বুধবার, ১৬ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং

ভূ-মধ্যসাগরে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা ৭৫ সহযোগীর একজন আব্দুর রাজ্জাক

মুক্তখবর :
জুলাই ৮, ২০১৯
news-image

ঢাকা, সোমবার, ০৮ জুলাই ২০১৯ (নিজস্ব প্রতিনিধি) : ৬৪ ঘন্টা ভূ-মধ্য সাগরে থাকার পর প্রতিটি মুহুর্ত,  প্রতিটি সেকেন্ড মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করেছি। সাগরে যখন ১৫/২০ ফুট উঁচু হয়ে ঢেউ আসে তখন মনে হয়েছে এই বুঝি মারা গেছি। আমাদের মধ্যে অনেকে ঢেউয়ের কারনে রক্ত বমি করেছে। কখনও ভাবিনি বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানদের কাছে ফিরতে পারব।

কান্না জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন তিউনিসিয়া থেকে দেশে ফেরত আসা আব্দুর রাজ্জাক (৪২)। তিনি গাজীপুর মহানগরের টঙ্গীর দত্তপাড়া এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশীদের একমাত্র ছেলে। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে রাফছানা আক্তার (১৩) অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। ছোট মেয়ে রুবাইয়া আক্তার (৪) ও ছেলে রাফায়েত (৩)।

তিন ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র পুত্র সন্তান আব্দুর রাজ্জাক সবার বড়। বাবা টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকার কাদেরিয়া টেক্সটাইল মিলে চাকরি করতেন। অভাবের সংসার হওয়ায় স্কুলের গন্ডি পার হতে পারেননি। ২০০২ সালে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার বৃদ্ধ বাবা বেকার হয়ে পড়েন। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। এলাকাতেই ছোট্ট একটি মুদি দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ভালই চলছিল তার ব্যবসা।

পরিবারে সদস্যদের মুখে হাসি ফুটানোর স্বপ্ন ছিলঃ
হঠাৎ করে মাদারীপুর এলাকার তার এক আতœীয়ের মাধ্যমে পরিচিত হয় ওই এলাকার দালাল “রেবা’র” (০১৭৩১-১৩৯৩৯৯) সাথে। দালাল রেবা প্রায়ই তাকে ইতালী যাওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকে এবং বিভিন্ন ধরনের লোভ দেখায়। এতে সে স্বপ্ন দেখে ইতালী গিয়ে বৃদ্ধ বাবা-মা ও স্ত্রী-সন্তানদের মুখে হাসি ফুটাবে। এ চিন্তা থেকে দালালের কথা মতো আব্দুর রাজ্জাক বিভিন্ন এনজিও, সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ও স্বজনদের কাছ থেকে ধার করে বিভিন্ন সময় ব্যাংকের মাধ্যমে ১১ লাখ টাকা জমা দেন।

চার মাস বন্দি থাকেন একটি ঘরেঃ
১৬ ফেব্রুয়ারী দেশের আরও ৬৪ জনের সাথে হযরত শাহজালাল বিমান বন্দর থেকে দুবাই প্রদেশের আজমান শহরে গিয়ে পৌঁছান। সেখান থেকে মিশরে নিয়ে দীর্ঘ চার মাস একটি ঘরে তাদের বন্দি করে রাখা হয়। সেই ঘরে বাংলাদেশী ৬৪ জন ছাড়াও মিশরের ১০ জন এবং মরক্কোর একজনসহ মোট ৭৫ জন ছিলেন। বাড়ীতে ফোন করার কথা বললে বা কোন কিছু চাইলেই সেখানে লিবিয়া প্রবাসী গোপালগঞ্জ জেলার মোকসেদপুর উপজেলার দালাল “বুলেট ও মমিন” তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাতো। সেখানে থাকার পর প্রতি মাসে সাত লিটার পানি দেয় গোসল করার জন্য।

পেছনে বুলেটের ভয় সামনে নির্জন পথঃ
সাগর পাড়ে জাহাজে চড়ার কথা বলে চার মাস পর সেখান থেকে তাদের বের করে দেয়া হয়। নির্জন বুনো, মেঠো ও কর্দমাক্ত, জলজ পথে হাঁটতে বলা হয়। অস্বীকৃতি জানালেই বুলেটের আঘাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার উপায় ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। পেছনে বুলেটের আঘাতের ভয়ে তাদেরকে নির্জন ৬/৭ কিলোমিটার পথ দৌড়ে পাড়ি দিতে হয়। তাদেরকে নেয়া হয় সাগর পাড়ে। যেখানে জাহাজে চড়ার কথা সেখানে গিয়ে দেখা যায় ৪০/৫০ জনের ধারন ক্ষমতার একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। সেই নৌকায় উঠানো হয় ৭৫ জনকে।

আমাদেরকে বড় একটি জাহাজের ছবি দেখিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা ছিল। ভয়ে কেউ ওই নৌকায় উঠতে না চাইলে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে গুলি করে সাগরে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেয়। পরে ৭৫ জন গাদাগাদি করে নৌকায় উঠে ইতালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। কয়েক ঘণ্টা পর নৌকাটি সাগরের মাঝখানে যাওয়ার পর তেল শেষ হয়ে যায়। নিশ্চিত মৃতে্যুর কথা ভেবে ৬৪ ঘন্টা ভূ-মধ্য সাগরে ভাসতে থাকি। সাগরের একেকটি ঢেউ ১৫/২০ ফুট উঁচু হয়ে আসে।

এই বুঝি মারা গেছি:
আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সাগরে প্রচন্ড ঢেউ ছিল। কোনও ধরনের খাবার ছিল না আমাদের সাথে। শুধু পানি খেয়ে দিন পার করেছি। খাবার না পেয়ে সবাই মৃত্যুর মুখোমুখি ছিলাম। এই বুঝি মারা গেছি। ৬৪ ঘন্টা পর একটি তেলের জাহাজ সাগর দিয়ে যেতে দেখি। আমরা সবাই ওই জাহাজকে হাত ইশারা করে ডাকার চেষ্টা করেছি এবং হেল্প, হেল্প, বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার করেছি। পরে তিউনিসিয়ার ওই তেলবাহী জাহাজের লোকজন এসে আমাদেরকে তাদের জাহাজে ওঠান। ওই জাহাজে ১৯ দিন কেটে যায়।

পরে জাহাজের কর্মকর্তারা তিউনিশিয়ার প্রশাসনকে বিষয়টি জানান। এরপর আমাদের বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আমি গত ২৪ জুন তিউনেশিয়া থেকে কাতারের দোহার বিমান বন্দর হয়ে ২৫ জুন বিলে সাড়ে ৫টায় হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে পৌঁছি। ভূমধ্যসাগর থেকে ফেরা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দালাল “রেবার” (০১৭৩১-১৩৯৩৯৯) মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।

আব্দুর রাজ্জাকের বাবা হারুনুর রশীদ বলেন, জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। সেই স্বাধীন দেশে আমি আমার ছেলের জন্য কিছু রেখে যেতে পারলাম না। উল্টো ছেলের ঘাড়ে ‘ঋণের বোঝা দিয়ে গেলাম। আত্মীয় স্বজনসহ বিভিন্ন এনজিও এবং সমিতির কাছ থেকে ধার নিয়ে ১১ লাখ টাকা দালালদের দেওয়া হয়। এখন আমাদের আর কিছুই রইলো না। কবে এই ঋণ শোধ করতে পারবো সেটাও জানি না।

আব্দুর রাজ্জাক দেশে ফিরতে পারলেও তার দু’চোখে শুধুই হতাশার ছাপ। তার এই ঋণের বোঝার চিন্তাই পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও ভেঙ্গে পড়েছেন। তারা বলছেন সরকার যদি তিউনিশিয়া ফেরত যুবকদের ছোট্ট একটি কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করে দিত তাহলে তারা বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে কোনো ভাবে বেঁচে খাকতে পারতেন।