বৃহস্পতিবার, ১৪ই নভেম্বর, ২০১৯ ইং

চিকিৎসা সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

মুক্তখবর :
সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৯
news-image

ঢাকা, রোববার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ (নিজস্ব প্রতিনিধি) : চিকিৎসা সেবা দিয়ে একঅনন্য দৃস্টান্ত স্থাপন করেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন আউটডোর, ইনডোর ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস মিলে গড়ে ৯ হাজার রোগীকে বিনামুল্যে ১০০% ঔষধ, স্বল্প ফিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসা সেবা দিয়ে এক অনন্য উদাহরণ সৃস্টি করেছে হাসপাতালটি। রোগীদের কল্যাণে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ২০১৭ সালে ১৯ নভেম্বর ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয় এই হাসপাতালে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সারাদেশের একটি মডেল। সেবা পেয়ে রোগীরা শতভাগ সন্তুষ্ট। পাশাপশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে বহুগুণ। অনেকগুলো যুগান্তকারি পদক্ষেপের ফলে মানুষ শতভাগ সুচিকিৎসা পাচ্ছে। যার নেতৃত্বে এত বড় সফলতা এসেছে তিনি হচ্ছেন হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহমেদ। বিগত ৪ বছরে তিনি দিনরাত শ্রম, ত্যাগ স্বীকারের ফলে হাসপাতালটি আজ এই পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। ভাল মানের চিকিৎসার প্রদানের ফলে কিছু বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে কর্র্তৃপক্ষকে। ভাল চিকিৎসা পাওয়ায় মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপ। ফলে সেবা দিতে সীমিত ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান ও কর্মকর্তা কর্মচারীকে হিমসিম খেতে হচ্ছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের ২কোটি মানুষের একমাত্র শেষ ভরসাস্থল এই হাসাপতাল। এছাড়া গাজীপুর ও সুনামগঞ্জ জেলার মানুষও চিকিৎসা নিতে আসে এই হাসপাতালে। ২০১৫ সালে ১ নভেম্বর বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহমেদ যোগদান করেন। যোগদানের পর হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি বলেন, দেশের অন্যতম ৩টি হাসপাতালের মধ্যে একটি এই হাসপাতাল। পরিকপ্লিতভাবে পরিকল্পনা করা এটার পিছনে স্বতস্ফুর্তভাবে লেগে থাকার সার্বক্ষনিক তদারকি সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সহযোগিতা ফলে এই মান অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এটি দলগত প্রয়াস ছিল। কোন একক কোন ব্যক্তির কৃতিত্ব নেই।
তিনি বলেন ভাল কাজ করতে গেলে বাধা আসবে। একটি সুবিধা বঞ্চিত গোষ্টি যারা অতীতে হাসপাতালের বিভিন্ন সেক্টরে দুর্নীতির সাথে জড়িত ছিল যেমন ঔষধ বিক্রয়, রোগী ভাগিয়ে নেয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরে থেকে করা, হাসপাতালে দালাল নিয়োগ করা, মেডিকেল ইনজুরি সার্টিফিকেট বানিজ্য করা ইত্যাদি। এই পক্ষটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তাদের সুবিধাভোগীরা বাধাগ্রস্থ করছিল এবং করছে।
হাসপাতাল পরিচালক জানান, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে গড়ে ৩ হাজারের অধিক রোগী ভর্তি থাকছে। এছাড়া হাসপাতালের আউডোরে প্রায় ৬ হাজার ও ওয়ানস্টপ সার্ভিসসহ জরুরি বিভাগে আরো প্রায় ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে। এক হাজার শয্যার অনুমোদিত লোকবল দিয়ে বাড়তি এসব রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রতিনিয়ত হিমসিম খাচ্ছেন কর্তব্যরত ডাক্তার নার্স ও কর্মচারীরা। তারপরও ডাক্তার নার্স কর্মচারীদের আন্তরিকতার ফলে হাসপাতালের সেবাদান কার্যক্রম ও অগ্রযাত্রার জন্য দেশসেরা হাসপাতালের মর্যাদা লাভ করে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল। সর্বশেষ গত ২০১৮ সালে প্রসূতি সেবায় বিদ্যমান কার্যক্রমের জন্যও পুরস্কার লাভ করে হাসপাতালটি। নামমাত্র ফীতে পরীক্ষাসহ বিনামূল্যের শতভাগ ওষুধ পেয়ে খুশি রোগীরা। এসবের পাশাপাশি আধুনিক মানের এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন স্থাপন, হেমোডায়ালাইসিস মেশিনে কিডনী রোগীদের সেবা, থ্যালাসেমিয়া, চক্ষু রোগীদের আধুনিক পরীক্ষার মেশিন সংযোজন এবং হৃদ রোগীদের জন্য বহুল প্রত্যাশিত ক্যাথল্যাব স্থাপন প্রক্রিয়াধীন বলে জানান পরিচালক। নিউরো সার্জারি ও ইউরোলজীসহ বার্ণ ও প্লাস্টিক সার্জারি সংযোজন রোগীদের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়েছে বলে জানান পরিচালক।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ লক্ষী নারায়ণ মজুমদার বলেন, বর্তমান পরিচালকের নানামুখী ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে হাসপাতালের রাজস্ব আয় বেড়েছে বহুগুণ। গত ২০০৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভর্তি, টিকেট, এম্বুলেন্স, কেবিন ও পেয়িং বেড ভাড়াসহ অপারেশন চার্জ ও টেষ্টের ফি নির্ধারন করে দেয়। এসব খাত থেকে আদায় করা অর্থ ইউজার ফি হিসেবে জমা হয় সরকারী কোষাগারে। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ইউজার ফি থেকে ময়মনসিংহ মেডিক্যালের রাজস্ব আয় ছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৭৩ টাকা, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আয় ৪ কোটি ৭২ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৬ টাকা, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ছিল ৬ কোটি ৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৩ টাকা। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৮ কোটি ৩১ লাখ ১৪ হাজার ৭৯১ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৯ কোটি ৬০ লাখ ৯৮ হাজার ৬২৫ টাকা। গত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে এক লাফে এই রাজস্ব আয় দাড়ায় ১৩ কোটি ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯২ টাকা।
হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে ময়মনসিংহ সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু বলেন হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা কার্যক্রমের সাফল্যের জন্য হাসপাতাল পরিচালক, উপ-পরিচালক, সহকারী পরিচালকগণসহ সর্বস্তরের চিকিৎসক, নার্স কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রতি ধন্যবাদ জানান। হাসপাতালে আসা রোগীদের স্বার্থে সব ধরনের সহযোগিতারও আশ্বাস দেন সিটি মেয়র। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিদ্যামান সেবাদান কার্যক্রমের সাফল্য ও অগ্রযাত্রা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন মেয়র টিটু। মেয়র টিটু হাসপাতালের সেবাদান কার্যক্রমে বর্তমান পরিচালকের নানামুখী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে এটি অব্যাহত রাখতে সিটি কর্পোরেশনসহ দলীয় ও ব্যক্তিগত সবধরনের সহায়তার পাশাপাশি হাসপাতাল পরিচালকের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন।
হাসপতাালের সেবাগ্রহনকারীরা যা বললেন, বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিতে মুক্তাগাছার চেচুয়ার রঘুনাথপুর গ্রামের আঃ মান্নান (৬৫) বলেন, হাতের আঙ্গুূলের অপারেশন করতে হাসপতালে এসেছেন। ভাল চিকিৎসা হচ্ছে। শহরের জেলাখানা রোড গলগন্ডার মোঃ নজরুল ইসলাম (৫২) বলেন ডায়বেটিকসহ নানা সমস্যা নিয়ে দেড় মাস ধরে বহিবিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালের ১০০% ঔষধ ও পরীক্ষা নিরীক্ষা পেয়ে সে অনেক খুশী। গরীব লোকদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতাল অনেক উপকার করছে। হাসপাতালের ১ নং গাইনী ওয়ার্ডে ভর্তি সদরের টান কাতলাসেন নুরজাহান বেগম (২৫)। সিজারে সন্তান হয়েছে। তার শ্বশুর আঃ গনি জানান, হাসপাতালে তার চিকিৎসা বাবদ কোন খরচ হয়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সব হাসাপাতাল থেকে দিচ্ছে। ভাল চিকিৎসা হচ্ছে। একই ওয়ার্ডে ভর্তি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা আগত কাকলী (২৫) তার সিজারে বাচ্চা হয়েছে। কোন চিকিৎসা খরচ লাগেনি। অনেক ভাল চিকিৎসা পাচ্ছে। হাসপাতালের পরিচালক, ডাক্তার ও নার্সদের কাছে তারা কৃতজ্ঞ প্রকাশ করেন।
মাত্রাতিরিক্ত রোগীর জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। এক্সরে, অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সিরিয়াল দিতে গিয়ে ঘন্টার ঘন্টার পর লাইনে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এছ্ড়াা ৪তলা বিশিস্ট পুরাতন ২টি ভবনের ৮টি ওয়ার্ড সংস্কার কাজের জন্য ভর্তিকৃত রোগীদের স্থানাভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এরজন্য হাসপতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। বর্হিবিভাগে একজন ডাক্তারকে ১৫০-২০০ পর্যন্ত রোগী দেখতে হয়। ৬ ঘন্টায় এত রোগী দেখা ডাক্তারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানান, জনগনের দেয়া ১০% সার্ভিস চার্জ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ১৬ ডাক্তারসহ ১৩১ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছি। এতেও সামাল দেয়া কঠিন হচ্ছে।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাািছর উদ্দিন আহমেদ বলেন, হাসপাতলের উন্নতি আরো সম্ভব । জনগণ সচেতনভাবে হাসপাতালে এসে হাসপাতাল নোংরা না করে নির্দিস্টস্থানে ময়লা ফেলে। এক রোগীর সাথে ৪/৫জন লোক না থাকে, তাহলে আরো সুন্দরভাবে সেবা দেয়া সম্ভব। ১৯৬২ সালে স্থাপিত ৫০০শয্যার এই হাসপাতালটি ১৯১৩ সালে ৫০০ শয্যা থেকে ১০০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু জনবল বাড়ানো হয়নি। জনবল সংকটে সেবা দিতে হিমশিম খেতে হয়। বহিবিভাগে মানসম্মত চিকিৎসা প্রদানের জন্য রোগী ও চিকিৎসার ইতিহাস সংরক্ষনের জন্য চিকিৎসা বই চালুকরণ প্রয়োজন। হাসপাতাল সুত্রে জানা গেছে বর্তমানে ১৪টি অপারেশন থিয়েটার, ৪টি এক্সরে রুম রয়েছে। রোগীর চাপ ও পাশাপাশি এনেসথেসিয়া ডাক্তার ও টেকনেশিয়ানের সংকট রয়েছে। ফলে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে রোগীদের। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন রোগীর চাপ কমাতে হলে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে সেবার বাড়ানোর কোন বিকল্প নেই। হাসপাতালগুলোকে আরো কার্যকর করতে হবে। ##