বৃহস্পতিবার, ২২শে আগস্ট, ২০১৯ ইং

ইস্তাম্বুলের আড্ডা

মুক্তখবর :
জুলাই ৩০, ২০১৯
news-image

ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ জুলাই ২০১৯ (ফিচার ডেস্ক) : কেনাকাটা করতে না পেরে কাফেলার সদস্যরা হতাশ। যার যার ঘরে গিয়ে খিল দিল। কোনো কোনো ঘর থেকে ভিডিও কথনের আওয়াজ আসছে। সেখানে কার কী লাগবে তার মৌখিক ফর্দ আসছে ঢাকা থেকে। বুঝলাম বেচারারা চাপের মধ্যেই আছেন। সন্ধ্যে ৭টা থেকে রাত্রিভোজ শুরু, চলবে ৯টা পর্যন্ত। দিনের আলোতেই সবাইকে তাড়া দিয়ে বুফে কক্ষে নিয়ে এলাম। সবাই আলাদা আলাদা টেবিলে গিয়ে বসল। দুই একজন বুঝতে পারছেন না। কোনটা খাবেন আর কোনটা খাবেন না। একজনকে গিয়ে মজা করে বললাম-বুফেতে ১০১টা পদ থাকা মানে কিন্তু সব পাতে নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতা নেই। উদোরের ব্যাস-ব্যাসার্ধ বুঝে ঝাঁপ দেন। তিনি ঝাঁপের মধ্যেই ছিলেন তাই শুধু একবার তাকিয়ে লজ্জিত হাসি দিলেন। আমি নিজেই মুশকিলে আছি। ছোট পরিসরের উদোর। তার ওপর মাছ ছাড়া অন্য কিছুতে জিভ রুচি পায় না। তাই স্যুপ, কোনো একটি মাছের একটি টুকরো আর জলপাই-পনির ভোজ শেষ করি। অর্ধেকই ভোজ শেষে কক্ষে ফিরে গেছেন। তিনজনকে দেখলাম আঙিনায় ধূমপান করছেন তাদের গিয়ে উসকে দিলাম-ভাই স্বল্প আয়ুর সফর ঘরে বসে অপচয় করব কেন? চলেন ইস্তাম্বুলের রাত দেখে আসি।

একা বের হওয়া ঠিক হবে কি না, অচেনা শহর, উনারা দ্বিধায়। বললাম- চেনা মানুষ নিয়ে নতুন শহর আবিষ্কার করা যাবে না। চলুন নিজেরা চিনে নেই, জেনে নেই। আর ট্যাক্সি চালক তো সঙ্গে থাকবেনই। ব্যস ঘরে সটকে পড়াদের ডাকাডাকি না করে চারজনই রওনা হয়ে গেলাম তাসকিম সেন্টারের উদ্দেশে। ইস্তাম্বুল সম্পর্কে আমরা ছিটেফোঁটা কিছু জানি নানাজনের ভ্রমণ কাহিনী, তাদের সাম্প্রতিক রাজনীতি পর্যবেক্ষণে। আর ইস্তাম্বুল সফর শুরুর আগে সক্কলে গুগুল সফর শেষ করেই এসেছেন। তারপরও অন্যান্য শহরের ট্যাক্সি চালকের মতো আমাদের ট্যাক্সি চালকও আমাদের ইতিহাসের মনোযোগী ছাত্র বিবেচনায় বয়ান শুরু করলেন- ইস্তাম্বুলের পুরোনো নাম কন্সটান্টিনোপল। এ ছাড়া এটি বাইজান্টিয়াম নামেও পরিচিত ছিল। এটি পূর্বে উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। ১৪৫৩ সালে এটি তৎকালীন উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী হিসেবে ঘোষিত হয়। এটি তুরস্কের সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির কেন্দ্রস্থল। ১৯২৩ সাল পর্যন্ত এখানেই ছিল তুরস্কের রাজধানী। এটি তুরস্কের বৃহত্তম শহর যার জনসংখ্যা ১২.৮ মিলিয়ন। ইস্তানবুলের আয়তন ৫.৩৪৩ বর্গ কিলোমিটার (২,০৬৩ বর্গ মাইল)। ইস্তাম্বুল একটি আন্তর্মহাদেশীয় শহর, এর এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা এশিয়ায় বসবাস করলেও এইটি ইউরোপর বাণিজ্যিক এবং ঐতিহাসিক কেন্দ্র। ইস্তাম্বুল শুধু শহরই নয়, বরং বলা চলে একটি কিংবদন্তি। এক সময় এই ইস্তাম্বুল শহরই ছিল তুরস্কের রাজধানী। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে শত্রু কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় রাজধানী স্থানান্তরিত হয়ে যায় আংকারায়। আমরা ট্যাক্সি চালকের কাছে সুলতান সুলেমান প্রসঙ্গ তুললাম। বাংলাদেশের দর্শকদের সুলতান সুলেমানের কাহিনী জনপ্রিয়িতা পেয়েছে। সাধারনের মধ্যে তুরস্ক, ইস্তাম্বুল নিয়ে আগ্রহ তৈরি কারণও সুলতান সুলেমান। ট্যাক্সি চালক বিরক্ত হলেন। বললেন-মিথ্যে কাহিনী তৈরি হয়েছে। খেলাফতের সুলতানরা এমন ছিল না। এটা সুলতানদের চরিত্রে কালিমা লেপনের ষড়যন্ত্র। আমরা বললম এই কাহিনী তো তোমাদের এখানেই তৈরি হয়েছে। ট্যাক্সিচালক বিরক্ত। কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি তাসকিম স্কোয়ারের কাছে গলির মাথায় নামিয়ে দিলেন। আট-দশ কদম হেঁটেই পেয়ে গেলাম তাসকিম স্কোয়ার।

