মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

কাঁদছে কৃষক, পুড়ছে ধান!

মুক্তখবর :
মে ২২, ২০১৯
news-image

মোহাম্মদ আবু নোমান
সন্তানের মমতায় লালন, কঠোর পরিশ্রম ও শরীরের রক্ত পানি করে ফলানো ফসল এখন কৃষকের গলার কাঁটা। অস্থিচর্মসার কৃষক, ভাঙা ঘর, নিজের পেটে জোটে না তিন বেলা আহার, গ্রীষ্মের খরতাপ, হাড় কাপানো শীত ছাড়াও রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে, মাথার ঘাম ঝরিয়ে যে সোনালি ফসল কৃষকরা ফলায়, তার ন্যায্য মূল্য নেই! যথার্থ মূল্য না পেয়ে তারা দিশেহারা। এ অবস্থা প্রলম্বিত হলে কৃষকসমাজ ফসল উৎপাদন ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। গত কয়েকদিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি দেখা গেছেÑ ‘আর করব না ধান চাষ, দেখব তোরা কী খাস!’ ছবির বিষয় ও ভাষা খুব অর্থবহ এবং ভাবনারও।
কৃষক ধান চাষ করেই জীবন চালায়। দেশের ১৭ কোটি মানুষের মুখে অন্ন জুগিয়েও অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে কৃষকরা। কৃষকের ধানে ‘আগুন’ লাগলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা যাবে না। সাধারণ কৃষকদের ধান ওঠার পর তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি করতে হয়। কারণ তারা ধারকর্জ করে, অনেকেই উচ্চ সুদের উপর টাকা নিয়ে ধান চাষ করেছেন। এক শ্রেণির অসাধু, অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও দালালচক্র কৃষকের এই অসহায় অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে। কৃষক তার বিবিধ ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে স্বল্পমূল্যে মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে তার ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবারই বিক্রয় করতে যেয়ে কৃষকের মাথায় হাত পরে। কারণ তারা ন্যায্য মূল্য পায় না। এর কারণ, ‘সরকারি ধান সংগ্রহে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা’ এবং ‘ধান ক্রয় প্রক্রিয়ায় ফড়িয়া-মজুদদারদের নিয়ন্ত্রণ’। বাংলার কৃষকের এ দুর্দিন অনাদিকাল ধরে চলে আসছে। নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পোকা-মাকড়ের উৎপাত মোকাবেলা করে ধান উৎপাদন করে কৃষক ন্যায্য মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারবে না, এটা হতে পারে না। যে ধানের দাম মণপ্রতি কম হলেও হাজারের ঊর্ধ্বে হওয়ার কথা, সেই ধান মৌসুমের শুরুর দিকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয় কৃষক। ৫০০-৫৫০ টাকায় এক মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরিও পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এখানে কৃষক বড় অসহায়।
ইতোমধ্যে কৃষক ‘পিতাদের’ পাশে তাদের সন্তানদের দাঁড়াতে দেখা গেছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সিলেটের এক কৃষকের খেতের ধান কাটার কাজে সহায়তা করেছে। এর আগে টাঙ্গাইলের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরাও কৃষকের ধান কেটে দিয়েছেন, যিনি মজুরের অভাবে ধান কাটতে পারছিলেন না। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও এরই মধ্যে এ বিষয়ে আন্দোলনে করেছে ও ধান কেটে দিয়েছে। তারা সংখ্যায় কম, কিন্তু বিষয়টি আশাজাগানিয়া। এক মণ ধান বিক্রি করে কৃষক পান ৫০০ টাকা। আর একজন মজুরকে দিনে দিতে হয় ৮৫০ টাকা। ফলে অনেক কৃষকই মজুর লাগাতে পারছেন না। তরুণেরা ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে কিংবা মাঠের ধান কাটতে কৃষককে সহায়তা করে প্রমাণ করলেন, তারাও সুখে-দুঃখে গণমানুষের পাশে দাঁড়াতে দ্বিধা করেন না। তরুণেরা যে কখনো ভুল করেন না, তার প্রমাণ আমরা ভাষা আন্দোলনে পেয়েছি, পেয়েছি ঊনসত্তরে, একাত্তরেও। যে তরুণেরা কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের অভিনন্দন!
প্রতিবছরই ধানের মৌসুমে এ অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। এ পরিস্থিতি সুশাসনেরও অন্তরায়। কৃষকের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেলে, ন্যায্য মূল্য না পেলে আমাদের ‘বীর কৃষকরা’ ধান চাষ কেন করবে? এখন তো কৃষকের দৈন্যদশা থাকার কথা নয়। সোনার ধান গোলায় থাকবে, কেন আজ আগুনে পুড়বে, রক্তঝরা কষ্ট করে সেই ধান কেন আজ রাজপথে ছড়াবে? সরকার উদাসীন থাকতে পারে না। সরকারকেই এর জবাব দিতে হবে। বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্য, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে জনগণের পাশাপাশি উৎপাদকদের স্বার্থও রক্ষা করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে ফড়িয়া, মজুদদার ও কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছলচাতুরীতে বাজার, ভোক্তা, এমনকি সরকারও বেকায়দায় পড়ে! এটাই বড় আশ্চর্য্যরে বিষয়! ধানের ন্যায্য মূল্য থেকে কৃষককুলের বঞ্চিত হওয়ার কারণও তাই। সরকার অনেক কিছুতে ভর্তুকি দেয়। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ থাকা জরুরি। প্রশাসনের নজরদারিও প্রয়োজন।
কৃষককে ধানের ন্যায্য মূল্য দিতে, সরকারকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান না কিনে, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনতে হবে। সিন্ডিকেটবাজি বন্ধ করতে হবে। মাঠে ধান থাকার সময়ই সরকারি লোকদের মনিটরিং করতে যেতে হবে। কৃষককে ভর্তুকি দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে ধান কেনার ব্যাপারে সুষ্ঠু নীতিমালা করা হোক। কৃষিজাত পণ্য বাজারজাতকরণের একটি স্থায়ী ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম কেন চালু করা হয় না?
আসন্ন বাজেটে কৃষি উপকরণ যেমন, সার, কীটনাশক ও সেচের খরচের ওপর ভর্তুকি বাড়াতে হবে। ব্যাপারী ও দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অতি জরুরি। চালকল মালিকদেরও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। দরকার হলে ইলিশ ধরা বা আম সংগ্রহের মতো ধান সংগ্রহের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।
কৃষকের দুঃখ-কষ্ট সরকারকে অনুধাবন করতে হবে। ধান কেনাবেচায় কোনো দালালি যেন না থাকে। সহজ-সরল কৃষক যেন স্থানীয় টাউট-বাটপাড়ের হাতে না পড়ে। বিক্রি করা ফসলের অর্থ যেন কৃষক নির্বিবাদে ভোগ করতে পারে। স্থানীয় চাঁদাবাজ কর্তৃক যেন কষ্টার্জিত অর্থের ভাগীদার না হয়, এ জন্য কৃষককে অভয় দান করতে হবে। ভবিষ্যতে যেন কৃষক বোরো ফসল উৎপাদনে নিরুৎসাহ না হয় সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখতে হবে। সরকারকে ভর্তুকি দিয়ে কৃষক বাঁচাতে হবে। কাঁদছে কৃষক, পুড়ছে ধান। কৃষকের এই কান্না বন্ধ করতে হবে। ধানের দর নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কাম্য নয়। সরকারের তরফ থেকে ধান-চাল সংগ্রহের নিয়ম বদলাতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনতে হবে। উৎপাদনের চেয়ে বিক্রি কম হলে তো চলবে না!
বাংলাদেশে কী না হয়? ধান, পাট, আখ, গম থেকে শুরু করে ফলমূল, আলু, পিয়াজ, সিম, মুলা, ইত্যাদি শাকসবজি বারোমাসই উৎপাদিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয়, এসব বিক্রয় প্রক্রিয়ায় ফড়িয়াদের নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক নেতাবেশী দালালদের অনৈতিক দাপট ও চাঁদাবাজির কারণে প্রতিটি ফসলেরই ন্যায্য দাম থেকে কৃষক বঞ্চিত হয়। ধানের বাজার ফড়িয়া ও চালকল মালিকদের হাতের মুঠোয় থাকায়, চালকলের মালিকরা একজোট হয়ে ধান ওঠার সময় ধান না কেনার ভান করে দামটা কমিয়ে রেখে, সস্তা দরে ধান কেনার কৌশল গ্রহণ করে। অজুহাত চাউর করে, গুদামে জায়গা নেই, আগের মৌসুমের ধানই বিক্রি হয়নি, নতুন ধান দিয়ে করব কী ইত্যাদি! এসব বিষয়ে সমন্বিতভাবে সরকারি সেবা সহযোগিতা ও দায়-দায়িত্বের যথেষ্ট অভাব। তাই এসব ক্ষেত্রে সরকারিভাবে যথাযথ হস্তক্ষেপ ও পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
গত বছরের তুলনায় এবার বাংলাদেশে ফলন ভালো হয়েছে। যে দেশের ধানের বাম্পার ফলনও কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না, সে দেশের কৃষক ভালো থাকবে কী করে? এটা দুঃখজনক। ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে। ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তারা।
সারা দেশের ধান-চালের বাজারে ফড়িয়ারা গুজব ছড়াচ্ছে, সরকার বিদেশ থেকে বেশি চাল আমদানি করায় গুদামে জায়গা নেই। তাই এবার বেশি ধান-চাল কিনতে পারবে না। এসব গুজবের ব্যাপারে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে ও কৃষিকে টেকাতে হলে নি®প্রাণ তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এখনই কিছু করা দরকার। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় মিলে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক ডেকে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কৃষি মন্ত্রণালয় সময় থাকতে যদি ধান সংগ্রহের উদ্যোগ নিত তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষক পড়ত না। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মধ্যস্বত্বভোগী ধান ব্যবসায়ীদের গ্যাড়াকলে পড়ে ৫০০/ ৫৫০ টাকা মণে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষক। বাজারে ৫০/৬০ টাকা চালের কেজি থাকলে, ধানের কেজি ১০/ ১২ টাকা মেনে নেওয়া যায় কী? যাদের দেখার কথা তারা চোখ বুজে থাকলে এ অবস্থাতো হবেই!