Space For Advertisement

শিশু আল্লাহ্র দেওয়া শ্রেষ্ঠ নি’আমত

শিশু আল্লাহ্র দেওয়া শ্রেষ্ঠ নি’আমত

মাওলানা মোঃ মারুফ বিল্লাহ
আল্লাহ্ তাআলা মানব জাতিকে অগনিত নি’আমত দান করেছেন। এসব নি’আমতের মধ্যে সু-সন্তান অন্যতম শ্রেষ্ঠ নি’আমত, আল্লাহ্র বিশেষ অনুগ্রহের দান।
কোরান মাজিদে ইরশাদ হয়েছে : 
সূরা নাহ্ল্ (৭২) বাহাত্তর নং আয়াত। আল্লাহ তোমাদের থেকেই তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল হতে তোমাদের জন্য পুত্র ও পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের উত্তম জীবনোপকরণ দিয়েছেন। তবুও কি তারা মিথ্যাকে বিশ্বাস করবে এবং তারা কি আল্লাহ্র অনুগ্রহ অস্বীকার করবেন?
আল্লামা শাওকানী (রঃ) উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, এ আয়াতের মর্ম হলো, আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজস্ব প্রজাতির মধ্যে থেকেই জোড়া বানিয়েছেন, যেন তোমরা তার সাথে অন্তরের সম্পর্কের ভিত্তিতে মিলিত হতে পারো। কেননা প্রত্যেক প্রজাতিই তার স্বজাতির প্রতি মনের আকর্ষণ বোধ করে। আর ভিন্ন প্রজাতি থেকে তার মনে অনুরুপ আকর্ষণ থাকে না। মনের এ আকর্ষণ ও বিশেষ সম্পর্কের কারণেই বংশ বৃদ্ধি হয়ে থাকে। আর এ-ই হচ্ছে বিয়ের মূল উদ্দেশ্য। স্বামী-স্ত্রীর আবেগ উচ্ছ্বাসপূর্ণ প্রেম-ভালোবাসা পরিপূর্ণতা লাভ করে সন্তানের মাধ্যমেই। সন্তান হচ্ছে দাম্পত্য জীবনের নিঙ্কলংক পুষ্প বিশেষ। আল্লামা আলুসী (রঃ) তাঁর তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ধন-সম্পদ হচ্ছে প্রাণ বাঁচানোর উপায় আর সন্তান-সন্ততি হচ্ছে বংশ তথা মানব প্রজাতির রক্ষার মাধ্যম।
বস্তুত পৃথিবীতে কত অগণিত মানুষ এমন রয়েছে যাদের সম্পদের কোন অভাব নেই। কিন্তু তা ভোগ করার জন্য কোন আপন জন নেই। হাজার চেষ্টা সাধনা এবং কামনা করেও তারা সন্তান লাভ করতে পারছে না। আবার কত অসংখ্য লোক দেখা যায়, যারা কামনা না করেও বহু সংখ্যক সন্তানের জনক। কিন্তু তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ নেই। তাই বলতে হয়, সন্তান হওয়া না হওয়া এক মাত্র আল্লাহ্র পক্ষ থেকে এক বিশেষ নি’আমত।
কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে ঃ
আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহ্রই। তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন অথবা দান করে পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা তাকে করে দেন বন্ধ্যা, তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান। (সুরা শুরা-৪৯-৫০ আয়াত)। মানুষ যত বৈষয়িক শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারীই হোক না কেন, ইচ্ছামত সন্তান জন্মাবার ক্ষমতা তার নেই। অন্যদের সন্তান দান তো দূরের কথা। যার ভাগ্যে সন্তান নেই সে কোন উপায় অবলম্বন করেও সন্তান লাভ করতে সক্ষম হয় না। আল্লাহ্ যাকে কেবল পুত্র সন্তানই দিয়েছেন সে কোন উপায়েই একটি কন্যা সন্তান লাভ করতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রত্যেক মানুষই চরমভাবে অক্ষম। এরপরও যদি কেউ আল্লাহ্ ছাড়া অপর কোন সত্তাকে এরূপ ক্ষমতার মালিক বলে বিশ্বাস করে তবে তা তার অদূরদর্শিতারই ফল। এর পরিণতি তাকেই ভোগ করতে হবে।