প্রথমেই চোখ গেল ১৯২৪ সালে স্থাপিত ইতালিয়ান ভাস্কর পিটারো ক্যানোনিকা নির্মিত প্রজাতন্ত্র স্মৃতিস্তম্ভের দিকে। স্মৃতিস্তম্ভের উত্তর দিকে কিছু তরুণ-তরুণী জমায়েত হয়ে কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করছিল। তাদের স্লোগান শুনিতে পাচ্ছিলাম। কাছাকাছি যাওয়ার আগেই ওদের সমাবেশ শেষ হয়ে গেল। স্কোয়ারের চারপাশে অনেকেই এসেছেন ঘুরে বেড়াতে। পশ্চিম দিকের ফুলের দোকানগুলোর দিকে আমাদের চোখ পড়ে যায়। পৃথিবীতে যত রঙের গোলাপ আর টিউলিপ ফোটে, সবই সেখানে আছে। ফুলের সমাবেশ দেখে বুঝলাম ধরিত্রীর কত সুন্দর এখনো আমার কাছে অপরিচিত। ১৮৭৫ সালে স্থাপিত টুনেল ট্রাম, ১৮৬৩ সালে নির্মিত সাবওয়ের চত্বর এবং মেট্রো স্টেশন এটি। মূলত তাসকিম অর্থ হচ্ছে বণ্টন বা সরবরাহ। শহরের উত্তর অংশ থেকে অপর অংশে পানি সরবরাহের জন্য অটোমান শাসক সুলতান মাহমুদ এখানে পাথরের জলাধার তৈরি করেন। রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের জন্য কেন্দ্রস্থ বলা যায় তাসকিম স্কোয়ারকে। ১৯৬৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৬০ জন বামপন্থী বিক্ষোভকারী নিহত হন ডানপন্থীদের হামলায়। ওই দিনটিকে বলা হয় ‘রক্তাক্ত রোববার’। ১৯৭৭ সালের পহেলা ১ মে এখানে আরেকটি রক্তাক্ত ঘটনা ঘটে। মে দিবসের সমাবেশে ৩৬ জন বামপন্থী বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে অজ্ঞাতনামা ডানপন্থীরা। ইতিহাসের পাতা উল্টাচ্ছিলাম যখন, তখন ফুলের দোকানগুলোর পাশ থেকে গানের আওয়াজ ভেসে আসছিল। তিন তরুণ গিটার হাতে গান গাইছে। আমরা মুঠোফোনের ক্যামেরায় তাদের গান ভিডিও করতে শুরু করি। তাদের চোখে বিরক্তি। পথচারী একজন এসে আমাদের নিষেধ করে গেলেন ভিডিও করতে। তাদের কাছাকাছি আরেক তরুণকে দেখলাম একাই গিটার বাজিয়ে গান করছে। ছবি নেওয়ার সাহস করলাম না। ডানদিকের গলির দিকে তাকিয়ে দেখি আলোর ঢেউ উপচে উপচে পড়ছে। কত রঙের আলো। সেই আলোর ঢেউয়ে মাখামাখি করছে লাখো মানুষ। একজন বললেন-একে ইস্তাম্বুলের টাইম স্কোয়ার বলা যায়। আমার নিউইয়র্কের টাইম স্কোয়ার দেখা আছে। তার চেয়ে তাসকিম স্কোয়ারকে কয়েকগুণ জমজমাট মনে হলো। পথের দুই দিকে বিপণিবিতান, মিষ্টান্ন-কাবাবের দোকান। আবাসিক হোটেল, ম্যাসেজ পার্লার। আর পথে মনের আনন্দে একেক দল গান গেয়ে চলছে। আলোর ঢেউয়ে নিজেকে ভাসিয়ে দেব, এ সময় পাশ থেকে একজন জানতে চাইলেন আমি পাকিস্তানি কি না? ঘণ্টা ভিত্তিক ম্যাসেজ পার্লারের নানা রকম সেবার প্রলোভন। নানা দেশের তরুণীদের সেবার প্রস্তাব। তাকে তাড়িয়ে দিতেই আরেকজন এসে হাজির-তারও একই প্রশ্ন, পাকিস্তানি? আমি অবাক হলাম। কী ব্যাপার, আর কোনো দেশের কথা জানতে চায় না, শুধু পাকিস্তানের কথা কেন। সাধারণত আমাদের অবয়ব দেখলে ভারতীয় কি না জানতে চায় অনেক দেশেই। এখানে কেবল পাকিস্তান। তাহলে কি এখানে শুধু পাকিস্তানি পর্যটকরাই আসেন বিশেষ সেবা নিতে?