বৃহস্পতিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং

বেতন বৈষম্য কমানোর প্রস্তাব নাকচ: ক্ষুব্ধ সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষক

মুক্তখবর :
সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯
news-image

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯ (স্টাফ রিপোর্টার): বৈষম্য দূর করার প্রস্তাব নাকচ হওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রাথমিক স্তরের ৩ লাখ শিক্ষক। এ নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এই শিক্ষরা এখন রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলার কথা ভাবছেন। শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন করে তারা কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে জানা গেছে।

তবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম-আল-হোসেন জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা হতাশ নন। বুধবার যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা বিষয়টি নিয়ে অর্থসচিবের সঙ্গে কথা বলেছি।

২০ সেপ্টেম্বরের পর এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হবে। আমরা আশাবাদী বেতন বৃদ্ধি ও বৈষম্য দূর করার যৌক্তিকতা আমরা বুঝাতে সক্ষম হব। এ নিয়ে শিক্ষকদের এখনই চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। তাদের আমি ক্লাসরুমে মনোনিবেশের অনুরোধ করব।’

২৯ জুলাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। তাতে ১৯৭৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত উল্লিখিত দুই ধরনের শিক্ষকের বেতন স্কেলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কখন কী হারে শিক্ষকরা বেতন পেয়েছেন সে কথাও এতে বলা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রস্তাবে বলা হয়, ২০১৪ সালের ৯ মার্চ প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়।

এরপর প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে বেতন স্কেলে পার্থক্য আরও বেড়ে ৪টি গ্রেড হয়ে যায়। ফলে সহকারী শিক্ষকরা বেতন স্কেলের দিক থেকে আরও পিছিয়ে পড়েন ও বৈষম্য বেড়ে যায়। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি বিদ্যালয় আছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষক আছেন।

এরপর এতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও প্রশিক্ষণবিহীন এই দুই ধরনের ক্যাটাগরি বাতিল করে সবধরনের প্রধান শিক্ষককে গ্রেড-১০ আর সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড-১২ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়। এই প্রস্তাব অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকরা ১৬ হাজার এবং সহকারী শিক্ষকরা ১১ হাজার ৩শ’ টাকা স্কেলে বেতনভাতা পাবেন।

জানা গেছে, ৮ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয় এই প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব সাদিয়া শারমীন স্বাক্ষরিত এক পত্রে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সাফ জানিয়ে দেয়া হয় যে, প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড যথাযথ ও সঠিক আছে। তাই প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেড-১০ এবং সহকারীদের গ্রেড-১২ করার কোনো সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির মহা-সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল প্রধান ও সহকারী শিক্ষকদের মধ্যে বেতন বৈষম্য দূর করা। এজন্য প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার সমান বেতনভাতা নির্ধারণ। এর এক ধাপ নিচে সহকারী শিক্ষকদের বেতনভাতা দিতে হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তাই দাবি আদায়ে তাদের বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ করা সব সংগঠন ঐক্যবদ্ধ হয়ে এবার কর্মসূচি দেবে। শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৯ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড মর্যাদা দেয়ার ঘোষণা দেন। যদিও প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পৌনে চার বছর পর ২০১৭ সালের নভেম্বরে ওই ঘোষণার আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়। তখন কেবল প্রধান শিক্ষকদের বর্ধিত হারে বা ১৩তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেডে বেতনভাতা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ‘গেজেটেড’ মর্যাদা বা সংশ্লিষ্ট বেতন গ্রেড দেয়া হয়নি। পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেলে গ্রেডও একটি ধাপে উন্নীত করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই গ্রেড দেয়ার পরই সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে ব্যবধানটা বেড়ে যায়। ২০১৯ সালের ৯ মার্চ পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকরা ১৩ ও ১৪তম এবং সহকারী শিক্ষকরা ১৫ ও ১৬তম গ্রেডে বেতন পেতেন। উল্লিখিত মর্যাদা দেয়ার পর প্রধান শিক্ষকরা ১১ ও ১২তম এবং সহকারীরা নতুন করে ১৪ ও ১৫তম গ্রেডে বেতনভাতা পেতেন।

কিন্তু উভয় ধরনের শিক্ষকের বেতনভাতা বাড়ানোর পরও কাউকেই সরকার খুশি করতে পারেনি। প্রধান শিক্ষকদের গেজেটেড মর্যাদার দাবি বহাল থাকে। সহকারী শিক্ষকরা দাবি তোলেন প্রধান শিক্ষকদের পরের ধাপেই (গ্রেডে) তাদের বেতনভাতা দিতে হবে। ফলে উভয় অংশ দাবিদাওয়া নিয়ে ফের মাঠে সক্রিয় হয়। এ নিয়ে ক্লাস বর্জন, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচিও পালন করেন তারা।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের বেতনভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিগত (২০১৮) সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের (নির্বাচনী) ইশতেহারে যুক্ত হয়। অপর দিকে বিশ্বব্যাপী মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের সঙ্গেও এটি সাজুয্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। তাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বেতনভাতা বৃদ্ধি এবং বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নেয়।

সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রস্তাবে বেতন বৃদ্ধির পক্ষে ১১টি যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। এগুলোর মধ্যে আছে, সর্বশেষ নীতিমালায় (২০১৯) শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা এইচএসসি থেকে সবার জন্য স্নাতক করা; মানসম্মত ও উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিতে বেতন স্কেল আকর্ষণীয় করা; সব শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে না পারার ব্যর্থতা যেহেতু সরকারের (প্রতি বছর পিটিআইতে প্রশিক্ষণ দেয়া যায় ১৫০০০ আর প্রশিক্ষণবিহীন ৭০০০০), তাই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আর প্রশিক্ষণবিহীন নির্বিশেষে ভাগ না করা ও সেটা অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ না করে সবার জন্যই একই স্কেল নির্ধারণ।

এছাড়া এতে প্রধান শিক্ষকদের বেতন স্কেল গ্রেড-১০ করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। যদিও ২০১৭ সালের নভেম্বরে প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড (গ্রেড-১১) উন্নীতকালে বলা হয়েছিল যে, গ্রেড-১০ দ্বিতীয় শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তাদের স্কেল। তাই তাদের সেটি দেয়া যাবে না।
এতে সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলা হয়, ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের অনুপাত ছিল ১:৩। বর্তমানে তা হয়েছে ১:৬। সহকারী থেকে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতির হার আগের চেয়ে অনেক কমেছে। তাই দীর্ঘদিন সহকারী শিক্ষকদের একই স্কেলে কাজ করতে হয়। বেতনভাতা না বাড়ালে হতাশা সৃষ্টি হবে। হতাশা দূর করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে বেতন বাড়ানো দরকার।
সূত্র : যুগান্তর