মঙ্গলবার,২রা জুন, ২০২০ ইং

মুজিব বর্ষে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রত্যাশা…

মুক্তখবর :
মার্চ ১৭, ২০২০
news-image

——মোমিন মেহেদী——

একদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে শিক্ষককে গুলি করে হত্যা করছে। এমন একটা পরিস্থিাতির মধ্যে আবার আছে দুর্নীতির মহাউৎসব। আর সেই উৎসব সাঙ্গপাঙ্গরা শিক্ষাক্ষেত্রেও চালিয়ে যাচ্ছে। এমন একটা পরিস্থিতির উত্তরণ নতুন প্রজন্মের রাজনীতিক হিসেবে বরাবরই চেয়ে আসছি, সেই অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি, কথা বলে যাচ্ছি। কেননা, তিনি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বায়ান্নতে ভাষার জন্য, একই সময়ে শিক্ষার জন্য নিবেদিত ছিলেন। তিনি শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে বরাবরই চেয়েছিলেন নিশ্চিত করতে। অথচ তাঁর কন্যার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি।
থামাতে হবে এখনই এই দুর্নীতি। পাশাপাশি শিক্ষক হত্যা তো দূরের কথা সকল অন্যায় প্রতিরোধে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে শিক্ষক হত্যার মত জঘণ্য অন্যায় বাড়তেই থাকবে। যেভাবে গণমাধ্যম বলছে- রাজবাড়ীর পাংশায় আসাদুল বারী খান (৪২) নামে এক স্কুলশিক্ষককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। উপজেলার কসবামাজাইল ইউনিয়নের সুবর্ণখোলা গ্রামের গড়াই নদীর পাড় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত আসাদুল বারী খান পাংশা উপজেলার কসবামাজাইল ইউনিয়নের সুবর্ণখোলা গ্রামের মৃত খোরশেদ খানের ছেলে এবং কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার সেনগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে নিজ গ্রামে তার অসুস্থ চাচা মো. খলিলুর রহমান খানকে দেখে বাড়ি ফিরছিলেন আসাদুল। তখন একদল দুর্বৃত্ত তাকে হত্যা করে। তার পায়ে ও বুকে গুলির চিহ্ন রয়েছে। স্থানীয় জজ আলী বিশ্বাসের সঙ্গে তার পূর্বশত্রম্নতা রয়েছে। জজ আলী বিশ্বাসের লোকজনই তাকে হত্যা করেছে বলে পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন। যদিও বলা হচ্ছে যে, আসাদুল বারী খানের হত্যার বিষয়টি জানার পর ঘটনাস্থলে প্রায় দেড়শ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। মামলা হলে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ পর্যন্তই শেষ। কতটা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তা অতিতের রেকর্ড দেখলেই বোঝা যাবে। দুর্নীতির হাত ধরে বাংলাদেশে শিক্ষাকে ধ্বংস করার জন্য দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র যখন চলছে, তখন শিক্ষক হত্যার ঘটনা কেন যেন মনে হচ্ছে প্রাথমিকপর্ব।
দুর্নীতির নীল নকশা সাহজানো হয়েছে এখন নতুন কৌশলে। লোভি আশরা-মন্ত্রী-এমপিরা এখন বেছে নিয়েছে জাতির পিতার জন্ম শত বার্ষিকীকে। কোটি কোটি টাকা বাজেট করে বলছে- একুশ লাখ নিরক্ষর মানুষকে করা হবে সাক্ষর। তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির সব শিক্ষার্থীর বাংলা পঠন দক্ষতা নিশ্চিত করা হবে। সারা দেশের স্কুলে শিক্ষার্থীদের দেয়া হবে দুপুরের খাবার। শুধু এখানেই শেষ! বলা হচ্ছে- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ বা মুজিববর্ষ উপলক্ষে এমন ১৬ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে কর্মসূচির বাস্তবায়ন। ওইদিন শিশুদের পাঠ করানো হবে বাবাকে নিয়ে লেখা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্মৃতিকথা।’ এসব বলে বলে লোপাট করার চেষ্টা চলছে কোটি কোটি টাকা। যেভাবে ডিম, বিস্কিট আর খাবার দাবারের প্রজেক্ট করে শিক্ষা খাতকে ভয়াবহভাবে দুর্নীতির রাজত্ব তৈরি করা হয়েছে। সেভাবে বাঙালি জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে করণীয় নির্ধারণে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করে গত ৯ জানুয়ারি। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম-আল-হোসেন। জাতির পিতার জন্মশতবর্ষকে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার ভিত্তিমূলকে শক্তিশালী করার বছর হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মৌলিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছি। ইতিমধ্যে শতভাগ শিক্ষার্থীর পঠন দক্ষতা কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছানোর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলা কাম্য লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রতিবেদন আমাদের কাছে পাঠাচ্ছে। বাকি কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সময়াবদ্ধ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা আছে বলেই তাকে কখনো বিরিয়ানির প্যাকেটে দেখতে চাই না, জন্মশতবর্ষে ৩য় ও ৫ম শ্রেণির সব শিক্ষার্থীর বাংলা পঠন দক্ষতা শতভাগে উন্নীত করা হবে। এ লক্ষ্যে স্কুলে স্কুলে মেন্টর বা সংস্কারকরা কাজ করছেন। চলমান স্কুল ফিডিং কর্মসূচিকে সারা দেশে চালু করা হবে। শুধু এখানেই শেষ নয়, জাতির পিতার জন্ম শত বর্ষ নিয়ে অনেক বড় বড় বাজেট পাশ হচ্ছে। আর সেই বাজেট-এর অংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত ‘বঙ্গবন্ধু বুক কর্নার’ কার্যকর করা হবে।
বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শের ওপর শিশু-কিশোরদের উপযোগী সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফর্মেশনসহ (সিআরআই) অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত বই ক্রয়, সংরক্ষণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে বলেও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সবকথার মূল কথা হলো- লোপাট-দুর্নীতি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ) প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার স্থাপন করা হবে। সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘স্টুডেন্টস কাউন্সিল’কে সম্পৃক্ত করে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ইত্যাদি আয়োজন করা হবে। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এবং প্রাথমিক শিক্ষায় বিভিন্ন অর্জনের ওপর ডকুমেন্টারি তৈরি করে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেয়া হবে। ব্যাপক আয়োজনের মধ্যে আগামী বছর বই বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। মুজিববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে নেয়া কর্মসূচির মধ্যে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির দুটি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে- প্রাথমিক শিক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে বঙ্গবন্ধুর অবদানবিষয়ক জাতীয় সেমিনার আয়োজন এবং ২১ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদান। প্রাথমিকভাবে আগামী ২৯ আগস্ট বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে জাতীয় সেমিনারটি আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ২১ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা প্রদানের কর্মসূচি নেয়ার কারণে এ বছরের আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের অনুষ্ঠান আড়ম্বরপূর্ণভাবে আয়োজনের চিন্তা আছে। এই চিন্তা নিয়ে একের পর এক কোন না কোন প্রজেক্ট দাঁড় করিয়ে দুর্নীতির রাস্তা তৈরি করছে।
দুর্নীতির হাত ধরে মুজিববর্ষকে সামনে রেখে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সাতক্ষীরার দুটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটায় সীমাহীন দুর্নীতির ঘটনা বেরিয়ে এসেছে। ঠিকাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কলেজের অধ্যক্ষ ও হাসপাতালের পরিচালকের সিন্ডিকেট সরাসরি দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন, লাশ রাখার জন্য মোর্চুয়ারি ফ্রিজসহ ৪১টি আইটেম কেনায় কয়েকগুণ বেশি টাকা দেয়া হয় ঠিকাদারকে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য এসব কেনা হয়। সাতক্ষীরা মেডিকেল অ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) এবং ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) জন্য কেনাকাটায় ৮০ শতাংশই লোপাট হয়েছে। যতদূর জেনেছি- শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে ৪১ ধরনের পণ্য কেনা হয়। পণ্যের তালিকায় আছে মোর্চুয়ারি ফ্রিজ। পচনের হাত থেকে রক্ষার জন্য কয়েকদিন এ ধরনের ফ্রিজে লাশ রাখেন অনেকেই। অন্যান্য আইটেমের সঙ্গে লাশ রাখার এই ফ্রিজ কেনায় ৯১ গুণ বেশি টাকা ঠিকাদারকে দিয়ে পরে তা হাতিয়ে নেন জড়িতরা। ১৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা দামের মোর্চুয়ারি ফ্রিজ ক্রয় করা হয়েছে ১ কোটি ৯৮ লাখ ২০ হাজার টাকা দামে। একটি মোর্চুয়ারি ফ্রিজেই দুর্নীতি হয়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ধরনের কেনাকাটায় হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া একাই হাতিয়ে নেন ৩০ কোটি ২৫ লাখ টাকা। ঢাকার বাইরে দুটি প্রতিষ্ঠানের কেনাকাটায় লুটপাট হয়েছে। ওই দুটি প্রতিষ্ঠানেও কেনাকাটায় ৮০ শতাংশই হরিলুট হয়েছে। ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া মুন্সী ফখরুল হোসেনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা, রবিউল আলমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৬ কোটি ১১ লাখ ৮ হাজার টাকা এবং আফতাব আহমেদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৪ কোটি ১৪ লাখ ৩ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। এই দুর্নীতিতে সহায়তা করেন তিন ঠিকাদার। ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আহমেদ এন্টারপ্রাইজ ২৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা দামের একটি অপারেটিভ হিস্টেরোস্কপি মেশিন ৯৬ লাখ টাকায় সরবরাহ করে। এই একটি মেশিন ক্রয়ে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত দেয়া হয় ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দামের প্রতিটি হাইফ্লো অক্সিজেন থেরাপি মেশিন ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা দরে ৫টির জন্য অতিরিক্ত বিল করা হয় ২৮ লাখ টাকা। ৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা দামের প্রতিটি হাইফ্লো অক্সিজেন মেশিন ৩৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দামে ক্রয় করা হয়। ৬টিতে অতিরিক্ত বিল দেয়া হয়েছে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ৬ লাখ টাকা দামের প্রতিটি ইলেকট্রিক ডেন্টাল ইউনিট মেশিন ৩৩ লাখ টাকা করে ক্রয় করা হয়। ৫টি মেশিন ক্রয়ে অতিরিক্ত বিল দেয়া হয়েছে ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ২৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দামের প্রতিটি ওটি লাইট কেনা হয়েছে ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা করে। এতে তিনটি ওটি লাইটে অতিরিক্ত বিল দেয়া হয় ১ কোটি ৬৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এভাবে ৫টি আইটেমে একত্রে অতিরিক্ত বিল তুলে দেয়া হয়েছে ৫ কোটি ৯৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
এমন অসংখ্য দুর্নীতিগ্রস্থ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বসে আছে অন্যায়ের রাজারা। এই রাজারা রাজনীতিকে পূঁজি করে, প্রশাসনকে পূঁজি করে একের পর এক খাত তৈরি করছে, প্রজেক্ট তৈরি করছে। আর রাস্তাটা ধরে এগিয়ে যাওয়া এখনই বন্ধ না করলে আরো দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশকে ধ্বংশ করতে তারা মাঠে নামবে। বাংলাদেশের সাধারণ রিক্সাওয়ালা-খেটে খাওয়া মুজুর ব্যক্তিটিও চাইবেন না যে দেশটা ধ্বংশ হয়ে যাক। তাই চাই তথাকথিত এই সব প্রজেক্ট বাদ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বাড়িয়ে জাতির পিতার মান অলক্ষুন্ন রাখা হোক, চাই সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোর দীক্ষা চলুক। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে সকল বিদ্যালয়ে প্রকৃত মানুষ গড়ার পাঠ চলুক। বন্ধ হোক সকল অন্যায়-অপরাধ-দুর্নীতি অন্তত শিক্ষা নিয়ে…।