কোরআনে আল্লাহ্ বলেন ঃ
হে আমাদের প্রতিপালক। আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান কর যারা হবে আমাদের জন্য নয়ন প্রীতিকর এবং আমাদেরকে কর মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য। (সূরা-ফুরক্বন আয়াত ৭৪), অন্যত্র কোরানে বলেন, হে আমার প্রতিপালক। আমাকে তুমি তোমার নিকট হতে সৎ বংশধর দান কর। নিশ্চয়ই তুমি প্রার্থনা শ্রবণকারী। (সূরা আলে ইমরান আয়াত ৩৮)। সন্তান আল্লাহর দেওয়া এক উত্তম নি’আমত। এ নি’আমতের সুফল মৃত্যুর পরও ভোগ করা যায়। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসুলে করীম (সাঃ) বলেছেন ঃ মানুষ যখন মৃত্যু বরণ করে তখন তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য তখনো তিন প্রকার আমলের ফল সে পেয়ে থাকে (১) সদকায়ে জারিয়া (২) এমন ইল্ম ও বিদ্যা যার সুফল ভোগ করা যায় (৩) এমন সচ্চরিত্রবান সন্তান, যে তার জন্য দু’আ করতে থাকে। সৎসন্তান রেখে যাওয়াকে ‘আমল’ বলার কারণ এই যে, সন্তান পিতা-মাতার কারণেই দুনিয়ায় আগমন করে থাকে এবং তাদের  সযতœ প্রতিপালনের ফলেই সে চরিত্রবান হতে পারে। হাদীসে সন্তান কর্তৃক দু’আর কথা উল্লেখ করার মাধ্যমে পিতা-মাতার জন্য দু’আ করার ব্যাপারে সন্তানকে উৎসাহ দান করা হয়েছে। কাজেই প্রত্যেক সন্তানের কর্তব্য হচ্ছে পিতা-মাতার জন্য সব সময় আল্লাহ্র নিকট দু’আ করা। জীবিত সন্তান যেমন পিতা-মাতার জন্য নি’আমত অনুরূপভাবে মৃত সন্তানও তাদের জন্য নি’আমত স্বরূপ। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসুল কারীম (সাঃ) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে যার দুটি সন্তান মারা যাবে তাকে আল্লাহ্ তাআলা জান্নাত দান করবেন। হযরত আয়শা (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, যদি কারো একটি মারা যায? উত্তরে তিনি বলেন, একটি হলেও।
হযরত আবু মুছা আশআরী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেছেন- আল্লাহতাআলা মালাকুল মাউতকে বলেন, তুমি আমার বান্দার সন্তানের রুহ কবয করেছো ও তুমি তার নয়ন মনি ও কলিজার টুকরাকে কেড়ে নিয়েছো? ফেরেশতা বলেন, হ্যাঁ। আল্লাহ তাআলা জিজ্ঞেস করেন, সে কি বলেছে? ফেরেশতা বলেন, সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্নালিল্লাহ বলেছে। তখন আল্লাহতাআলা বলেন, আমার বান্দার জন্য জান্নাতে একটি বালাখানা তৈরি কর এবং তার নাম রাখ ‘বায়তুল হামদ’। সন্তান-সন্ততি যেমন আল্লাহ্র অন্যতম নি’আমত তদ্রুপ পরীক্ষার বস্তুও বটে। কারণ পৃথিবী মানব জাতির জন্য পরীক্ষার বস্তু হিসেবে স্বীকৃত। তাই আল্লাহ্্র দেওয়া ধন-সম্পদ আর সন্তান পরীক্ষার বিষয় সমূহের মধ্যে অন্যতম।
