রবিবার, ২০শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং

মাফিয়াদের মাফিয়া ছিলেন সেলিম প্রধান

মুক্তখবর :
অক্টোবর ৩, ২০১৯
news-image

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০১৯ (স্টাফ রিপোর্টার) : ক্যাসিনো-কাণ্ডে সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস ব্যবসায়ী সেলিম প্রধানের নাম বেরিয়ে আসার পর তার প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘এই সেলিম মাফিয়াদেরও মাফিয়া। জি কে শামীম, সম্রাট, খালেদদেরও বস তিনি। তার যোগাযোগ আরও ওপরে।’ খোঁজ নিয়ে খবরও মিলল, প্রিন্টিং ব্যবসার আড়ালে সেলিম প্রধানের ছিল অভাবনীয় ক্ষমতা ও দাপট। সবাই তাকে সমীহ করে চলতেন। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর গোয়েন্দারা এখন সেই ক্ষমতার উৎস খুঁজছেন। বহুল আলোচিত সেলিমও র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দিয়েছেন চমকপ্রদ বেশ কিছু তথ্য।

র‌্যাব সূত্র জানিয়েছে, গুলশানে সেলিম প্রধানের অনলাইন ক্যাসিনোর নেপথ্যে ছিলেন উত্তর কোরিয়ার নাগরিক মি. দো। থাইল্যান্ডে বসবাসকারী ওই ব্যক্তির মাধ্যমেই ২০১৮ সালে অনলাইন ক্যাসিনো খোলেন তিনি। মতিঝিলের ক্লাবপাড়াগুলোতে যে কোনো ব্যক্তিই ক্যাসিনো খেলত। তবে সেলিম প্রধানের গ্রাহকরা ছিলেন সমাজের উঁচু স্তরের।

সেলিম প্রধানের অনলাইন জুয়ার মূল সার্ভার ফিলিপাইনের ম্যানিলায়। তিনি সেখান থেকে অনলাইন জুয়ার কপিরাইট কিনে ঢাকায় চালাচ্ছিলেন এই অবৈধ ব্যবসা। ম্যানিলাকেন্দ্রিক বিশ্বের কুখ্যাত বেশ কয়েক জুয়াড়ির সঙ্গেও রয়েছে সেলিম প্রধানের উষ্ণ যোগাযোগ। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ-সংক্রান্ত তথ্য দিয়েছেন তিনি।

র‌্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সেলিম প্রধান জিজ্ঞাসাবাদে তাদের জানিয়েছেন, ভাগ্য বদলাতে নব্বই দশকে তিনি জাপান গিয়েছিলেন। সেখানে বিয়েও করেন। নানা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে গাড়ি ব্যবসা করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েন। ওই ঘটনায় জাপানে তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়। একপর্যায়ে জাপান থেকে ফিরে আমেরিকায় চলে যান। সেখানেও বিয়ে করেন। মার্কিন স্ত্রীর মাধ্যমে আবারও জাপান যাওয়ার চেষ্টা চালান। যদিও ব্যর্থ হন।

সেলিম প্রধান জানিয়েছেন, গত বছর থেকেই তার কাছে মেসেজ ছিল, ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে। এ জন্য নিজের ব্যবসাও গুটিয়ে নিচ্ছিলেন। সর্বশেষ তার কাছে মেসেজ আসে, চলমান অভিযানে তিনি নজরদারিতে রয়েছেন। এরপরই থাইল্যান্ডে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। থাই পাসপোর্ট বহন করায় ঢাকা ছাড়তে ঝামেলা হবে না বলে তার ধারণা ছিল।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর র‌্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা  বলেছেন, সেলিম প্রধানের বাসা ও অফিস তল্লাশি করে তারা কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি পেয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও কিছু নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, উত্তর কোরীয় নাগরিকের সঙ্গে ফিফটি-ফিটটি ভাগে অনলাইন ক্যাসিনো চালানো হতো। অর্থাৎ লভ্যাংশের অর্ধেক পেতেন সেলিম প্রধান আর বাকি অর্ধেক ওই বিদেশি নাগরিক। পুরো টাকাই বিদেশে পাচার হতো।

পুলিশের গুলশান বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন- এমন একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বনানীতে সেলিম প্রধানের একটি অভিজাত স্পা সেন্টার রয়েছে। পুলিশ বা মাঠ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সেখানে প্রবেশ করতে পারতেন না। কয়েক বছর আগে একবার সেখানে পুলিশের একটি দল গোপন খবরের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে যায়। তবে অদৃশ্য ফোন পেয়ে ফিরে আসতে হয়।

সূত্রগুলো বলছে, সেলিম প্রধান মাসের বেশির ভাগ সময়ে থাইল্যান্ড থাকতেন। তবে দেশে এলেও তিনি একই স্টাইলে জীবনযাপন করতেন। স্পা সেন্টারে আর নিজের ফ্ল্যাটে রীতিমতো জমকালো পার্টি দিতেন। তার এসব পার্টিতে দেশের প্রভাবশালী নানা স্তরের লোকজন যোগ দিতেন।

সূত্র জানায়, চারদলীয় জোট সরকারের আমলে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে উত্থান ঘটে সেলিম প্রধানের। হাওয়া ভবনের বলয়ভুক্ত হওয়ার পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। গিয়াসউদ্দিন মামুনকে বিএমডব্লিউ গাড়ি উপহার দিয়ে তিনি নজরে আসেন সবার। কিন্তু সরকারের পতনের পর সেই গাড়িও ফেরত নেন। এরপর নতুন সরকারের অনেক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন এবং অপকর্ম অব্যাহত রাখেন। তবে সেলিম প্রধান লন্ডন কানেকশন থেকে সরে আসেননি।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অনলাইন ক্যাসিনো, সীমান্তবর্তী অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরেও সেলিম প্রধান স্বর্ণ চোরাচালানের বড় হোতা বলে তারা ধারণা করছেন। আপাতত হরিণ হত্যার ঘটনায় স্বীকারোক্তি দেওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। তবে অন্যান্য মামলায় রিমান্ডে এনে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

সূত্র: সমকাল