শনিবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং

শ্রমবাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ

মুক্তখবর :
সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯
news-image

*ফিরে আসতে হচ্ছে প্রবাসীদের*

ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ (মুক্তখবর রিপোর্ট) : দিন বদলের আশায় ঋণ নিয়ে অথবা সর্বস্ব বিক্রি করে দিয়ে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকরা নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হওয়াসহ অন্যান্য কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে শ্রমবাজার হারাতে বসেছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ সৌদি আরব থেকে ফেরত আসতে হয়েছে ১৪০ বাংলাদেশিকে। এদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন সৌদি আরবে অবস্থানের পর ভিসার মেয়াদ শেষে দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাহায্যকারী দল। তবে ফিরে আসাদের মধ্যে নতুন শ্রমিকও রয়েছেন, যার মাত্র কয়েক মাস আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন কাজের সন্ধানে। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক থেকে বলা হয়, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তাদের অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষ। কেউ আবার বৈধ মালিক রেখে অন্য মালিকের কাছে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন কোনো না কোনো ফ্লাইটে সৌদি আরব থেকে শ্রমিকেরা দেশে ফিরে আসছেন। গড়ে প্রতিদিন ৭০-৮০ জন কর্মী ফিরছে। এর মধ্যে অনেক পুরনো শ্রমিকও রয়েছে। বাংলাদেশের শ্রম রপ্তানির ৮০ শতাংশেরও বেশি মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক। এর সবচেয়ে বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরব। গত বছর সৌদি আরবে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকদের থেকে বাংলাদেশে ২৬০ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে, যা মোট রেমিটেন্সের ১৮ শতাংশ। কিন্তু সম্প্রতি সৌদি আরবের শ্রম বাজার হারাতে বসেছে বাংলাদেশ। সূত্রমতে, ১৯৭৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বৈধভাবে সৌদি আরবে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ৫৪৪ জন। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বৈধভাবে গেছেন ২৩ লাখ ৬৮ হাজার ২২৭ জন, কুয়েত গেছেন ৬ লাখ ১৬ হাজার ৬৫১ জন, ওমান গেছেন ১৪ লাখ ২৮ হাজার ২১৬ জন, কাতার গেছেন ৭ লাখ ৫৭ হাজার ৭৯৮ জন। ২০০৮ সাল থেকে সৌদি আরবের শ্রম বাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ ছিল। ৭ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৫ সালে সৌদি আরব আবার নতুন করে বাংলাদেশী শ্রমিকদের নেয়া শুরু করে। সে বছরের ফেব্রুয়ারিতে গৃহ খাতে শ্রমিক নিতে বাংলাদেশের সাথে চুক্তি করে সৌদি আরব। এই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ২০১৬ সালে ৬৮ হাজার ২৮৬ জন, ২০১৭ সালে ৮৩ হাজার ৩৫৪ জন, ২০১৮ সালে ৭৩ হাজার ৭১৩ জন নারী শ্রমিক সৌদি আরব যান। কিন্তু এর ফলাফল হয় ভয়াবহ। ২০১৭ সাল থেকেই প্রায় প্রতি মাসেই সৌদি থেকে কিছু না কিছু নারী শ্রমিক ফিরে আসছেন। ফিরে আসা নারীদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের কারণে অন্তঃসত্ত্বা নারী যেমন আছেন, তেমনি আছেন ভয়াবহ অত্যাচারে মানসিক ভারসাম্য হারানো নারীও। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফিরে আসা নারীদের তাদের পরিবার গ্রহণ করতে চায় না।
এদিকে, ২০১৭ সালে সৌদি সরকারের সৌদীকরণ নীতিমালার ঘোষণা অনুযারী আংশিক বাস্তবায়ন হওয়ায়, গত ১৫ মাসে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ৭ লাখ ২০০ জন প্রবাসী দেশটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১৭ সালে সৌদি সরকারের পরিসংখ্যান দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪ লাখ ৬৬ হাজার প্রবাসী দেশটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়াও গত তিন মাসে আরো ২ লাখ ৩৪ হাজার ২০০ জন শ্রমিক নিজ দেশে ফিরে গেছেন। তবে এদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন তা জানা যায়নি। ইতিমধ্যেই দেশটিতে বেশ কয়েকটি হাউজিং কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশি সহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মার্কেট গুলো হয়ে পড়েছে ক্রেতা শুন্য। তার ওপর একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নি দগ্ধ, হৃদরোগ ও হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে প্রায়ই প্রাণহানি ঘটছে বাংলাদেশিদের। ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব থেকে ৪ হাজার ৩শ ৩ জনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের প্রকাশ করা তথ্য থেকে দেখা যায়, গত ৫ বছরে দেশে ফেরত আসা বৈধ প্রবাসী শ্রমিকদের মরদেহের সংখ্যা ১৭ হাজার ৩০৩।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের কর্মীদের দ্বিতীয় প্রধান গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। কিন্তু বন্ধ হওয়ার এক বছর পরও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নতুন করে চালু করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও অবৈধ অভিবাসীদের আটক করতে মালয়েশিয়া সরকার হঠাৎ অভিযান শুরু করায় দেশটিতে থাকা বাংলাদেশি কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বহু বাংলাদেশি গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বহির্গমন বিভাগ সূত্র জানায়, গত বছর মালয়েশিয়া থেকে ৭ হাজার ৩৭২ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ফিরেছেন প্রায় আড়াই হাজার অবৈধ অভিবাসী। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের একটি সংঘবদ্ধ চক্রের অনৈতিক ব্যবসা পরিচালনার কারণে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। অবশ্য তখন সব দেশ থেকেই শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দেয় দেশটির সরকার। ১২ সেপ্টেম্বর নেপালের সঙ্গে কর্মী নিয়োগে চুক্তি করেছে মালয়েশিয়া। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সে সুযোগ নিতে পারেনি। এদিকে, কর্মী নিয়োগ বন্ধ হওয়ার আগপর্যন্ত মালয়েশিয়ার একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহলকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির (জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান) একটি চক্র সেখানকার শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণ করছিল। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার বন্ধের পর অভিযুক্ত ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ার মতো সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার অন্য দেশগুলো দখল করে নিলে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হলে সমস্যাটি বড় আকার ধারণ করবে বলে জানান তারা।