বৃহস্পতিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

তামাকজাত দ্রব্যের উপর করারোপ ও সিগারেটর মূল্যস্তর কমানোর দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

মুক্তখবর :
এপ্রিল ১৬, ২০১৯
news-image

আরিফুল ইসলাম : আজ জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে তামাকজাত দ্রব্যের উপর সুনির্দিষ্ট করারোপ ও সিগারেটর মূল্যস্তর কমানোর দাবিতে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি এবং বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট। বাংলাদেশে সিগারেটে বহুস্তর বিশিষ্ট করকাঠামো চালু থাকায় বাজারে অত্যন্ত সস্তা এবং সহজলভ্য সিগারেট বিদ্যমান। ফলে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে ভোক্তা তুলনামূলকভাবে কমদামি সিগারেট বেছে নিতে পারছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিগারেটের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে প্রায় একইরকম রয়েছে। এছাড়া করের ভিত্তি এবং করহার খুবই কম হওয়ায় বিড়ি এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য (জর্দা ও গুল) সহজলভ্য থেকে যাচ্ছে। তামাকের ব্যবহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে কর বৃদ্ধির মাধ্যমে তামাকপণ্যের মূল্য বাড়ানো। তামাক ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে ২০১৯-২০ কর প্রস্তাব বৃদ্ধির প্রস্তাবে, সিগারেটের মূল্যস্তর ৪টি থেকে কমিয়ে ২টি নির্ধারণ করা; করারোপের ক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে একটি মূল্যস্তর (নিম্নস্তর) এবং উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরকে একত্রিত করে আরেকটি মূল্যস্তরে (উচ্চস্তর) নিয়ে আসা; নিম্নস্তরে ১০ শলাকা সিগারটের খুচরা মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা এবং উচ্চস্তরে ১০ শলাকা সিগারেটের খুচরা মূল্য ন্যূনতম ১০৫ টাকা নির্ধারণ করে ৬৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; এবং সকল ক্ষেত্রে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটে ৫ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। এছাড়া বিড়ির মূল্য বিভাজন তুলে দিয়ে ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫% সম্পূরক শুল্ক ও ৬ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; এবং ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২৮ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫% সম্পূরক শুল্ক এবং ৪.৮ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য (জর্দা ও গুল)-র ক্ষেত্রে ট্যারিফ ভ্যালু প্রথা বিলুপ্ত করে সিগারেট ও বিড়ির ন্যায় ‘খুচরা মূল্যের’ ভিত্তিতে করারোপ করা; প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৩৫ টাকা এবং প্রতি ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫% সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা; এবং প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার উপর ৫ টাকা ও প্রতি ১০ গ্রাম গুলের উপর ৩ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করার সুপারিশ করা হয়।

আজ (১৬ এপ্রিল ২০১৯, মঙ্গলবার) সকাল ১১ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে তামাকজাত দ্রব্যের উপর সুনির্দিষ্ট করারোপ ও সিগারেটের মূল্যস্তর কমানোর দাবীতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকরা এই দাবী জানান। অর্থনৈতিক গবেষনা ব্যুরো-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি এবং বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোট সম্মিলিতভাবে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনৈতিক গবেষনা ব্যুরো এর ফোকাল পার্সন ড. রুমানা হক।

বক্তারা বলেন এ সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছেড়ে দিতে উৎসাহিত হবে। সিগারেটের ব্যবহার ১৪% থেকে হ্রাস পেয়ে প্রায় ১২.৫% এবং বিড়ির ব্যবহার ৫% থেকে হ্রাস পেয়ে ৩.৪% হবে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে ১ মিলিয়ন বর্তমান ধূমপায়ীর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে । এ প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন হলে৬ হাজার ৬৮০ কোটি থেকে ১১ হাজার ৯৮০ কোটি টাকার মধ্যে (জিডিপি’র ০.৪ শতাংশ পর্যন্ত) অতিরিক্ত রাজস্ব আয় অর্জিত হবে। এই অতিরিক্ত রাজস্ব তামাক ব্যবহারের ক্ষতি হ্রাস, অকালমৃত্যু রোধ এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব হবে।

বক্তব্যে বলা হয়, ২০১৮ সালে তামাকজনিত রোগে প্রায় ১ লক্ষ ২৬ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাক ব্যবহারের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, একইসময়ে তামাকখাত থেকে অর্জিত রাজস্ব আয়ের পরিমাণ মাত্র ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর বাড়ালে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং তামাকের ব্যবহার ও তামাকজনিত এই মৃত্যু ও ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে।

আসন্ন বাজেটে তামাকজাত পণ্যের উপর করারোপের জন্য সুনিদিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরে আয়োজকরা কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করেন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সকল তামাকপণ্যে ‘খুচরা মূল্যের’ (MRP) ভিত্তিতে করারোপ করতে হবে; মূল্যস্ফীতি এবং আয় বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে তামাক পণ্যের ওপর সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ ও নিয়মিতভাবে কর বৃদ্ধি করতে হবে; বিভিন্ন তামাকপণ্য ও ব্রান্ডের মধ্যে সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে; করারোপ প্রক্রিয়া সহজ করতে তামাকপণ্যের মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন তুলে দিতে হবে; সকল ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য উৎপাদনকারীকে করজালের আওতায় নিয়ে আসতে হবে; একটি সহজ এবং কার্যকর তামাক কর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে; সকল প্রকার ই-সিগারেট এবং হিটেড তামাকপণ্যের উৎপাদন, আমদানি এবং বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ কররতে হবে; কঠোর লাইসেন্সিং এবং ট্রেসিং ব্যবস্থাসহ তামাক কর প্রশাসন শক্তিশালী করতে হবে এবং কর ফাঁকির জন্য শাস্তিমূলক জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির প্রকল্প পরিচালক ডা. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক, দ্য ইউনিয়ন এর কারিগরী পরামর্শক এ্যডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম, প্রত্যাশা মাদক বিরোধী সংগঠন এর সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ তামাক বিরোধী জোটের ভারপ্রাপ্ত সমস্বয়কারী হেলাল আহমেদ, এইড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আমিনুল ইসলাম বকুল, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট এর পরিচালক (প্রশাসন) গাউস পিয়ারী এবং নাটাব এর প্রকল্প সমন্বয়কারী খলিল উল্লাহ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের কর্মসূচী ব্যবস্থাপক সৈয়দা অনন্যা রহমান।