এ পর্যায়ে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ আর জেনে রাখ যে, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি এক পরীক্ষা এবং আল্লাহরই নিকট রয়েছে মহাপুরস্কার। (সূরা আনফাল আয়াত ২৮)। উক্ত আয়াত থেকে এ কথা প্রতীয়মান হয় যে, যেমন করে ধন-সম্পদ আল্লাহর দেওয়া নি’আমত সন্তান-সন্ততিও অনুরূপভাবে আল্লাহর দেয়া নি’আমত। অন্যায় পথে ব্যয় করলে কিংবা যথাস্থানে ব্যয় না করলে যেমন আমানতে খিয়ানত হয়, সন্তান-সন্ততিকেও ভুল পথে এবং অন্যায় কাজে নিয়োজিত করলে তেমনি আল্লাহ্র আমানতে খিয়ানত হবে। সন্তান মাতা-পিতার বিপদের কারণ হবে ঃ পরিশেষে বলা যেতে পারে যে, সন্তান-সন্ততি আল্লাহ পদত্ত অন্যতম নি’আমত বটে। তবে সে সন্তানকে অবশ্যই সচ্চরিত্রবান ও দীনদার হতে হবে। আর সন্তান যদি অসৎ প্রকৃতির হয়, তবে এ সন্তান মাতা-পিতার বিপদের কারণ হবে।
শিশুর প্রতি মহানবী (সাঃ)-এর ভালোবাসাঃ
রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর অন্তরে শিশুদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ ও অকৃতিম ভালোবাসা ছিল। তিনি এ বিশ্ব চরাচরে ‘রহমাতুল্লিল আলামীন’ হিসাবে তাশরীফ এনেছেন। আল্লাহর প্রতিপালন যেমন সর্বজনীন মহানবী (সাঃ) এর প্রেম ভালোবাসাও তেমনি সর্বজনীন। হাদীতে বর্ণিত আছেঃ একবার মহানবী (সাঃ)-এর কানে হযরত হুসাইন (রাঃ) এর কান্নার শব্দ এলো। এতে তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত হলেন। তিনি হযরত ফাতিমা (রাঃ)কে বললেন, তুমি কি জান না, তার কান্না আমাকে কষ্ট দেয়? হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শিশু-কিশোরদের নিকট দিয়ে যাতায়াত কালে তাদেরকে সালাম করতেন। একবার রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ভাষণ দানের নিমিত্তে মিম্বরে আরোহণ করে দেখতে পেলেন যে, হাসান ও হুসাইন (রাঃ) দৌড়াদৌড়ী করছেন এবং পা পিছনে পড়ে যাচ্ছেন। তিনি ভাষণ দান বন্ধ করে মিম্বর থেকে নেমে আসলেন শিশু দু’টির দিকে অগ্রসর হয়ে দুই বাহুতে উঠিয়ে নিলেন। তারপর মিম্বরে আরোহণ করে বললেনঃ হে লোকসকল, তোমাদের ধন-সম্পদ এক পরীক্ষার বস্তু, আল্লাহর এ বাণী সত্যিই। আল্লাহর শপথ, আমি আমার এই দুই নাতিকে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে পা পিছলে পড়েছে দেখে নিজেকে সংবরণ করতে পারলাম না, তাই দৌড়ে গিয়ে এদের উঠিয়ে নিলাম। এক দিন রাসূল (সাঃ) নামায আদায় করছিলেন আর যখন হযরত হাসান ও হুসাইন (রাঃ) এসে তাঁকে সিজদারত অবস্থায় পেয়ে একেবারে পিঠে চড়ে বসলেন। তিনি সিজদা দীর্ঘায়িত করলেন। আর তাঁরা পিঠ থেকে না নামা পর্যন্ত তিনিও