বৃহস্পতিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

আহতদের দুঃসহ জীবন

মুক্তখবর :
আগস্ট ২১, ২০১৯
news-image

ঢাকা, বুধবার, ২১ আগষ্ট ২০১৯ (নিজস্ব প্রতিনিধি) : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার মহাসমাবেশে গ্রেনেড হামলায় কালকিনি উপজেলার নিহতের পরিবারের সদস্যরা ভালো নেই। এসব পরিবারে শোক এখনও কাটেনি। একই ঘটনায় আহতরা শরীরে স্পি­ন্টার নিয়ে পঙ্গু হয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।

এখনও তাদের সে দিনের নারকীয় স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও সে দিনের দুঃসহ স্মৃতি আজও কষ্ট দেয় স্বজনদের। ২০১২ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নিহত ও আহত পরিবারগুলো প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত দুই থেকে দশ লাখ টাকা অনুদান পেলেও এলাকার কেউ আর তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।

কালকিনি উপজেলার কয়ারিয়া ইউনিয়নের রামারপোল গ্রামের বর্বরোচিত এ গ্রেনেড হামলায় নিহত শ্রমিক নেতা নাসির উদ্দিন ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্ধ ভক্ত। তাই আওয়ামী লীগের মিছিল, মিটিং বা সমাবেশ হলে তাকে কেউ বেঁধে রাখতে পারত না।

নাসিরের বড় ছেলে মাহাবুব হোসেন জানান, প্রধানমন্ত্রী আমাদের ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র দিয়েছেন। এখন সেই টাকার লভ্যাংশ দিয়ে আমার মা, আমি আর আমার ভাই নাজমুলকে নিয়ে কোনোরকম বেঁচে আছি।

গ্রেনেড হামালায় নিহত যুবলীগ নেতা মোস্তাক আহাম্মেদ ওরফে কালা সেন্টু। তার বাড়ি কালকিনি উপজেলার ক্রোকিরচর। সে বরিশালের মুলাদি নানা বাড়িতে বড় হয়েছে। এ কারণেই তার লাশ মুলাদিতেই দাফন করা হয়।

কথা হয় সেন্টুর স্ত্রী আইরিন সুলতানার সঙ্গে। তিনি ঢাকার মার্কেন্টাইল ব্যাংকে চাকরি করেন। এক মেয়ে আফসানা আহমেদ রীদিকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন। তিনি বলেন, এমন দুঃখজনক স্মৃতি কি ভোলা যায়, না মুছে যায়। মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় থাকি।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকার অনুদান পেয়েছিলাম। সে সম্বল আর চাকরি থেকে যা পাই, তা দিয়েই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভাবছি। নারীর একা থাকা বিড়ম্বনা উল্লেখ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর যদি মৃতদের পরিবারের জন্য একটা বাসস্থানের ব্যবস্থা করতেন, তাহলে উপকৃত হতাম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালকিনি পৌরসভার বিভাগদি গ্রামের মোহাম্মদ আলী হাওলাদারের ছেলে হালান হাওলাদারের একটি পা গ্রেনেড হামলায় নষ্ট হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছিলেন হালান। এখন তিনি ঢাকা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কাঁচা মালের ব্যবসা করেন।

হালানের সঙ্গে কথা হলে বলেন, খোড়া পা নিয়ে কষ্ট হয় ঘুরে ঘুরে কাঁচামাল বিক্রি করি। তাছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ স্পি­ন্টার।

জ্বালা-যন্ত্রণায় অসহ্য লাগে মাঝে মাঝে। হালান জানান, সরকার যদি কোনো একটা চাকরি দিত, যাতে এরকম শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে না, তাছাড়া আমার চিকিৎসারও প্রয়োজন। কালকিনি পৌর এলাকার চরঝাউতলা গ্রামের সাইদুল ২১ আগস্ট ঢাকা পল্টন ময়দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহাসমাবেশে গ্রেনেট হামলার শিকার হয়ে চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন।

২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকার অনুদান পেয়েছিলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর অনুদান পেয়ে তিনি ডিশ ব্যবসা করতে নামেন, কিন্তু এলাকার প্রভাবশালীদের সঙ্গে পেরে না ওঠায় সেই ব্যবসাও বন্ধ হয়ে গেছে।

কৃষ্ণনগর গ্রামের কবির হোসেনের ডান-হাত স্পি­ন্টারের আঘাতে বাঁকা হয়ে গেছে। বাবা, মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৬। উপার্জন করে শুধু কবির। অনেকেই অনেক টাকা পেলেও কবির পেয়েছিল এক লাখ বিশ হাজার টাকা।

কবির জানান, ঘটনার পর আমি ৩ বছর ভীষণ অসুস্থ ছিলাম। বাড়ির জমি বিক্রি করে চিকিৎসা করাতে আমার ৪-৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু শরীরে এখনও স্পি­ন্টার রয়ে গেছে। যার যন্ত্রণায় এখনও ঘুম আসে না। আমার পরিবার এখন অন্যের জায়গায় বাস করে। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব।

-সূত্র : যুগান্তর