বৃহস্পতিবার, ২৪শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, চরিত্র চিরকালের

মুক্তখবর :
জুলাই ২৫, ২০১৯
news-image
-আবদুল মান্নান

মামুনের অনেক গুণের মধ্যে একটি হচ্ছে, কোনো একটি ঘটনার প্রেক্ষাপটে জুতসই শব্দ বা প্রবাদ তৈরি করা। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর তার সৃষ্ট একটি বহুল প্রচলিত শব্দ ছিল ‘সালসা’। এর অর্থ হচ্ছে সাহাবুদ্দিন (আওয়ামী লীগ কতৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, যিনি নির্বাচনকালীন সময়েও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন), লতিফুর রহমান (শেখ হাসিনা তাকে দেশের প্রধান বিচারপতি বানিয়েছিলেন) আর শেষের শব্দটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু সাঈদ। তিনজনের নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে ‘সালসা’। দেশে একটি নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার একটি মহাপরিকল্পনাকে বাস্তবায়ন করার যে কর্মকাণ্ড তারা তিনজন মিলে সম্পাদিত করেছিলেন, তাকে বন্ধু মামুন নাম দিয়েছিলেন ‘সালসা’ মার্কা নির্বাচন। যখন খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের তার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিলেন, তখন মামুনের আর একটা প্রণীত বর্ণনা বা প্রবাদ ছিল- ‘সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ’। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে দেশের পুরো শাসনব্যবস্থা উলটপালট করে দিলে মামুন লিখল, ‘ক্ষমতায় গেলে নিজেকে কেমন জানি পাগল পাগল মনে হয়।’ ক্ষমতায় গেলে নিজেকে পাগল পাগল মনে হয়, তা অনেকের ক্ষেত্রে একশ’ ভাগ সত্য। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করলেন জেনারেল আইয়ুব খান। দেশে প্রথমবারের মতো জারি হলো সামরিক আইন। ফরমান জারি হলো, সারাদেশের মানুষকে নিজের উদ্যোগে দ্রুত পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালু করতে হবে। বাড়ির ধারেকাছে কোনো ঝোপ-জঙ্গল রাখা চলবে না। বিভিন্ন এলাকায় পরিদর্শনে আসবে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। অনেক স্থানে দেখা গেল, মানুষ নিজের শখের বাগানও কেটে সাফ করে দিয়েছে। কারও গুদামে পাউডার দুধ বা চিনি পাওয়া গেলে তাকে প্রকাশ্যে চাবুক মারা হবে। আমাদের এলাকায় দেখা গেল, সব ব্যবসায়ী তাদের গুদামে রক্ষিত দুধ আর চিনি রাতের অন্ধকারে নিকটস্থ পুকুরে ফেলে দিল। সকালে মানুষ দেখে তাদের পুকুরে দুধ আর চিনির সরবত পাওয়া যাচ্ছে। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেই তার দশ বছরের দুঃশাসন শুরু করেছিলেন এভাবে আর দেশের ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের তোড়ে একদিন এই আইয়ুব খান ভেসে গিয়েছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন। তার সম্পর্কে একটি প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, তিনি সবসময় সুটেড-বুটেড হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। রাতে নাকি তিনি মোমবাতির আলোতে ডিনার খেতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি আমাদের ডিন হিসেবে কর্মরত থাকলেও তখন তাকে দেখার সুযোগ হয়নি। সেই প্রফেসর সাজ্জাদ হোসেনকে যখন গভর্নর টিক্কা খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করলেন, তিনিও পাগলের মতো আচরণ শুরু করলেন। ফরমান জারি করলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয়ে শেরওয়ানি আর জিন্নাহ টুপি পরে আসতে হবে। ১৯৭৫ সালে জনতা পার্টির রাজনারায়ণের কাছে নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পরাজিত হলে ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এর প্রেক্ষাপটে ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহম্মদ সেই দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। জরুরি অবস্থা ঘোষণার তিন ঘণ্টার মধ্যে দেশের সব পত্রিকা অফিসের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। শুরু হয় দেশব্যাপী ধরপাকড়। এর প্রতিবাদে সেই দেশের সব বিরোধী দল শুরু করে বিক্ষোভ আর ইন্দিরা হটাও আন্দোলন। সেই বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতন ঘটে। ইন্দিরা গান্ধীর দুই ছেলের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছেলে সঞ্জয় গান্ধী ছিলেন বেশ ক্ষমতালোভী, অনেকটা তারেক রহমানের মতো। সঞ্জয় তার মায়ের পাশাপাশি সমান্তরাল একটি প্রশাসন চালু করেন। ঘোষণা দেন, দিল্লিতে কোনো গরিব মানুষ থাকবে না। শুরু হলো বস্তি উচ্ছেদ। তার ধারণা, বস্তির মানুষরা রাজধানী দিল্লিকেই শুধু নোংরা করছে না, তারা লাগামহীনভাবে শিশুর জন্ম দিচ্ছে। তিনি পুলিশ দিয়ে বিভিন্ন এলাকা ঘেরাও করে গরিব পুরুষদের ভ্যাসেক্‌টমি করে তাদের প্রজনন ক্ষমতা শেষ করে দিলেন। ক্ষমতা তাকে পাগল করে দিয়েছিল। বাংলাদেশে ক্ষমতা পেয়ে প্রথম নিজেকে পাগল মনে করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ক্ষমতা দখলকারী খোন্দকার মোশতাক আহমদ। মোশতাক কখনও কল্পনা করেননি, তিনি রাতারাতি বাংলাদেশের সর্বময় কর্তা বনে যাবেন। ক্ষমতা দখল করে ঘোষণা দিলেন, জাতীয় পোশাক হবে শেরওয়ানি আর ‘মোশতাক টুপি’। কিন্তু মোশতাকের এই পাগল পাগল ভাব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কারণ ৮৬ দিনের মাথায় জিয়াউর রহমান তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজেই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেন। ক্ষমতা দখলকারী সব সামরিক শাসক যা করেন জিয়াও তাই করলেন। ক্ষমতা দখল করে তিনি প্রথমেই জামায়াত ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সব নেতাকর্মীকে জেলে পুরলেন। মূল আক্রোশ ছিল আওয়ামী লীগ আর জাসদের নেতাকর্মীদের ওপর। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আওয়ামী লীগের তেমন কোনো নেতা বাইরে ছিলেন না। সবাইকে ১৬ আগস্ট থেকে গ্রেফতার করা শুরু হয়েছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সেই কাজ শেষ। বাকি ছিল জেলা পর্যায়ের ছোটখাটো নেতা। তারাও বাদ গেল না। জিয়া ক্ষমতাকে খুব ভোগ করতেন। তার ক্ষমতা দেখানোর মোক্ষম সুযোগ এলো, যখন তিনি প্রায় দুই হাজার সেনা অফিসার আর সৈনিকদের বিনা বিচারে অত্যন্ত ত্রূক্ররভাবে ফাঁসিতে ঝুলালেন। ফাঁসিতে মৃত্যু দ্রুত কার্যকর হওয়ার জন্য তখন পায়ে বালুর বস্তা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। এর আগে তিনি তার এককালের সহকর্মী বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) আবু তাহেরকে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন। জিয়াউর রহমানের পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া যখন সরকার গঠন করলেন, তার চেয়ে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান ও ভাই সাঈদ ইস্কান্দার অনেক বেশি ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করা শুরু করলেন। এক কথায় ক্ষমতা তাদের পাগল করে দিয়েছিল। এমনকি সেনাবাহিনীতে পদোন্নয়ন, বদলি, নিয়োগ ইত্যাদিতেও তিনি নাক গলাতে চাইতেন বলে শোনা যায়। এটি বেশি হয়েছে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে। অন্যদিকে সিভিল প্রশাসন চলে গিয়েছিল তারেক রহমানের হাতে। তার নির্দেশ ছাড়া বিসিএস ক্যাডার সার্ভিসে কোনো ফলাফল ফাইনাল হওয়া ছিল কঠিন। দেশি বা আন্তর্জাতিক কোনো সরকারি উন্নয়ন চুক্তি বা লেনদেন তার মাধ্যমে ছাড়া হতো না। দলের ভেতরে সিনিয়র নেতারাও জানতেন প্রধানমন্ত্রী নন, তাদের ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক তারেক রহমান। একসময় দেখা গেল, খালেদা জিয়ার বর্ষীয়ান অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানও তারেক রহমানের পেছনে ছুটছেন। সব সরকারের আমলে কিছু কিছু ব্যক্তি প্রথমবারের মতো মন্ত্রিসভার সদস্যপদ লাভ করেন। অনেক সময় দেখেছি, রাতারাতি তাদের আচরণ পরিবর্তন হয়ে যায়। যে ব্যক্তিকে তিনি চাচা বলে ডাকতেন, দেখা যায় সেই একই ব্যক্তিকে পরদিন তিনি নাম ধরে ডাকছেন। বিভিন্ন জায়গায় তিনি হুকুম পাঠান, যেন তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এটি বেশি হয় অযোগ্য ব্যক্তিকে কোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করলে। বুঝতে পারেন না সম্মান জিনিসটা অর্জন করতে হয়। এটি ভিক্ষা করে পাওয়ার জিনিস নয়। অনেক সময় দেখা যায়, ছোটখাটো সংস্থায়ও কোনো এক ব্যক্তি সাময়িক দায়িত্ব পেলে নিজেকে পাগল পাগল মনে করেন এবং এমন সব কর্মকাণ্ড করেন, যা হাস্যকর। একজন উপাচার্য বিদেশে গেলেন। তার ছুটি নিতে হয় চ্যান্সেলর তথা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে। ছুটি মঞ্জুরের চিঠিতে লেখা থাকে, উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে উপ-উপাচার্য উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন। এটা একটা প্রচলিত রেওয়াজ। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো উপ-উপাচার্য উপাচার্য ছুটিতে যাওয়ার সময় থেকে উপাচার্যের দপ্তরে তার চেয়ারে বসে রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। এটি সম্পূর্ণভাবে শিষ্টাচার-বহির্ভূত। হঠাৎ সাময়িক ক্ষমতা পেয়ে উপ-উপাচার্য মহোদয় পাগল হয়ে গেছেন। এমনটি সবার ক্ষেত্রে না ঘটলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা গেছে। এক ব্যক্তি একটি সরকারি সংস্থার সদস্য নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন। নতুন কাজে যোগদানের প্রথম দিনেই দেখা যায় অফিসে এসে গানম্যানের খোঁজ করছেন। তিনি হয়তো জানেন না, তার দপ্তরের প্রধানেরও গানম্যান নেই। আমার পূর্বের একটি সরকারি সংস্থার প্রধান হিসেবে মেয়াদপূর্তি হলে শেষ দিন সংস্থার পরের জনকে দায়িত্ব দিয়ে আসি। তিনি পরদিন অফিসে এসে খুবই দৃষ্টিকটুভাবে আমার নেমপ্লেটটা খুলে ফেললেন আর একই সঙ্গে আমার দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ স্টাফদের অন্যত্র বদলি করে দিলেন। আমার বিরুদ্ধে তার ক্রোধের কারণ এখনও আমি খুঁজছি। বসা শুরু করলেন আমার ছেড়ে আসা চেয়ারে। অথচ তার দায়িত্বটা ছিল সাময়িক ও রুটিনমাফিক। ১৫ দিনের মাথায় নতুন কর্তা নিয়োগ হলে তিনি তাকে পাগল করে দেওয়া ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেন। যারা ক্ষমতায় আছেন বা ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা আছে তাদের বলি, সৃষ্টিকর্তা ক্ষমতা দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে পরীক্ষা করেন তিনি ওই ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করার যোগ্য কি-না। ক্ষমতা অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। লোভ ও অহঙ্কার একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তির পতন ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। শেষ করি একাদশ শতকের বিখ্যাত দার্শনিক ইমাম গাজ্জালির একটি উক্তি দিয়ে। তিনি তার নসিহাত উল মুলক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘হে জগতের মালিক (শাসনকর্তা) এটি মনে রেখো, তোমার পূর্বে যাহারা আসিয়াছিলেন তাহারা চলিয়া গিয়াছেন। তোমার পরে যাহারা আসিবেন তাহারাও পূর্বনির্ধারিত। তুমি এমন কাজ করিবে যেন তুমি চলিয়া যাওয়ার পর মানুষ তোমার কর্মের কারণে তোমাকে স্মরণ করে।’

-বিশ্নেষক ও গবেষক