মঙ্গলবার, ১৯শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং

গণধর্ষণের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে আদালতে কাঁদলেন সুবর্ণচরের সেই নারী

মুক্তখবর :
অক্টোবর ২১, ২০১৯
news-image

ঢাকা, সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯ (নিজস্ব প্রতিনিধি) : ‘বেঁচে থাকব, আপনাদের সাথে কথা বলবো, স্বামী সন্তানের মুখ দেখব তা কখনো মনে করিনি। আসামিরা আমাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের বাহিরে নিয়ে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। দুইজন আমার দুই হাত ধরে রাখে। আরেকজন পরনের কাপড় ছিঁড়ে মুখ বেঁধে ফেলে। এরপর একের পর এক আসামিরা আমাকে ধর্ষণ করে’- এভাবে সেদিনের ঘটনা আদালতে বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাতের নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গণধর্ষণের শিকার সেই নারী (৪০)।

রোববার (২০ অক্টোবর) নোয়াখালী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক মোহাম্মদ সামসউদদীন খালেদের আদালতে মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত ৫ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ভিকটিমের জবানবন্দি রেকর্ড ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা অনুষ্ঠিত হয়। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আদালতে নির্যাতনের শিকার নারী কান্নায় ভেঙে পড়ার পর বিচারক সাক্ষীকে স্বাভাবিক হয়ে বক্তব্য উপস্থাপনের অনুরোধ করেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় আদালতে সাক্ষী নির্যাতনের শিকার নারী তার নাম-পরিচয় তুলে ধরে বলেন, সেই রাতের (৩০ ডিসেম্বর) খাবার খেয়ে তিনিসহ পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঘরের বাহির থেকে আসামি ছালাউদ্দিনের ডাকে তার ঘুম ভেঙে যায়। তখন তিনি কে জিজ্ঞেস করলে ছালাউদ্দিন বলেন ‘আমি ছালাউদ্দিন’।

আদালতকে নারী বলেন, পরিচয় জানার পর আমি ঘুম থেকে জেগে বাতি জ্বালাই। এরপর আমি ও আমার স্বামী মিলে দরজা খুলে দেই। এ সময় ছালাউদ্দিন, সোহেল, আবু, হেঞ্জু মাঝি, বেচু, স্বপন, চৌধুরী ঘরে ঢুকে। আর রুহুল আমিন মেম্বারসহ (বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা) অন্য আসামিরা বাহিরে ছিল।

নির্যাতনের শিকার নারী নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, আসামিরা ঘরে ঢুকেই প্রথমে আমার মেয়ের কক্ষে গিয়ে তাকে নষ্ট (ধর্ষণ) করার চেষ্টা করে। এ সময় আমরা তাদের হাত-পা ধরলে তাকে ছেড়ে দিয়ে আমার চার সন্তান ও স্বামীকে বেঁধে ফেলে। এরপর আমাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের বাহিরে নিয়ে যায়।

নির্যাতনের বর্ণনায় নারী আরও বলেন, মুখ বাঁধার পর আসামিরা টেনে ঘরের পশ্চিম পাশে পুকুরের পূর্ব পাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে একের পর এক আসামি আমাকে ধর্ষণ করে। এক পর্যায়ে আসামি বেচু বলে জবাই করে পুকুরে ফেলে দে। স্বপন বলে জবাই করিছ না মার। তখন সোহেল, বেচু গাছের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আমার ডান হাত ভেঙে দেন। তখন আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।

নির্যাতিতা নারী আদালতকে বলেন, সকালে তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য একাধিক সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করা হয়। কিন্তু আসামি রুহুল আমিন, বেচু সিএনজি আমাদের বাড়িতে আসতে দেয়নি। পরে মাইজদী থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তাকে জেলা সদরের হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়।

সাক্ষ্য দেওয়ার পর আসামি পক্ষের আইনজীবির জেরার জবাবে নির্যাতনের শিকার নারী বলেন, পরদিন (৩১ ডিসেম্বর) সকালে হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে স্বামী, ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। সেখানে তাঁর ডাক্তারি পরীক্ষা করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ অনেক পুলিশ তার সঙ্গে কথা বলে। আসামিদের সঙ্গে তার পূর্বের কোনো বিরোধ ছিল না।

জেরার এক পর্যায়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী হারুনুর রশীদ হাওলাদার নির্যাতনের শিকার নারীকে ‘দুর বেডি’ বলে বিরক্তি প্রকাশ করেন। এ সময় আদালত আইনজীবীকে ভাষার ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেন। তাৎক্ষণিক আইনজীবী ‘সরি’ বলেন।