Space For Advertisement

দেশকে মাদকমুক্ত করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

দেশকে মাদকমুক্ত করতে হলে আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

মোহাম্মদ আবু তাহের

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ অনুযায়ী  অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কোন মাদক দ্রব্যের চাষাবাদ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন পরিবহন, আমদানি, রপ্তানি, সরবরাহ, কেনা, বিক্রি, ধারণ সংরক্ষন, গুদামজাতকরণ, প্রদর্শন, প্রয়োগ ও ব্যবহার করা যাবেনা। এই আইন ভঙ্গকারীদের জন্য যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদন্ডের বিধান ও রাখা হয়েছে। অথচ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে মাদকের অবাধ ব্যবসা চলছে। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশের প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। তাদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী। মাদকের নেশা এমন একটি নেশা, যে নেশার কাছে সমাজ সংসার সবকিছু তুচ্ছ হয়ে যায়। মাদক সেবন করাই তাদের কাছে প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সন্তানদের প্রতি মা বাবার উদাসীনতা ও তাদের মাদকের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাছাড়া সামজিক বৈষম্যের কারনে ও অনেক তরুন যুবক হতাশাগ্রস্থ হয়ে মাদক গ্রহনের মাধ্যমে মুক্তি খোঁজে।  শিক্ষার্থীদের মাদক জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে মুক্ত রাখতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও সচেতনতা মূলক উদ্যোগ বাড়াতে হবে। এ কাজটি শুরু করতে হবে স্কুল পর্যায় থেকেই। এডুকেশন ওয়াচ রিপোর্ট ২০১৫ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে জানা যায় দেশে ৪১ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা নাই। ৪৫ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হয়না। ৭০ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্কাউটিং এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত।  তরুনদের মাদক ও জঙ্গিমুক্ত করতে হলে নৈতিক শিক্ষার উপর ও জোর দিতে হবে। তরুন শিক্ষার্থীদের নানা ধরনের সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের মধ্যে যুক্ত রাখতে হবে। বিভিন্ন সেবামূলক ও সামাজিক সংগঠনে অংশ গ্রহনে উদ্ধুদ্ব করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনোদন ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে। সর্বনাশা এই মাদক থেকে বাচঁতে হলে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজকে ও সচেতন হতে হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ফেনসিডিল ও মাদকের মূল ক্রেতা, যে কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটছে। মাদক এখন গ্রাম বাংলা পর্যন্ত সহজলভ্য।  মাদকদ্রব্য বহনের ফলে কেউ কেউ ধরা পড়লে ও মূল হোতাদের ধরা পড়ার খবর খুব কম শোনা যায়।  

মাদকের হাত থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে না পারলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্র করা অত্যন্ত কঠিন হবে। যুব সমাজ হলো জাতির মেরুদন্ড। যুব সমাজ যদি মাদকাসক্ত হওয়ার কারনে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যৎ সুখীসমৃদ্ধ বাংলাদেশ কে গঠন করবে। একটি পরিবারে একজন মাদকাসক্ত হলে শুধু পরিবারের সুখ শান্তিই নষ্ট হয়না অর্থনৈতিকভাবে এ পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়।  একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় প্রত্যেক মাদবসেবী গড়ে প্রতিদিন ২১ হাজার টাকা খরচ করছে। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, হিরোইন, আফিম থেকে শুরু করে সবধরনের নেশাজাত সামগ্রী অবাধে পাচার হয়ে আসছে। মাদক আগ্রাসন জাতীয় অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে। মাদকের ভয়ংকর থাবা যুব সমাজ কে গ্রাস করে ফেলেছে। মাদক নিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি ও হচ্ছে প্রচুর।  কিন্তু দিন দিন মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। দেশের ভবিষৎ কর্ণধার যুব সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনছে মাদক। দেশের ৩২ টি জেলার ৫১ টি পয়েন্ট দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আসছে শত শত কোটি টাকার মাদকদ্রব্য। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী সারা দেশে মাদক ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ১ লাখ ৬০ হাজার এর মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন নারী মাদক ব্যবসায়ী। মাদক বহনে কোমলমতি শিশুদের ও ব্যবহার করা হচ্ছে। কক্সবাজারকে বলা হয় মাদক ব্যবসার রাজধানী। মাদকাসক্তের দ্বারাই বিস্তৃত হচ্ছে এইচআইভি ও এইডস এর মতো ঘাতক রোগ। মাদক ও অপরাধ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছে এজন্যই আইনশৃঙ্খলারও অবনতি ঘটছে। আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই মাদক আগ্রাসন বন্ধে সর্বাত্বক পদক্ষেপ নিতে হবে, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।  

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় সরকারী ও বেসরকারী নানা উদ্যোগ আয়োজন সত্ত্বেও জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলছে মাদকাসক্তের সংখ্যা। সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় মাদকাসক্তি নিরাময় কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত বিশেষজ্ঞরা ২০২০ সালের মধ্যে দেশে এক কোটি মানুষ নেশায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা ব্যক্ত করেছেন। সংবাদপত্রে প্রকাশিত অন্য একটি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় দেশ জুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন প্রতি বছর শুধু নেশা বাবদ খরচ হয় ৬০ হাজার কোটি টাকা। যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্বক বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে। মাদক আগ্রাসন বন্ধ করতে না পারলে দেশের যাবতীয় উন্নয়ন অগ্রগতি স্থবির হয়ে যেতে পারে। জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রন সংস্থার মতে বছরে শুধু ইয়াবা বড়িই বিক্রি হচ্ছে ৪০ কোটির মতো। যার বাজার মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। এই টাকার অর্ধেকই চলে যাচ্ছে ইয়াবার উৎসভূমি মিয়ানমারে। মাদক ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া মানসিকতার কারনেই মাদকে সয়লাব হচ্ছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। ১৮ জানুয়ারি ২০১৮ বৃহস্পতিবার তেজগাঁও কেন্দ্রিয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ অনুষ্ঠানে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মাদককে বর্তমান সমাজের ব্যধি হিসেবে অভিহিত করেছেন। দেশের ৭০ লাখ মাদকাসক্তকে সেবা দিয়ে মূল ধারায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে স্বীকার করে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা প্রশংসার দাবীদার। জেলাভিত্তিক মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় এর উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সচেতনতা মূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এটি আরও বৃদ্ধি করে পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে নেশামুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে দলমত, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেশের প্রতিটি জেলায় মাদক বিরোধী সমাবেশ করার সিদ্বান্ত নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে।  এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় সারাদেশে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি সহ প্রশাসনের  মাদক নিয়ন্ত্রন কর্মকান্ডের অভিযান সত্ত্বেও মাদকের সয়লাব থামছে না। দেশে মাদকের সয়লাব মনে করিয়ে দেয় উনবিংশ শতাব্দীর চীনের কথা। সেই সময়ে মাদকাসক্তীর কারনে চীনের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ অকর্মন্য হয়ে পড়েছিল। মাদকের কারনে আমাদের দেশের সন্তানরা পিতা মাতা কে হত্যার খবর ও মাঝে মধ্যে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের ২৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ০২ জানুয়ারি রাজধানী তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গনশিক্ষা মন্ত্রী বলেছেন প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া মানসিকতায় দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদক নিয়ন্ত্রন নয় মাদক নির্মূল করতে হবে। তিনি বলেছেন আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মাদককে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। এর পরে কে কী করে তা বিবেচনা না করে দেখা মাত্র গুলির মাধ্যমে মাদক নির্মূল করতে হবে। তা না হলে মাদক নিয়ন্ত্রন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা মন্ত্রী এডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান। যদিও বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন তারপরও মাননীয় মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে সহজেই বুঝা যায় মাদকের ভয়াবহতা। মাদকের ক্ষতির দিকগুলো পাঠ্য পুস্তকে অন্তর্ভূক্ত করা দরকার। ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ গঠনের অন্তরায় মাদক। ১০ বছরে ২০০ পিতা মাতা মাদকসেবীদের হাতে খুন হয়েছেন বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেছেন, সমাজে জঙ্গীদের মতোই আরেকটি সমস্যা দেখা দিয়েছে, সেটা হলো মাদকের সমস্যা। মাদক সমাজকে ধ্বংস করছে। পুলিশ সপ্তাহ ২০১৮ পালন উপলক্ষে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষনে প্রধানমন্ত্রী বলেন এই মাদক কোথা থেকে আসছে, কারা ব্যবস্থা করছে, কারা গ্রহন করছে তাদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও তাৎপর্যের দাবি রাখে। কারণ দুষ্টদের দমন এবং শিষ্ঠদের নিরাপত্তা দিয়ে জীবন যাপন নির্বিঘœ করাই হলো পুলিশের পবিত্র দায়িত্ব। প্রকৃত পক্ষে দেশের মানুষ এক বেলা না খেলেও শান্তিতে থাকতে চায়। সন্তান যাতে বিপদগামী না হয় সেটাই মানুষ চায় কিন্তু মাদক সহজলভ্য হওয়ার কারনে সন্তানদের বিপদগামী রোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের অস্তিত্বের স্বার্থেই মাদক আগ্রাসন বন্ধে গড়ে তুলতে হবে প্রতিরোধ, আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মাদক আগ্রাসন রোধ করতে সর্বাত্বক পদক্ষেপ সময়ের দাবী। মাদক মানুষকে পঙ্গু করে দেয়। জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত, সমস্যা ও বেদনার ভেতরে, সাং¯ৃ‹তিক জগতের বিভিন্ন কর্মকান্ড, বিভিন্ন উৎসব আমাদের নিয়ে যায় আনন্দমূখর পরিবেশে। নাট্য উৎসব, সংগীত উৎসব, আবৃত্বি উৎসব, পিঠা উৎসব, বিভিন্ন উৎসব আমাদের সাংস্কৃতিক ভূবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠন করতে হলে আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিনোদন ও সামাজিক কর্মকান্ড বাড়ানো প্রয়োজন। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে মানুষ বিমোহিত হয়। এ সমস্ত কর্মকান্ডে যুক্ত থাকলে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে সহায়ক হয়। তাছাড়া জরুরী ভিত্তিতে সমন্বিত ও সর্বাত্বক উদ্যোগ প্রয়োজন।
 লেখক
 ব্যাংকার ও কলামিষ্ট
 মৌলভীবাজার।

                          


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor