শনিবার, ১৮ই অক্টোবর, ২০১৯ ইং

ক্যাসিনো খালেদ ও সম্রাটকে শোকজ

মুক্তখবর :
সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯
news-image

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ (স্টাফ রিপোর্টার) : অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে বুধবার রাতে অস্ত্রসহ গ্রেফতার যুবলীগ ঢাকা দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও চাঁদাবাজির অভিযোগে অভিযুক্ত যুবলীগ নগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটকে শোকজ করেছে আওয়ামী যুবলীগ। সংগঠনটির একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও হারুনুর রশীদের নেতৃত্বাধীন যুবলীগের কমিটির সাত বছর মেয়াদে ২০ নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে আওয়ামী যুবলীগের নিজস্ব ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি কয়েকজনকে শোকজও করে। এর মধ্যে সম্রাট ও খালেদকে দুই দফা শোকজ করা হয়েছিল বলে যুবলীগ সূত্রে জানা গেছে।

অবৈধভাবে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগে গতকাল রাতে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। তার গ্রেফতারের খবর শোনে সংগঠনের সহস্রাধিক নেতাকর্মী নিয়ে নিজ কার্যালয়ে অবস্থান নেন ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। এর দু-দিন আগেই তাদের দ্বিতীয়বারের মতো শোকজ করা হয়েছিল।

গতরাতে রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকায় ইয়ংমেন্স ক্লাবের নিষিদ্ধ জুয়ার কেসিনোতে অভিযান চালিয়ে ১৪২ জন নারী-পুরুষকে আটক করে র‌্যাব।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পে চাঁদা দাবির অভিযোগে সমালোচনার মুখে থাকা রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। যুবলীগের কয়েক নেতা সম্পর্কেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এরপর বুধবার রাতে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনটির প্রভাবশালী নেতা খালেদকে গ্রেফতার করল র‌্যাব।

বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা শোভন-রাব্বানীর চেয়েও খারাপ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুবলীগের ঢাকা মহানগরের একজন নেতা যা ইচ্ছে করে বেড়াচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে।

আরেকজন এখন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। সদলবলে অস্ত্র নিয়ে ঘোরেন। এসব বন্ধ করতে হবে। যারা অস্ত্রবাজি করেন, যারা ক্যাডার পোষেণ, তারা সাবধান হয়ে যান, এসব বন্ধ করুন। তা না হলে যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরও দমন করা হবে।

যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট এবং সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী ওইসব কথা বলেছিলেন বলে জানান অনেক নেতা।

যুবলীগের একটি সূত্র জানায়, গণমাধ্যমে অভিযোগের খবর আসার পরে প্রথম পর্বে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে শোকজ করা হয়।

যুবলীগের এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুবলীগের কোনো নেতা বা কোনো শাখার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সংগঠনটি নিজস্ব ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এর তদন্ত ও বিচার করবে। এজন্য যুবলীগ চেয়ারম্যান বা সাধারণ সম্পাদক বরাবর অভিযোগ ও প্রমাণ পাঠাতে বলা হয়েছে।

সংগঠনের পক্ষ থেকে এগুলো চলার পাশাপাশি বুধবার র‌্যাব তার বাসা এবং ক্লাবে অভিযান চালায়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে খবর ছড়িয়ে পড়ে খালেদকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়; কিন্তু তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পরে বুধবার রাতে তাকে গ্রেফতার করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুবলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা জানান, প্রতিটি বিভাগের জন্য যুবলীগের আলাদা আলাদা ৯টি নিজস্ব ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালের প্রধান থাকেন সংগঠনটির এমন একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য, যিনি বিগত কমিটিতে ওই বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ছাড়া সংগঠনের চেয়ারম্যান, সাধারণ সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক, দফতর সম্পাদক মিলিয়ে ২০ জনের মতো সদস্য থাকেন প্রতি ট্রাইব্যুনালে।

সংগঠনটির ওই নেতা জানান, বর্তমান কমিটির মেয়াদে বিভিন্ন অভিযোগে সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ ২০ নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনটির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাযনির্বাহী কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া বক্তব্যের উদ্বৃতি দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ দেখে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে ওই দুই নেতাকে (সম্রাট-খালেদ) শোকজ করা হয় দুদিন আগে।

ওই নেতা আরও বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগ সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে প্রথমবার শোকজের চিঠি পাঠানোর পর জবাব মনঃপূত না হওয়ায় সম্প্রতি দ্বিতীয়বার শোকজের চিঠি পাঠানো হয়। এই চিঠির জবাব নিয়ে আগামী শনিবার তাদের সরাসরি ট্রাইব্যুনালের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল।

যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ক্যাসিনোর বিষয়টি জানার জন্য আমরা নতুন করে শোকজ দিয়েছি। এই বিষয়গুলো আসার পরই আমরা ট্রাইব্যুনালে তাদের মুখোমুখি করবো সত্যতা জানার জন্য। এটা আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ করে নাই, পত্রিকার ভাষা অনুযায়ী আমরা শোকজ করেছি।

বুধবার ফকিরাপুলের ইয়াংমেন্স ক্লাবে নিষিদ্ধ ক্যাসিনোতেও অভিযান চালায় র‌্যাব। এখান থেকে দুই নারীসহ ১৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। ক্যাসিনোতে মদ আর জুয়ার বিপুল সরঞ্জামের পাশাপাশি প্রায় ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়।

ক্লাবটির সভাপতি যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। অনেক দিন ধরে এখানে জুয়াসহ নানা অপকর্ম চলছিল। সাম্প্রতিককালে অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ার পর বুধবার অভিযান পরিচালিত হয়। ইয়াংমেন্স ক্লাবের পর ওই রাতেই ঢাকার আরও তিনটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব।

বুধবার রাতেই গুলিস্তানে পীর ইয়েমেনী মার্কেটসংলগ্ন একটি ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। স্থানীয় কয়েকজন জানান, এ ক্যাসিনোর নেতৃত্বে আছেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট।

খালেদ মাহমুদের সন্ধানে বুধবার দুপুরের পর থেকে তার গুলশান-২ এর ৫৯ নম্বর রোডের ৫নং বাসা ঘিরে রাখে র‌্যাব। প্রিমোরোজ গার্ডেন নামের ৬ তলাবিশিষ্ট এ ভবনের তিন তলায় পরিবার নিয়ে থাকেন যুবলীগ নেতা খালেদ।

বাড়ির ব্যবস্থাপক জানান, প্রথমে ডিবি পরিচয়ে একদল লোক বাসায় আসে। এরপর আসে র‌্যাব। রাতে এখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় বাসার লকার এবং দেয়াল আলমিরা থেকে অবৈধ অস্ত্র, ইয়াবা, টাকা, ডলার উদ্ধার করা হয়।

এদিকে দুপুরের আগে থেকেই ফকিরাপুলের ইয়াংমেন্স ক্লাবটিও ঘিরে ফেলেন র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় কাউকেই ক্লাবের ভেতরে এবং ভেতর থেকে বাইরে আসতে দেয়া হয়নি। জ্যামার দিয়ে এলাকাটির মোবাইল টেলিযোগাযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়।

বিকালের দিকে র‌্যাব সদস্যরা ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় জুয়া খেলারত ও মাদক সেবন অবস্থায় ক্লাবের স্টাফসহ ১৪২ জনকে গ্রেফতার করেন তারা। ক্লাবের ভেতরে তারা পশ্চিমা ধাঁচের অত্যাধুনিক ক্যাসিনোর সন্ধান পান।

জুয়ার আধুনিক বোর্ড, ক্যাশ টাকার বিকল্প প্লাস্টিক কয়েন, কার্ড, জুয়া খেলার ইলেকট্রনিক মেশিনসহ বেশ কয়েকটি কাউন্টার দেখেন। বোর্ডগুলো পরিচালনার সঙ্গে জড়িত দু’জন নারীকে এখান থেকে গ্রেফতার করা হয়।

বিভিন্ন বারে যে ধরনের বিদেশি মদ পাওয়া যায়, এ ক্যাসিনো থেকেও একই ধরনের মদ উদ্ধার করা হয়েছে। জুয়ার বোর্ডের পাশেই মদের অনেক বোতল দেখা গেছে। যারা মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে নিয়মিত জুয়া খেলতে আসেন, তাদের শুরুতে মদ দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

পরে তাদের কাছে মদ বিক্রিও করা হয়। স্থানীয়রা জানান, বেশ কিছু দিন ধরে এখানে এসব চলছে। সকাল থেকে শুরু হয়ে পরদিন ভোর পর্যন্ত চলে। মাঝে কয়েক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে সকাল ১০টা থেকে ফের বসে জুয়ার আসর। বুধবারও অন্যদিনের মতো সকাল থেকে চালু হয় জুয়ার বোর্ডগুলো।

কিন্তু দুপুরের আগেই র‌্যাব ঘিরে ফেলায় অবস্থা পাল্টে যায়। মোবাইল সংযোগ বন্ধ থাকায় কেউ ভেতর থেকে বাইরে বা বাইরে থেকে ভেতরে যোগাযোগ করতে পারেননি। ফলে কী হচ্ছে, তা কেউ আঁচ করতে পারেননি।

শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে বেড়ে ওঠা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ফকিরাপুলের ইয়াংমেন্স ক্লাবের সভাপতি। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই ক্লাবটি এক সময় ফুটবল খেলার জন্য বিখ্যাত ছিল। খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে নানা ধরনের অপকর্ম শুরু হয়।

বসে জুয়ার আসর। তরুণ-তরুণীদের আনাগোনা চলে গভীর রাত পর্যন্ত। জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে অনেককে হাহাকার করতে দেখা গেছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।