারে কারো কোন উদ্দেশ্য, মোটিভ, হীনমন্যতা, তদবীর সুপারীশ থেকে থাকে তা যেমন বেড়িয়ে আসবে, তেমনি যদি সাধারণ নিয়মেই এসব কিছু বদলী, পদোন্নতি হয়ে থাকে তাও আয়নার প্রতিচ্ছবির মতো ভেসে ওঠারই কথা। 

         অনেকেরই প্রশ্ন এ মুহুর্তে ওই কর্মকর্তার বদলী, পদোন্নতি নিয়ে জনমনে বিভিন্ন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরের যেমনি এর উদঘাটন প্রয়োজন তেমনি দুদক উক্ত বিষয়টির তদন্তের আওতায় বদলী ও পদোন্নতি রহস্যের উদঘাটন বেড় করাও জনমতের আলোকে তা মনে করা অমূলক কিছু নহে। 

            মোদ্দা কথা উক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জে প্রায় একই পদে ৩ বছর থাকাকালীন আরো কী ধরণের অনিয়ম, দূর্নীতি, আত্মসাৎ, অপকর্ম করেছেন তেমনি অপরাপর জায়গায় কর্মকালীন সময়ে যদি কোন অনিয়ম দুর্নীতি আত্মসাৎ করে থাকেন  তাও দুদকের তদন্তকালে আওতায় এনে এবং চাকরিকালীন সময়ে তার আয়ের বেশী সম্পদ আহরিত হয়ে থাকলে তাও খতিয়ে দেখা দরকার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৭ বছরের মধ্যে সেতাফুলের চেয়ে আরো বড় ধরণের অন্যায়, অপকর্ম, দূর্নীতি, অনিয়ম ও আত্মসাৎ করে অনেকেই টিকে রয়েছে বলেই আজ সেতাফুল কে নিয়ে গণমাধ্যম, ফেসবুক, অনলাইন, মিডিয়া  ও জনমনে এত কথা ও এত প্রশ্ন। 

            দুদক কর্তৃক দুর্নীতির এ তদন্তকালে এলএও সেতাফুলের ভাগ্যে কি ঘটে, তা কারো জানা না থাকলেও, দুর্নীতির তদন্তকালে এলএও সেতাফুলের বদলী ও পদোন্নতির রহস্য যদি কোন কারণে অনোধঘাটিত রহস্যের অন্তরালে এবং কারো মুখ বন্ধ করতে চাইলেও সমুদ্রের স্রোত, আগুনের লিলিহান শিখা, বেদনার কন্ঠস্বর, স্বজন হারানোদের বিলাপ যেমনি থামানো যায় না, তেমনি দুর্নীতির তদন্তাধীন এলএও সেতাফুলের বদলী, পদোন্নতির তদন্ত দৃশ্যপট রহস্য ও কারিশমা নিয়ে কবির কন্ঠ, সাংবাদিক ও নিবন্ধকের শাণিত কলম, অভাজনের আকুতি ঘুরে ফিরে বারবার শিরোনাম হয়েই আসবে। তদোপরি দূর্নীতির অন্তরালে উক্ত এলএও বদলী, পদোন্নতির অনাবি®কৃত, অনোদঘাটিত রহস্য ও সন্দেহের ডালপালা তিরোহিত না হয়ে অপূর্ণ অভিলাষ নিয়ে সামনে সম্প্রসারিত হলে বলারই বা কি না থাকতে পারে।  দুর্নীতির অনুসন্ধ্যান নিয়ে ব্যথিত মন নিয়ে অনেক অভাজন অনেক কিছু মন্তব্য করলেও এ দুর্নীতির তদন্তে মাঠের গুরু, গডফাদার সহ বদলী ও পদোন্নতির প্রত্যাশিত রহস্য যাতে জন সম্মুখে উদঘাটিত হয় ইহাই এলাকার জনগণ সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিরপরাধ কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা।   

(এ.কে.এম শামছুল হক রেনু)
লেখক কলামিষ্ট
মোবাইল: ০১৭১৮-৮১৪৮১৩।


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor