মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

মাদকের ভয়াবহতা রুখতে গণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে!!

মুক্তখবর :
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯
news-image

আশিকুর রহমান হান্নান

নিষিদ্ধ জগতে মাদকই সবচেয়ে লাভবান ব্যবসা ও বেশি আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে ফেনসিডিল ও ইয়াবা সহজলভ্য ও বহনযোগ্য বলে এর বিস্তার বাংলাদেশজুড়ে। দেশের এমন কোনো উপজেলা খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে মাদকের থাবা নেই। দেশজুড়ে এক বিশাল জাল বিস্তার করে আছে এই মরণ নেশার ভয়াবহ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। বর্তমান নেশাসক্ত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ইয়াবা ও ফেন্সিডিল বেশি জনপ্রিয়। একে ঘিরে দেশব্যাপী গড়ে উঠেছে বিশাল নেটওয়ার্ক। ফেনসিডিলের চেয়ে ইয়াবাই বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই মরণ নেশার বিস্তারে সমাজে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, তেমনিভাবে বিশৃঙ্খলতা তৈরি হচ্ছে। মাদকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার জন্য, যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ যেমন জরুরি, তেমনিভাবে যারা মাদক সেবনে বিপর্যস্ত তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগও জরুরি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সরকারি উদ্যোগে মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গুলো প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না; বরং সরকারি এই কেন্দ্র গুলোই এখন নানা রকম দুরবস্থায় পতিত।
দেশে এখন কোন রাজনৈতিক আন্দোলন সংঘাত-সহিংসতা না থাকলেও পারিবারিক-সামাজিক অপরাধ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। এ ধরনের সামাজিক পরিস্থিতির পেছনে মাদক বাণিজ্য, মাদক সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা সুস্পষ্ট। সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদী হুমকি ও নেটওয়ার্ক ধ্বংসে জিরো টলারেন্স নীতিতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও জঙ্গিবাদের চেয়েও ভয়াবহ ও দৃশ্যমান সামাজিক হুমকি হয়ে ওঠা সত্ত্বেও মাদকের ভয়ঙ্কর নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা তেমন উল্লেযোগ্য নয়। মাদক সন্ত্রাসীরা বছরের পর বছর ধরে বাঁধাহীনভাবে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে করতে এখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে।
ভয়াবহ মাদকের মরণ ছোবলে আক্রান্ত বাংলাদেশ। শহর, নগর, বন্দর, জেলা, উপজেলা পেড়িয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাপক হারে এর বিস্তার ঘটেছে। ‘মাদকদ্রব্য’ বর্তমান সমাজে যেমন সংকট সৃষ্টি করছে ভবিষ্যতে এর বিরুপ প্রতিফলন দেশের মণুষ্য সমাজকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দেবে বলে গবেষকরা মনে করছেন। তাদের দাবী বাংলাদেশে নেশাদ্রব্যের বিস্তার জ্যামিতিক হারে যেমন বাড়ছে তেমনি মাদকাশক্তের সংখ্যাও অনরূপ আশংকাজনক হারে বেড়েই চলেছে। গবেষকদের এ দাবীর যথার্থতা আছে। বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ কমবেশী মাদকাশক্ত হয়ে পড়েছে। এর হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এদের মধ্যে ২ শতাংশ স্পিরিট, ২ শতাংশ ফেনসিডিল, হিরোইন ও গাঁজা ও ১ শতাংশ প্রচলিত বাংলা চোলাই বা চুয়ানি, ৩ শতাংশ ইয়াবা বড়ি, ২ শতাংশ দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন ব্যান্ডের মাদক পান করে থাকে। এই মাদক সেবীদের মধ্যে রয়েছে প্রাপ্ত বয়স্ক যুবক, ছাত্র, পেশাজীবি শ্রমিক, চাকুরীজীবি, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, ও রাজনীতিবিদ। যদিও মাদক দ্রব্যের কেনা-বেচা করা আইনত: নিষিদ্ধ এবং সরকারি বিধি নিষেধ আছে। এর পরেও গোটা দেশেই অবাধে মাদকদ্রব্যের বিকিকিনি চলছে। আইন থালেও এর প্রয়োগ নেই কোথাও। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর থাকলেও তার তৎপরতা নেই। অবৈধ মাদক দ্রব্যের চোরাচালান ও বিক্রি কোথাও বন্ধ নেই। থানা পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের মাসিক মোটা অংকের অর্থ চুক্তিতে সারাদেশে মাদক ব্যাবসার ব্যাপক বিস্তার ঘটছে। বিষয়টি অনেকটা ওপেন সিক্রেট। মাদক সেবনের নীল দংশনে প্রতিবছর দেশের অসংখ্য তরতাজা প্রান নিরবে, নিভৃত্তে ধুকে ধুকে মারা যাচ্ছে সে খবর রাখে কে ? এখন প্রায়শই খবরের কাগজগুলোতে খবর হিসেবে দেখা যায়, মাদকসেবী পুত্রের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পিতা তার পুত্রকে, আবার মাদকসেবী পিতার কারনে পুত্ররা তাদের পিতাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে জেলখানার নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠাচ্ছে। কিন্তু জেলখানাও মাদকমুক্ত নয়। জেলের অভ্যন্তরেও মাদক দ্রব্য ধরাপড়া ও সেবনের সংবাদ খবরের কাজগুলোতে দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে নেশা একটি ভয়ানক সামাজিক অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই অভিশাপ সুস্থ পরিবারকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের মুখে। সারাদেশে এমন বহু পরিবার আছে যেগুলো এই নেশার কারনে অতিষ্ট। নেশার দংশনে কেউ কেউ অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ছে নানা অসামাজিক কাজে। লিপ্ত হচ্ছে সন্ত্রাসী, ছিনতাই, ডাকাতি, চুরি সহ নানা অপরাধে। সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে নানা সমস্যা। পরিবারে সৃষ্টি করছে অশান্তি। এ থেকে মুক্তি পাবার উপায় কি ? এ প্রশ্নের উত্তর সরকার ও দেশবাসীকে দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। এ সকল খবর দেশবাসীকে হতাশ করে। মাদককে নিয়ন্ত্রন না করা গেলে দেশের সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়বে। দেশব্যাপী এ মাদকদ্রব্য বিস্তারের সাথে যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে সেটি অস্বীকার করার উপায় নেই। পর্দার অন্তরালে থেকে কখনও প্রকাশ্যে ক্ষমতাবলে সিন্ডিকেট করে রাজনীতিবিদ ক্ষমতাধরদের কেউ কেউ মাদক ব্যবসা ও চোরাকারবারীদের নিয়ন্ত্রন করেন। এ সকল ক্ষমতাধরদের হাত অনেক লম্বা। কারবারের ময়দান থেকে মন্ত্রনালয় পর্যন্ত এদের চেইন অফ কমান্ড অনেক শক্তিশালী। কারন তাদের পকেটে থাকে অবৈধ পথে উপার্জিত কোটি কোটি টাকা।
মানুষের কাছে অনায়াসলব্ধ জিনিষের যেমন মূল্য থাকেনা তেমনি নিষিদ্ধ জিনিষের প্রতি আকর্ষন থাকে শতগুন বেশী। এ বাক্যটির যথার্থতা উপলব্ধি করে সরকারকে দেশব্যাপী মাদকনিয়ন্ত্রনের জন্য নতুন সাজে নতুন কাঠামোয় এগিয়ে আসতে হবে। অবৈধ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোরতা সহ অবৈধ মাদক ব্যবসার অপরাধে গ্রেফতারকৃত আসামীদের জামিন অযোগ্য ধারা প্রযোজ্য আইন প্রনয়ন করা যেতে পারে। ঢেলে সাজাতে হবে মাদক নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরকে। বাংলাদেশে নেশা বিরোধি যেসব আইন আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো- ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯৯ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, ২০০১ সালের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ড বিধিমালা, ২০০২ সালের এলকোহোল নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ও ২০০৫ সালের বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাশক্তি পরামর্শকেন্দ্র, মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও মাদকাসক্ত পুর্নবাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা বিধিমালা ইত্যাদি। এতো আইন থাকার পরও কমছেনা মাদকদ্রব্যের ব্যবহার, কমছেনা পাচার ও এর সাথে জড়িত অন্যান্য অপরাধ কর্মকান্ড। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, খোদ রাজধানীর পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের টেকনোয়াদ্দা গ্রামবাসী মাদক ব্যবসায়ীদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এ এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা এখন টেকনোয়াদ্দাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মূর্তিমান আতংক। ইয়াবা ও ফেন্সিডিলের পাইকারী ও খুচরা ব্যবসাসহ হেন অপকর্ম নেই যা এখানকার মাদক ব্যবসায়ীরা করছে না। এ অবস্থার প্রতিকার চেয়ে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে আবেদন জানিয়েছে। ভুক্তভোগীদের অনেকে জানান, টেকনোয়াদ্দা এলাকার কুখ্যাত মাদক স¤্রাট মাসুদ মোল্লা, মোমেন মোল্লা, মামুন মোল্লা, বাচ্চু মিয়া, খোকন মিয়া, শামীম মিয়া, জালাল মিয়ার বিরুদ্ধে রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন থানায় একডজনের বেশি মামলা থাকলেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। এলাকার কেউ এসব মাদক স¤্রাটের অপকর্মের প্রতিবাদ করলেই প্রতিবাদকারীর উপর হামলা-মামলাসহ নানা ভাবে হয়রানি করা হয়। তাদের নানা অপকর্মে এলাকার সাধারন মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেও ভয়ে কেউ টু-শব্দটিও করার পাচ্ছে না। এলাকাবাসী আরো জানায়, টেকনোয়াদ্দা এলাকার কুখ্যাত মাদক স¤্রাট মাসুদ মোল্লা, মোমেন মোল্লা, মামুন মোল্লা, বাচ্চু মিয়া, খোকন মিয়া, শামীম মিয়া, জালাল মিয়া এবং তাদের পালিত সন্ত্রাসী বাহিনী এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে বেপরোয়া হয়ে একের পর এক তান্ডব চালাচ্ছে। এছাড়া তারা এলাকায় নানা অপকর্ম করলেও হামলা মামলার ভয়ে কেউ টু-শব্দটিও করার সাহস পাচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, এ বাহিনীর সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গ্রামের সাধারণ মানুষকে আতংকিত করতে কয়েক দিন পর পর এলাকায় তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে। আর এসব তান্ডবের প্রতিবাদ করতে গেলেই মামলা-হামলা, মারপিট, বাড়িঘর ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ এবং হত্যা করা হয় প্রতিবাদকারীদের। এসব মাদক ব্যবসায়ী উঠতি বয়সের কিশোর যুবকদের নানাভাবে মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবনে সম্পৃক্ত করছে। বর্তমানে টেকনোয়াদ্দা এলাকার মত দেশের বিভিন্ন এলাকায় এখন মাদক ব্যবসায়ীদের বেপরোয়া কর্মকান্ডের কারনে নিরীহ মানুষ অশান্তিতে রয়েছে।
নিয়ন্ত্রণহীন মাদক বাণিজ্য এবং ক্রমবর্ধমান মাদকাসক্তি ভয়াবহ সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। মাদকাসক্তি ও মাদক বাণিজ্যের কুফল প্রত্যক্ষ করে দেশের সর্বত্র মাদকের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা এবং গণপ্রতিরোধের সামাজিক আন্দোলনও শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহের তরফ থেকেও মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের কার্যক্রম চলছে। এমনকি দেশের সর্বত্র স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সাথেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা ও একাত্মতা প্রকাশের খবর সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এতকিছুর পরও মাদকের রমরমা বাণিজ্যে কোন ঘাটতি দেখা যাচ্ছেনা। মাদক বিরোধী প্রচারণা ও তৎপরতায় সামাজিক-রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা ও শুভঙ্করের ফাঁক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট গুলোতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের মাদক কেনাবেচার স্পট এবং মাদক পাচারের রুটসহ কোথায় কারা কারা জড়িত তার বিবরণসহ তালিকা প্রকাশিত হলেও বছরের পর বছর ধরে অব্যাহতভাবে এবং ক্রমবর্ধমান হারে মাদকের কারবার চলে কিভাবে? তালিকা হাল নাগাদ হয়না অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু বরণ করার পরেও মাদক স¤্রাটের তালিকায় নাম থকে। দেশের কিছু থানার ওসিসহ এসআই, এএসআইদের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের শখ্যতাও রয়েছে। তারা রীতিমত তালিকা তৈরী করে বখরা আদায় করার অভিযোগ রয়েছে। আবার রাজমিস্ত্রি, বাদাম বিক্রেতা, ডিম বিক্রেতা, রিক্সা-ভ্যান চালক, নৌকার মাঝি আজ মাদক ব্যবসা করে শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছেন তারা এখন পুলিশের সাথে শখ্যতা গড়ে তুলেছেন। কেউ কেউ নির্বাচনে কালো টাকার প্রভাব খাটিয়ে হয়েছেন চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, ইউপি সদস্য। সঙ্গত কারণে তারা আইন শৃঙ্খলা বাহনীর ধরাছোয়ার বাইরে। বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি থাকে মাদক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আলাদা দপ্তরও আছে। তারপরও এর আগ্রাসন কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না।
মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচার একটি জাতীয় সমস্যা। এর অপব্যবহারের শিকার হচ্ছে আমাদের যুব ও ছাত্র সমাজ। এর ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা আমাদের শিশুরাও। একটি দেশের যুব সমাজ যদি মাদকের কাছে পরাজিত হয় তবে তা দেশের জন্য ডেকে আনে মারাত্মক পরিণতি। মাদক ধীরে ধীরে একটি সমাজকে পঙ্গু করে দেয়। শিক্ষিত-অশিক্ষিত ও বয়স নির্বিশেষে সবাই মাদকের কাছে শিকার হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির সম্মুখিন হয় উঠতি বয়সের তরুনরা। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী এসব তরুণরা ক্রমেই ঝুকে পড়ছে মাদকের দিকে। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি চিরন্তণ আগ্রহ থেকেই অনেকে ঝুকে পড়ছে নেশার জগতে। প্রথমে নিছক আগ্রহ থেকেই একটি আধটু নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ, অত:পর স্থায়ী মাদকসেবী। কারণ, আগ্রহের বশে মাদক গ্রহণ করলেও বেশির ভাগই অন্ধকার জগত থেকে আর ফিরে আসতে পারে না। বর্তমানে যে নেশাজাতীয় দ্রব্যটি সবচেয়ে আলোচিত তা হচ্ছে ইয়াবা। এছাড়া ফেনসিডিল, প্যাথিডিন, হেরোইন, ক্যানাবিস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তরুণ প্রজন্মের কাছে ইয়াবা এখন একটি জনপ্রিয় নাম, প্রতিদিনের সঙ্গী। এই মাদকের নেটওয়ার্ক নির্মূল করা দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু সর্ষের ভেতর ভূত থাকলে ওঝার পক্ষে ভূত তাড়ানো কঠিন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবশালী থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গড়ে উঠেছে মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও সিন্ডিকেট। মাদক বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে এই সিন্ডিকেটকে আরো শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য করে তুলছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাদক বিরোধী অভিযান যেন ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মত। প্রতি মাসে লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ কোটি কোটি টাকার মাদক ধরা পড়লেও এর নেপথ্যের হোতারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। আর হাতে নাতে যারা ধরা পড়ছে তারাও পুলিশের দুর্বল চার্জশিটের সুযোগে জামিন নিয়ে বেরিয়ে গিয়ে অথবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ম্যানেজ করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পত্র-পত্রিকায় মাদকের নেটওয়ার্ক ও সিন্ডিকেট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্যাবলী প্রকাশিত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও তাদের তথ্য রয়েছে এবং মাঝে মধ্যে অনেকে ধরাও পড়ছে। কিন্তু দৃষ্টাষ্টমূলক শাস্তি না হওয়ায় তা’ কমছেনা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক সাইনবোর্ড ব্যবহারকারী ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের সম্পর্ক থাকায় তারা যা ইচ্ছা তাই করার সুযোগ পাচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা এমনকি আরো উচ্চপর্যায়ে বিতরণ করা হয় মাদক ব্যবসার বখরা। মাদকদ্রব্য দমন ও প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে। মাদককে ‘না’ বলার সময় শেষ, এখন প্রয়োজন গণঐক্যের প্রতিরোধ। এটি এখন সময়ের দাবি। মাদকের সাথে যারা জড়িত তাদের আইনের আওতায় নিয়ে এসে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। মাদকের অপব্যবহার ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট সব রকম অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও জনসচেতনতা জরুরি।