শনিবার,১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ক্যাম্প থেকে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা, ঠেকাতে ১০ প্রস্তাব প্রশাসনের

মুক্তখবর :
মে ১৮, ২০১৯
news-image

ঢাকা, শনিবার, ১৮ মে ২০১৯ (নিজস্ব প্রতিনিধি) : কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা পালাচ্ছে। অনেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে ক্যাম্পে। অনেকে আবার পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নিয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর সাধারণত বর্ষা মৌসুমের আগে অর্থাৎ, শুকনো মৌসুমে রোহিঙ্গাদের অনেকেই বিদেশে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কারণ বর্ষায় সাগর উত্তাল থাকে। তাই শুকনো মৌসুমে দালালদের হাত ধরে সাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ আশপাশের দেশগুলোতে আশ্রয়ের পথ খোঁজে তারা। তবে এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় রোহিঙ্গা অধিক মাত্রায় ক্যাম্প ছাড়ছে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেকে এইচআইভি আক্রান্ত। তারা ক্যাম্প থেকে বাইরে এসে অন্যদের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় এক প্রকার স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি কক্সবাজারসহ সারাদেশে এইচআইভি সংক্রমণের আশঙ্কাও বাড়ছে। সূত্র বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইতিমধ্যেই তারা ৬০০ জনকে এইডস আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করেছেন। এমন বাস্তবতায় ক্যাম্প থেকে পালানো ঠেকাতে ১০ প্রস্তাব দিয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। শিগগিরই এসব করণীয় সম্পন্ন না হলে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়া ঠেকানো কষ্টসাধ্য হবে বলে মনে করা হচ্ছে, যা দেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. এমএ মতিন সমকালকে বলেন, ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গা অন্যত্র ছড়িয়ে পড়লে অবশ্যই এইচআইভি সংক্রমের ঝুঁকি রয়েছে। কক্সবাজার ছাড়াও অন্য জেলাও এই ঝুঁকির বাইরে নয়। এটা এড়াতে হলে ক্যাম্পের বাইরে কোনোভাবে রোহিঙ্গাদের বের হতে দেওয়া যাবে না।

এ ব্যাপারে শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ আবুল কালাম সমকালকে বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রলোভন দিয়ে দেশের বাইরে পাঠাতে তৎপরতা চালাচ্ছে কিছু দালাল। প্রশাসন তাদের শনাক্ত করেছে। কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োগ করলে এই প্রবণতা ঠেকানো যাবে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এইচআইভি ভাইরাসবাহী ৬০০ রোহিঙ্গাকে শনাক্ত করা হয়েছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ২০১৭ সালের পর থেকে ক্যাম্পের বাইরে চলে গেছে এমন ৬৭ হাজার রোহিঙ্গাকে ফের ক্যাম্পে ফেরত আনা হয়েছে। বর্ষার আগে তাদের মধ্যে ক্যাম্প ছাড়ার প্রবণতা থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এমন ঘটনায় নির্দিষ্ট একটি জায়গায় কাঁটাতারের মধ্যে তাদের আটকে রাখা হয়। ক্যাম্পের মধ্যে তাদের রাখতে হলে বেশকিছু ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পুলিশের পক্ষ থেকে একটি প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের মধ্যে রাখার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে তা হলো; ক্যাম্পের নির্দিষ্ট এলাকায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো। ক্যাম্পের ভেতরে লাইটের ব্যবস্থা রাখা। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে নির্দিষ্ট এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করা। ক্যাম্পের ভেতরে যাতে গাড়ি নিয়ে টহল দেওয়া যায় সেই ধরনের অবকাঠামো তৈরি করা। ক্যাম্পে থাকা যেসব রোহিঙ্গা নিয়মিত রেশন পাচ্ছেন, তাদের তালিকা হালনাগাদ করা। যেসব রোহিঙ্গা অপরাধে জড়িয়ে পালিয়ে আছে তাদের রেশন বন্ধ করার ব্যবস্থা করা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, এক সপ্তাহে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া ও মহেশখালী উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে দেড় শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। এ ছাড়া ১০ মে রাজধানীর একটি বাসা থেকে ২৪ রোহিঙ্গা নারীকে উদ্ধার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কেউ চাকরি, কেউ উন্নত জীবনের আশা আবার কেউ কেউ বিয়ের প্রলোভনে পড়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্ঠুর সামরিক অভিযান শুরু করলে প্রাণভয়ে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে চার লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রিত ছিল। সব মিলিয়ে ১১ লাখের মতো রোহিঙ্গা কক্সবাজার জেলায় ৩৪ শিবিরে রয়েছে। তারা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে।

কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, কক্সবাজারের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাত্রাকালে দেড় শতাধিকের মতো রোহিঙ্গাকে আটক করেছে পুলিশ। হঠাৎ করে রোহিঙ্গা পাচার বেড়ে যাওয়ায় আমরাও চিন্তিত।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, চলতি বছরে গত চার মাসে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাত্রাকালে প্রায় সাড়ে ৪০০ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে, যাদের বেশিভাগই নারী ও শিশু। এর মধ্যে পুলিশ প্রায় ৪০০ এবং বিজিবি ৪০ জনকে আটক করে। তারা সবাই উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা। সর্বশেষ গত ১৪ মে রাতে টেকনাফের নোয়াখালীপাড়া এলাকা থেকে ৩১ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। এর মধ্যে চার শিশু, ২০ নারী ও ৭ জন পুরুষ। একই দিন রাতে কক্সবাজারের কলাতলীর শুকনাছড়ি ও দরিয়ানগর সমুদ্রঘাটে জড়ো হয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়ার সময় ২৮ রোহিঙ্গাকে আটক করে। এদের মধ্যে ১৩ নারী, ৬ শিশু ও ৯ জন পুরুষ। এ সময় পাচারকাজে জড়িত একটি নৌকাও জব্দ করা হয়।

টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা মোহাম্মদ আবুল কালামের মতে, মালয়েশিয়ায় আত্মীয়-স্বজন রয়েছে এমন রোহিঙ্গারা উন্নত জীবনের আশায় শিবির থেকে বের হয়ে সমুদ্রপথে দেশটিতে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে। এই প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা দালালের পাশাপাশি স্থানীয় কিছু দালালও টাকার বিনিময়ে যুক্ত হচ্ছে।

উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, এই বিশাল রোহিঙ্গা শিবিরের আশ্রিত কর্মহীন রোহিঙ্গাদের বেশি আয়ের লোভ দেখিয়ে মানব পাচারকারীরা সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যেতে উৎসাহিত করছে। এ ছাড়া তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন ও ভাসানচরে নিয়ে যাওয়া হবে এমন ভয়ও দেখানো হয়। ফলে রোহিঙ্গারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাচ্ছে।

উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামীদের বরাত দিয়ে টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন জানান, রোহিঙ্গা নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া পাচার করা হচ্ছিল। একদিন আগে ৫ হাজার টাকা করে নিয়ে তাদের একত্রিত করে দালালরা। সোমবার রাতে সমুদ্রে একটি ট্রলারে ওই রোহিঙ্গাদের তুলে দেওয়ার কথা ছিল। মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পর মাথাপিছু দেড় থেকে দুই লাখ টাকা করে দেওয়ার চুক্তি ছিল।
সূত্র : সমকাল