তাঁদের নামিয়ে দিলেন না। রাসুলুল্লাহ্ (সাঃ) সালাম ফিরালে সাহাবাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল আমরা লক্ষ্য করলাম যে, আপনি সিজদা দীর্ঘায়িত করেছেন। তিনি উত্তরে বললেন, আমার নাতিদ্বয় আমাকে সাওয়ারী বানিয়েছে। কাজেই তাঁদেরকে তাড়াতাড়ি নামিয়ে দেওয়াটা আমার পছন্দ হয়নি। রাসূল করীম (সাঃ) কখনও কখনও শিশুদের কান্না শুনতে পেলে নামায সংক্ষেপ করে দিতেন এবং বলতেন, ‘আমি চাই না যে, তার মায়ের কষ্ট হোক’। একদা সকালে রাসূলে কারীম (সাঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর ঘরের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করছিলেন আর তখন তাঁর কানে হযরত হুসাইন (রাঃ) এর কান্নার আওয়াজ এলো। নবীজীর তা অপছন্দ হল। তিনি ফাতিমাকে ভৎসনার সূরে বললেন, তুমি কি জান না যে, তাঁর ক্রন্দন আমার মনে ব্যথা দেয়। হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর তুলনায় সন্তান-সন্ততির প্রতি অধিক স্নেহ-মমতা পোষণকারী আমি কাউকে দেখিনি। তাঁর পুত্র ইবরাহীম (রাঃ) মদীনায় উঁচু প্রান্তে ধাত্রী মায়ের কাছে দুধ পান করতেন। তিনি প্রায়ই সেখানে যেতেন এবং আমরাও তাঁর সাথে যেতাম। তিনি ঐ ঘরে যেতেন অথচ সেই ঘরটি প্রায়ই ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকত। কারণ ইবরাহীমের ধাত্রী মায়ের স্বামী ছিল একজন কর্মকার। তিনি ইবরাহীমকে কোলে তুলে নিতেন এবং আদর করে চুমু দিতেন, এরপর চলে আসতেন। বর্ণনাকারী বলেন, যখন ইবরাহীম (রাঃ) ইনতিকাল করেন তখন রাসূল (রাঃ) বললেনঃ ইবরাহীম আমার পুত্র। সে দুধ পানের বয়সে ইনতিকাল করেছে। সুতরাং জান্নাতে তাকে একজন ধাত্রী দুধ পান করাবে। হযরত ইবনে উমর (রাঃ) বলেন, রাসূলে কারীম (সাঃ)-এর নেতৃত্বাধীন কোন যুদ্ধে এক মহিলাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেল। এতে রাসূলে কারীম (সাঃ) গভীরভাবে মর্মাহত হন এবং নারী ও শিশুদের হত্যা করতে নিষেধ করেন। মহানবী (সাঃ) বলেছেন ঃ তোমরা তোমাদের সন্তানদের যতœ নিবে এবং তাদের আদব-কায়দা শিষ্টাচার শিক্ষা দিবে। মহানবী (সাঃ) আরো বলেছেন ঃ তোমরা শিশুদের ভালবাস এবং তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শণ কর। তাদের সাথে কোন ওয়াদা করলে তা পূর্ণ কর। কেননা তারা তোমাদেরকে তাদের রিযিক সরবরাহকারী বলে জানে। পরিশেষে বলা যেতে পারে যে, মহানবী (সাঃ) এর অকৃত্রিম ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা সবার জন্য নিবেদিত। শিশু যেহেতু দুনিয়ায় পুষ্প বিশেষ, তাই তাদের খুব ভালবাসতেন, আদর করতেন স্নেহ করতেন। কাজেই আমাদেরও শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা রাখা উচিত।

*লেখক-মাওলানা মোঃ মারুফ বিল্লাহ্,

খতীব-আলমবাগ জামে মসজিদ,

মেরুল বাড্ডা,

ঢাকা। 


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor