মঙ্গলবার, ২৫শে জুন, ২০১৯ ইং

ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন রামুর দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধবিহারে

মুক্তখবর :
জুন ৮, ২০১৯
news-image

ঢাকা, শনিবার, ০৮ জুন ২০১৯ (ফিচার ডেস্ক):  কক্সবাজারে বৌদ্ধ পুরাকীর্তির শহর হিসেবে আগে থেকেই রম্যভূমি রামুর রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। শুধু বৌদ্ধবিহার নয়, রামুতে আছে রাবার বাগান, রাম সীতার স্মৃতি বিজড়িত রামকোট তীর্থধাম, কানারাজার সুড়ঙ্গ (আঁধার মানিক), নারকেল বাগান, জগৎজ্যোতি চিলড্রেন ওয়েলফেয়ার হোমসহ দেখার মতো অনেক কিছু। তাই এই ঈদের ছুটিতে সেই রামু ঘুরে আসতে পারেন।

ঢাকা-চট্টগ্রাম কিংবা দেশের যেকোনো স্থান থেকে রামু যেতে হলে আপনাকে কক্সবাজারের ১৫ কিলোমিটার আগে রামু বাইপাসে নামতে হবে। তারপর এক কিলোমিটার আগে রামুর বিখ্যাত রাবার বাগান আপনাকে সুন্দরের হাতছানি দেবে। রামু বাইপাস থেকে অথবা চৌমুহনী স্টেশনে এসে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত টমটম বা রিকশায় আপনি রামু ভ্রমণ শুরু করতে পারেন।

শুনে আশ্চর্য হবেন, শুধুমাত্র রামুতেই অপূর্ব কারুকাজে তৈরি ২৭টি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার বা ক্যাং। কাঠের তৈরি অনেকগুলো প্রাচীন সব বৌদ্ধ বিহারের কারণে অনেক আগে থেকেই সারাদেশে রামু নামটি বেশ পরিচিত। ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার পর সেই রামু নামটি আলোচিত সমালোচিত হয় বিশ্বজুড়ে। সেই ঘটনার পরে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত সেসব বৌদ্ধবিহার আরো দৃষ্টিনন্দনভাবে পুননির্মাণ করে দেয়।

যদিও পুড়ে যাওয়া সেই বিহারগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল কাঠের তৈরি শত শত বছরের প্রাচীন বৌদ্ধবিহার। তবু এই নতুন রামু নানা কারণে এখন পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়।.বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র বা ১০০ফুট বুদ্ধ মূর্তি:
চৌমুহনী স্টেশন থেকে উত্তর দিকে সবুজের মধ্যে শান্ত কোমল পথ মাড়িয়ে জোয়ারিয়ানালা উত্তর মিঠাছড়ি গ্রাম। সেই অসাধারণ সৌন্দর্য ঘেরা পাহাড় চূড়ায় এক টুকরো সবুজের মধ্যে উত্তর-দক্ষিণ কাত হয়ে শোয়া গৌতম বুদ্ধ মূর্তি। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিহারটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূর্তিটি প্রায় অক্ষত থেকে যায়। অন্যান্য বিহারগুলোর মতো এটিও নতুনভাবে নির্মাণ করে সেনাবাহিনী।

তবে সেনাবাহিনী বারটি বিহার নির্মাণ করলেও সবকিছু মিলিয়ে অসাধারণ রূপ পেয়েছে এ বিহারটি। বর্তমানে যে কেউ বিহারটি দেখে অভিভূত হবেনই। বিহারের চমৎকার নির্মাণ শৈলী তো আছেই, এছাড়াও বিহারের আঙিনাকেও সাজানো হয়েছে দারুণভাবে। সেই অসাধারণ সৌন্দর্য্যের মধ্যে নতুনভাবে শোভা পাচ্ছে ২১ ফুট দীর্ঘদিনে সেই মূর্তিটি। বর্তমানে এটি যেন অসাধারণের চেয়েও বেশি অসাধারণ। বলা যায়, রামুর বৌদ্ধ ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র। পাশাপাশি এটিই এখন পর্যটকদের জন্য সবচেয়ে দর্শনীয় স্থান।

ঐতিহাসিক রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার:
চৌমুহনী স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দক্ষিণে, রাজারকুল এলাকায় পাহাড় চূড়ায় বিহারটি অবস্থিত। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ৩০৮ খ্রিস্টপূর্বে সম্রাট অশোক এটি নির্মাণ করেন। প্রবেশ পথের দু’ধারে সারি সারি ঝাউবাথি আর সাজানো গোছানো বাগান আর আশপাশ দেখেই আপনার মনে মুগ্ধতা ছড়াবে। কয়েকশ বছরের প্রাচীন বটবৃক্ষ পেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠতে ওঠতেই আপনার মন পুলকিত হবে। ওপরে দেখবেন বড় বড় দু’টি বুদ্ধমূর্তি। বৌদ্ধদের মতে, এর একটিতে মহামতি গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি স্থাপিত হয়েছে। আশ-পাশে ঘুরলে আর ও অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে পাবেন এখানে। বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র তীর্থস্থান এটি।.জগৎজ্যোতি চিলড্রেন ওয়েলফেয়ার হোম:
রামকোট বণাশ্রম বৌদ্ধ মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই আপনার চোখ যাবে বাম দিকে। কারণ এতো সুন্দর স্থাপনা কার চোখ এড়াতে পারে। দেখবেন অপূর্ব স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত ভবনটি আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এটিই জগৎজ্যোতি চিলড্রেন ওয়েলফেয়ার হোম। প্রায় ১শ অনাথ ছেলেমেয়ের থাকার ঘর এটি। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ভেতরে ঢুকে সবকিছু দেখে আপনার অবশ্যই ভাল লাগবে। ১৯৯৪ সালে ইটালিয়ান নাগরিক ফাদার পিয়াট্রো লুইজি লপি এটি প্রতিষ্ঠা করেন।

রামকোট তীর্থ ধাম:
রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহারটির পাশেই পাহাড় চূড়ায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রী শ্রী রামকোট তীর্থধাম। জনশ্রতি আছে এখানে সীতার মরিচ বাটার পাটা আছে। আছে পঞ্চবটি বন। এই পাহাড়ে ওঠার সময় নাকি সিঁড়ির সংখ্যা বিভ্রাট হয়! তাই আপনিও চাইলে গুনতে পারেন। ভাল লাগবে।

লামার পাহাড় ক্যাং:
রাংকুট থেকে ফেরার পথে দেখে নিতে পারেন লামার পাড়া ক্যাং। লামারপাড়ায় এটি অবস্থিত বলে এর নাম লামারপাড়া ক্যাং। অনেকে থোয়াইংগ্যা চৌধুরীর ক্যাং ও বলে থাকেন। ১৮০০ সালে তৎকালীন রাখাইন জমিদার উথোয়েন অংক্য রাখাইন এটি প্রতিষ্ঠা করেন। পাড়ার ভেতরের শান্ত নিথর কিছুটা পথ মাড়িয়ে এ ক্যাং পৌঁছবেন। দেখে আশ্চর্য হওয়ার মতো এখানে অনেক কিছু আছে। বড় বড় পিতলের ঘণ্টা, অষ্টধাতু নির্মিত দেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তি, শিলালিপি আরও অনেক কিছু। এতো সব মহামূল্যবান পুরাকীর্তি এখানে অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে দেখে মন খারাপও হতে পারে। হয়তো ভাববেন, প্রাচীন এসব পুরাকীর্তি সংরক্ষণে সরকারের কেন এতো অবহেলা?.চেরাংঘাটা বড় ক্যাং:
এ ক্যাংটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে সেদ্ধ করা বিশাল আকৃতির কাঠ। সব কাঠই আনা হয়েছে মিয়ানমারের রেঙ্গুন থেকে। রেঙ্গুনী কারুকাজ আর ক্যাং এর অভ্রভেদীচূড়া, সামনের গুছানো ফুলের বাগান সত্যিই আপনাকে মুগ্ধ করবে। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে যেতে যেতে দেখবেন দু’টি সাদা সিংহ দরজার দু’পাশে বসে আছে। ভয় পাবেন না, ওগুলো শ্বেত পাথরের। উপরে ওঠেই দেখবেন আলো আধাঁরি পরিবেশ আর সেখানে অপূর্ব কারুকাজে খচিত অনেকগুলো বুদ্ধের আসন আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। প্রতিটি আসনে বসানো আছে মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি। আসনে বসানো ছোট-বড় ২২টি মূর্তি ছিল এখানে। তবে ২০১২ সালের হামলার সময় এ বিহার থেকে অনেক মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি লুট করা হয়েছে। এ সময় ধ্বংস করা হয়েছে। সেকালের বড় বড় ১১টি দেয়াল ঘড়ি, তালপাতার উপর লেখা ত্রিপিটক, বুদ্ধের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চিত্রপট, ত্রিপিটক লাইব্রেরিসহ আরও আছে অনেক কিছু। এসবের পরেও এখন যা আছে তা দেখেই আপনি মুগ্ধ হবেন। ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারবেন না। কিন্তু ওখানেই লেখা আছে, ‘ছবি তোলা নিষিদ্ধ’ ।

লালচিং ও সাদাচিং:
এ দুটো পাশাপাশি। একটির রং লাল, অন্যটি সাদা। লালটি নির্মাণ করা হয়েছিল কাঠের অপূর্ব কারুকাজে। ভারতের কলকাতা থেকে এসে মৌরী সওদাগর এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তাই অনেকেই এটিকে কলকিত্যা চিং ও বলেন। কিন্তু ২০১২ সালে লালচিং শতভাগ পুড়ে গেছে। হামলার পর পুরনোটির আদলে আবার নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি পাকা ভবন। এটির পাশেই অবস্থান সাদা চিং এর। এর আসল নাম ‘শাসন ধব্জা মহাজ্যোতিপাল সীমা’। এটি বৌদ্ধদের কাছে অতি পবিত্র স্থান। কথিত আছে, এখানে মিথ্যা শপথ করলেই নেমে আসে বিপদ।

মেরংলোয়া কেন্দ্রীয় সীমা বিহার:
২০১২ সালে হামলার পর এখানে ‘প্রায় তিনশ বছরের পুরনো কাঠের তৈরি দোতলা সেই বিহারটি না থাকলেও বর্তমানে এ বিহারটি আগের চেয়ে আরো বেশি দৃষ্টিনন্দন। শিল্প বৈচিত্রে তৈরি নব-নির্মিত বৌদ্ধবিহার নিচ তলায় ভিক্ষুদের বসার আসন আর উপরে সু-সজ্জিতভাবে রাখা হয়েছে বুদ্ধমূর্তি। এখানে আছে ভিক্ষুসীমা। যেখানে উত্তর দক্ষিণ হয়ে শয়ন অবস্থায় আছে বিরাট একটি বৌদ্ধমূর্তি। এ বিহারের প্রধান সিদ্ধ পুরুষের নাম পন্ডিত সত্য প্রিয় মহাথের। তিনি বাংলাদেশের বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় গুরুদের একজন।

বিখ্যাত রাবার বাগান:
চৌমুহনী স্টেশন থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে গেলেই আপনি পাবেন রামুর বিখ্যাত সেই রাবার বাগান। রাস্তার দু’ধারে সারি সারি রাবার গাছ আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকবে। ১৯৬১ সালে শুরু এ বাগানটি বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬শ একর এলাকায় বিস্তৃত। বাগানের মাঝখানে গড়ে তোলা হয়েছে রামুর সবচেয়ে প্রাচীন ‘রাবার বাগান রেষ্ট হাউস’। এটি এখন ও রামুর অন্যতম পিকনিক স্পট। উঁচু-নিচু পাহাড়-টিলায় সারি সারি রাবার গাছ রামুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঘুরে দেখুন, ভারী হবে আপনার অভিজ্ঞতার ঝুড়ি।

নারকেল বাগান:
রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার ছেড়ে আর এক কিলোমিটার গেলেই পেয়ে যাবেন আইসোলেটেড নারকেল বাগান। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ১৯৮১-৮২ সালের দিকে এ বাগানের কাজ শুরু হয়। বর্তমান এটি দেশের সবচেয়ে বড় মাতৃবাগান। বাগানকে ঘিরে প্রকৃতির অসাধারণ রূপ দেখে আপনার মন খুশিতে নাচবে বৈকি।

সাগর ধোয়া হিমছড়ি:
হিমছড়ি রামুর অন্যতম পর্যটন স্পট হলেও আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের পাশ ঘেঁষে। হিমছড়ি যেন রামুর নিম্নাংশ, যেন পা। বিশাল বঙ্গোপসাগরের দুরন্ত ঢেউয়ের দোলায় দোলায়িত লোনা জলের গভীরে যেন পা ডুবিয়ে আছে রামু। সমুদ্রের পা ঘেঁষে আছে ঝাউবন আর সবুজ পাহাড়। সেই পাহাড় থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে সুন্দরী ঝরণা। বালুচরে ঝিনুক আর লাল কাঁকড়ার আঁকা নকশা দেখে মনে হবে এ যেন শিল্পীর হাতের অসাধারণ শিল্প চিত্র। অদ্ভূত এক সৌন্দর্য সুষমায় মণ্ডিত এই হিমছড়ি।

কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন:
এসি, নন এসি সব ধরনের বিলাসবহুল বাস চলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কে। আপনি চাইলে বিমানেও আসতে পারেন। রাত যাপনের জন্য আছে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের রাবার বাগান রেস্ট হাউজ ও জেলা পরিষদের ডাক বাংলো। তবে এ দু’টিতে রাত যাপনের জন্য পূর্বানুমতি নিতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় কক্সবাজার কোনো হোটেল-মোটেল উঠলে। তখন একঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ তৈরি হয়।