মঙ্গলবার,২০শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

জোরালো অনুসন্ধানের অভাব দীর্ঘদিনেও দেশে আবিষ্কৃত হয়নি বড় গ্যাসের মজুদ

মুক্তখবর :
ডিসেম্বর ৩০, ২০১৯
news-image

ঢাকা, সোমবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৯ (স্টাফ রিপোর্টার) : দীর্ঘ এক দশকেও দেশের কোথাও বড় কোনো গ্যাসের মজুদ আবিষ্কৃত হয়নি। এসময়ে ছোট ছোট যেসব গ্যাসের মুজদ আবিষ্কার হয়েছে তা ক্ষণস্থায়ী। কেবলমাত্র ভোলার যে ক্ষেত্রটি থেকে গ্যাস তোলা হচ্ছে তা নিয়ে পেট্রোবাংলা কিছুটা আশাবাদী। কিন্তু দেশের বিশাল সমুদ্র এলাকায় গ্যাস সন্ধানের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এমনকি পেট্রোবাংলা কাউকে সে ব্যাপারে আগ্রহীও করে তুলছে পারছে না। ফলে বিস্তৃত সমুদ্র এলাকা অনুসন্ধানের বাইরে থেকে যাচ্ছে। মূলত নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারে ব্যর্থতা আর সাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে না পারায় যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ক্রমান্বয়ে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে আসছে। পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত চার বছরের মধ্যে গ্যাসের উৎপাদন চলতি বছর সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়েছে। আর গত জুন পর্যন্ত এক বছরের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায় দেশী গ্যাসের উৎপাদন দৈনিক ৩৫০ মিলিয়ন ঘনমিটারের (এমএসসিএম) ওপরে কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান না করে বিদ্যমান ক্ষেত্রের গ্যাস তুললে ক্রমান্বয়ে উৎপাদন কমে আসাই স্বাভাবিক। এক সময় ওই গ্যাস শেষ হয়ে যাবে। সঙ্গতকারণে স্থল এবং জলভাগে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। গ্যাসের উৎপাদন কমে গেলে প্রয়োজন মেটাতে বিদেশ থেকে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করতে হবে। তাতে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। সূত্র জানায়, বিগত ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। ওই সময় একটি আইওসি গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি করাতে গ্যাসের উৎপাদন একবারে অনেকটাই বেড়ে যায়। পেট্রোবাংলার হিসাবে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট গ্যাস উত্তোলন হয়েছে ২৭ হাজার ৫৫৯ দশমিক ২৫৫ এমএসসিএম, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে গ্যাসের উৎপাদন ছিল ২৭ হাজার ৪৪৫ দশমিক ৩৬৪ এমএসসিএম, ২০১৭-১৮ তে যা ছিল ২৭ হাজার ৪২৯ দশমিক ৯৮৩ এমএসসিএম আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ২৩২ দশমিক ৫৯৭ এমএসসিএম। ওই হিসাব বলছে, ২০১৮-১৯ সালে এসে দেশীয় গ্যাসের মোট উৎপাদন কমেছে। আবার ২০১৮-এর আগস্ট থেকে ২০১৯-এর জুন পর্যন্ত হিসাব বলছে দেশীয় কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক তেল গ্যাস কোম্পানি (আইওসি) উভয় ধরনের গ্যাসেরই উৎপাদন কমেছে। বিগত ২০১৮-এর জুলাই মাসে গ্যাসের উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৩৯১ দশমিক ৭৭৮ এমএসসিএম আর ২০১৯-এর জুনে এসে ২ হাজার ২৪ দশমিক ৯৯৮ এমএসসিএম। গত ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করে। সূত্র আরো জানায়, দেশীয় গ্যাস কোম্পানির মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড, সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি এবং বাপেক্স গ্যাস তুলছে। জুলাই ২০১৮ থেকে জুন ২০১৯ পর্যন্ত হিসাব মতে সব কোম্পানির উৎপাদন কমছে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি জুলাই-২০১৮তে ৭১৫ দশমিক ২৬৩ এমএসসিএম গ্যাস তুলেছে। আর গত জুনে তা কমে হয়েছে ৬০৩ দশমিক ৮৭১ এমএসসিএম। গত নভেম্বর থেকে গ্যাসের উৎপাদন কমতে শুরু করে। আর চলতি বছর মার্চ এপ্রিল থেকে উৎপাদন অনেকটাই কমে যায়। একইভাবে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের উৎপাদন ২০১৮-এর জুলাইতে ছিল ১১১ দশমিক ৮০১ এমএসসিএম আর গত জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ১০০ দশমিক ২২২ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বাপেক্সের উৎপাদন ২০১৮-এর জুলাই সালে ছিল ৯৯ দশমিক ৯৭৪ মিলিয়ন ঘনফুট আর গত জুনে যা ছিল ১০০ দশমিক ২২২ এমএসসিএম। অবশ্য বছরের মাঝের কয়েক মাসে বাপেক্সের উৎপাদন কিছুটা কম ছিল। তবে মোট দেশীয় কোম্পানির গ্যাসের উৎপাদন ৯২৭ দশমিক ৩৮ এমএসসিএম থেকে গত জুনে কমে দাঁড়িয়েছে ৮০৬ দশমিক ২৬৪ এমএসসিএম। আর আইওসির মধ্যে শেভরন বাংলাদেশ জালালাবাদ, মৌলভীবাজার এবং বিবিয়ানাতে ২০১৮-এর জুলাই মাসে গ্যাস তুলেছে এক হাজার ৩৯১ দশমিক ৯২০ এমএসসিএম। আর গত জুনে তারা তুলেছে এক হাজার ১৪২ দশমিক ৪৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে বাঙ্গুরাতে তাল্লোর উৎপাদন ৭২ থেকে ৭৬ এমএসসিএম’র মধ্যেই ছিল। এদিকে দশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে গেলে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করে চাহিদা পূরণ করতে হবে। তাতে প্রতি ইউনিটে সরকারকে ১০ ডলারের বেশি অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে। এলএনজি আমদানির অর্থ আবার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তুলে নিচ্ছে সরকার। তাতে গ্যাসের দামও বেড়ে যাচ্ছে। এখন প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো এলএনজি আসছে। তবে দেশের উৎপাদন যতো কমবে, এলএনজির সরবরাহ ততো বৃদ্ধি করতে হবে। এলএনজি আমদানির কারণে চলতি বছর বিইআরসি ৩২ ভাগ গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানি বাড়লেই গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, দেশীয় কোম্পানির তহবিলে অলস টাকার পাহাড় জমেছে। ওই অর্থ বিনিয়োগের বদলে কোম্পানিগুলো এফডিআর করে রাখছে। আবার গ্রাহকের অর্থে একটি তহবিলও রয়েছে। দেশীয় গ্যাস কোম্পানিগুলো গ্যাস উন্নয়ন তহবিলেও জমা টাকা খরচ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে বাপেক্স এবং পেট্রোবাংলাকে কাজ না করার অভিযোগ করা হয়। সম্প্রতি বাপেক্স ভবনে এক সেমিনারে বিদ্যুৎ জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বাপেক্স এবং পেট্রোবাংলার ব্যর্থতার দায় সরকার নেবে না। তাদের কাজের মূল্যায়ন করা হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য ড. সেলিম মাহমুদ জানান, দেশের স্থলভাগে গ্যাসন অনুসন্ধানে জোর দেয়া প্রয়োজন। ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে এদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিরসন হয়েছে। দেশ দুটি আমাদের সীমানার পাশেই অনুসন্ধান করছে। আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে যৌথ সমীক্ষা করা। তাতে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন হবে। আর তা না করলে এক তরফাভাবে তারা গ্যাস তুলে নিয়ে যাবে। আমরা ফাঁকিতে পড়ব।