Space For Advertisement

নারীর পেশা পুরুষের পেশা

যোগ্যতা-দক্ষতাই পেশায় সাফল্যের মূল

নারীর পেশা পুরুষের পেশা

ঢাকা, বুধবার, ২৩ জানুয়ারী ২০১৯ (ফিচার ডেস্ক) :  মেয়েরা পুতুল খেলবে আর ছেলেরা গাড়ি-বন্দুক। শৈশব থেকেই আমরা আমাদের সন্তানদের বুঝিয়ে দেই তুমি ছেলেসন্তান আর তুমি মেয়ে সন্তান। সেটা খেলনার মধ্য দিয়ে। আর একটু বড় হওয়ার পর থেকে তো ধাপে ধাপে শুরু হয়ে যায় 'তুমি মেয়ে', 'তুমি ছেলে' এই আঙুল তোলা। ঘরের কাজ মেয়েদের। বাইরের কাজ ছেলেদের। এই প্রথা ভেঙে যখন আমাদের নারীরা বের হয়েছেন, কর্মক্ষেত্রে হচ্ছেন সফল, তখনও নারীকে শুনতে হয় এটা তো ছেলেদের পেশা। তুমি কেন এই পেশায় এসেছ?

পেশা তো পেশাই। কাজ তো কাজই। সেখানে আবার ছেলে আর মেয়ে কী? যারা কাজ জানেন, বোঝেন, কাজে দক্ষ এবং যোগ্য- তারা এ কথাই বলেন। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট কী বলে? 

সিভিল ইঞ্জিনিয়ার তরী। পড়াশোনা শেষ করে সফলভাবে কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান গড়ে নেন। কাজে তার যথেষ্ট সুনাম ছিল। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে মানুষ বাঁধা পড়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে। মা হন তরী। চাকরি থেকে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পান। নতুন মা হওয়া। একটা নতুন পরিচয়। সেই পরিচয় সঙ্গে নিয়েই তিনি আবার জয়েন করেন কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু দেখা দেয় নতুন সমস্যা। মা হয়েছেন। সন্তানের দেখাশোনার বিষয়ে চিন্তিত থাকবেন। বিভিন্ন সময়ে ছুটি নেবেন। আবার মা হবেন। ছুটি-ছাঁটার বিষয় থাকবেই। এসব ভাবনা থেকে অফিস তার প্যারালাল হিসেবে একজন পুরুষ সহকর্মী নেন। বিষয়টা খুব নেতিবাচক লাগে তরীর। কর্মক্ষেত্র থেকে সরে আসেন তিনি। তরীর মতো এমন নারীর অভাব নেই আমাদের সমাজে। নারীরা এই পেশার জন্য উপযুক্ত নন। এমন ভাবনা এবং তার সঙ্গে তেমন আচরণের জন্য পিছিয়ে আসেন তিনি। যেমনটা করেছেন প্রকৌশলী তরী। 

শুধু তরী নন। তার মতো অসংখ্য নারী পেশা নিয়ে নানা ধরনের জটিলতায় পড়েন। আবার পেশা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও স্বামী, বাবা কিংবা পরিবারের বাধার সম্মুখীন হয়ে থাকেন। জন্মের পর থেকে আমরা ছেলেদের পেশা ও মেয়েদের পেশার পার্থক্য সম্পর্কিত একটা ধারণা পেয়ে যাই। ছেলেদের পেশাগুলো হবে চ্যালেঞ্জিং আর মেয়েদের অপেক্ষাকৃত কম চ্যালেঞ্জিং, কিছুটা আরামদায়ক ও কোনো জায়গায় বসে কাজ করা যায়- এমন পেশাগুলো হবে মেয়েদের। সেই অর্থে মেয়েরা হবে শিক্ষক, ডাক্তার কিংবা প্রশাসনিক কর্মকর্তা। আর ছেলেরা ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক, বৈমানিক, স্থাপত্যশিল্পী হবে।

প্রকৃতি একটা ভিন্ন গড়নে সৃষ্টি করেছেন পুরুষ এবং নারীকে। প্রাকৃতিক কারণেই নারী-পুরুষের শারীরিক গড়ন ভিন্ন হয়। কিন্তু সবকিছু জয় করার মতো নারী এখন দ্বিগুণ পরিশ্রম আর মেধার মধ্য দিয়ে নিজেকে জয় করতে পেরেছেন। অনেক বাবা-মা সন্তানকে তেমন করেই মানুষ করেন। ছেলেমেয়ে আলাদা করেন না। মেয়েসন্তানরা নিজেদের সুন্দর করে গড়ে তুলে যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেন তখন সমাজ তাদের আঙুল তুলে দেখায় এটা তোমাদের পেশা নয়। আমাদের সমাজে একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো- মেয়েরা শারীরিক পরিশ্রম করতে পারে না। এ জন্য আরামদায়ক পেশা তাদের জন্য উপযুক্ত। অথচ একটু গভীরভাবে চিন্তা করে বোঝা যায়, সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির অধিকাংশ নারী কায়িক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। ফসল উৎপাদন, ইট ভাঙা ও নির্মাণের মতো কঠিন কাজগুলো নারীরাও করছেন।

সমাজবিজ্ঞানী ড. মাহবুবা নাসরীন জানান, আমরা আমাদের সমাজে কী দেখে এসেছি? আমরা দেখেছি বাবারা অর্থ উপার্জন করবে। আর মায়েরা ঘরে থেকে ঘর-গেরস্থালির কাজ সামলাবেন। সবার সেবা করবেন। নারীকে এমন কিছু কাজ বেঁধে দেওয়া হয়, যে কাজগুলো সেবামূলক এবং যেগুলো করলে সংসারের অন্যান্য কাজ করতে অসুবিধা হবে না। নারী যত শিক্ষিতই হোক না কেন, অনেক ক্ষেত্রেই নারীসুলভ কাজ থেকে বের হতে পারে না। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আমরা নারী অধিকার কিংবা স্বাধীনতার কথা অনেক বলি। কিন্তু দিন শেষে নারীকেই সন্তান, ঘর-সংসার সামলাতে হয়। এই দায়িত্বগুলো যদি পরিবারের সবাই মিলে ভাগ করে নিতেন তাহলে নারী তার নিজস্ব কাজে মনোযোগ দিতে পারতেন। আবার আমরা অনেক সময় দেখি বাবা-মা দু'জনেই চাকরি করছেন। কিন্তু সন্তানের দেখভালের জন্য মাকেই চাকরি ছেড়ে আসতে হয়। কেননা পরিবারে তৃতীয় ব্যক্তি নেই, যিনি কি-না সন্তানের দেখভাল কিংবা স্কুল থেকে আনা-নেওয়া করবে। এখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যদি এমন হতো ছেলেমেয়েদের নিরাপদে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া কিংবা পর্যাপ্ত পরিমাণে ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা থাকত তাহলে নারীকে তার কর্মক্ষেত্র থেকে সরে আসতে হতো না। এটা একটা বিষয়। আরেকটা বিষয় যখন সন্তান নিরাপদে আছে জানতে পারেন একজন মা তখন কিন্তু তিনি সবকাজেই মনোযোগী হতে পারেন। তখন কিন্তু অফিস কখনও কটাক্ষ করতে পারত না আসলে নারীদের এই পেশায় আসা উচিত না।

সূত্র : সমকাল 


সংশ্লিষ্ট আরও খবর

সর্বশেষ খবর

Today's Visitor