শুক্রবার,৫ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মেয়েটিকে হত্যার চেষ্টাও হয়েছিল

মুক্তখবর :
জানুয়ারি ৭, ২০২০
news-image

ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৭ জানুয়ারি ২০১৯ (ঢাবি প্রতিনিধি) : ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রীর ধর্ষককে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট। ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশের পাশাপাশি ঘটনার ছায়া তদন্তে নেমেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), র‌্যাব। এ ছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও ঘটনার রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের কিছু সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। ফুটেজগুলো তারা বিশ্লেষণ করে দেখছেন। গতকাল পুলিশ মেয়েটির জবানবন্দি নিয়েছে। জবানবন্দিতে মেয়েটি ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ। গতকাল বেলা সোয়া ৩টার দিকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ফরেনসিক পরীক্ষায় ওই ছাত্রীর ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তার গলায় আঙুলের দাগ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তার গলা টিপে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। হাতে পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সারা পায়ে খোঁচা লাগার দাগ রয়েছে। ঝোপের মধ্যে ধর্ষণের কারণে এ দাগ হতে পারে। হাতে আঘাতের চিহ্ন পেয়েছি। যেটা কোনো কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। অথবা লাথি মারা হয়েছে।
মাথায় কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। দুই একদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, ধর্ষক
একাধিক কি না তার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ডিএনএ এনালাইসিসে পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট এলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এর আগে সকালে ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর চিকিৎসায় গাইনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সালমা রউফকে প্রধান করে ৭ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই এখন থেকে মেয়েটির চিকিৎসা চলবে।
বিমানবন্দর সড়কে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে গলফ ক্লাব সীমানার শেষ প্রান্তে ঝোপের মধ্যে মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের স্থান থেকে মেয়েটির ব্যবহৃত ইনহেলার, ক্লাসের নোটবুক, প্রসপেক্টাস লেকচার শিট, ঘড়ি, চাবির রিং মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করেছে পুলিশ। এ ছাড়া সেখান থেকে জুতা ও কালো রঙের একটি জিনস প্যান্ট পাওয়া গেছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেতে বাঁ পাশে কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ড থেকে ৪০০ গজ সামনে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। জায়গাটি গলফ ক্লাবের সীমানার শেষ প্রান্তে যাত্রীছাউনি ছাড়িয়ে। ঘটনাস্থল থেকে ১০ হাত দূরে একটি বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড রয়েছে। যে জায়গায় ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে, সেখানে ফুটপাত আছে। অনেক ল্যাম্পপোস্ট আছে। লোকজনের চলাচলও থাকে, তবে সন্ধ্যার পর তুলনামূলক অনেক কম। ওই জায়গায় কয়েকটি মেহগনিগাছ আছে। ছোট-ছোট বরইগাছ আছে অনেক। ঝোপঝাড় ও লতাগুল্ম আছে। সেখানেরই একটি ঝোপে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।
গতকাল ঢামেক হাসপাতালের ওসিসিতে চিকিৎসাধীন ধর্ষণের শিকার মেয়েটির জবানবন্দি নেন ক্যান্টনমেন্ট থানা পুলিশ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন মেয়েটি। ধর্ষক একাই ছিল। মেয়েটির শারীরিক গড়ন হালকা-পাতলা এবং ধর্ষক অনেক শক্তিশালী শারীরিক গঠনের ছিল। অচেতন না করে বল প্রয়োগ করেই মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে জবানবন্দির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেনি পুলিশ।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি সুদীপ চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, ভিকটিমের সঙ্গে রবিবার থেকে একাধিকবার ওসি, এসি কথা বলেছেন। ভিকটিমের কথা অনুযায়ী অভিযুক্ত একজন। ভিকটিমের বাবা ইতোমধ্যে একজনের কথা উল্লেখ করেই মামলা করেছেন এবং অপরাধীকে খুঁজে বের করতে পুলিশ সর্বাত্মক চেষ্টা করছে।
ধর্ষণের আলামত তেমনভাবে পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই এলাকায় তেমন জনসমাগম দেখা যায় না। ব্যস্ততম সড়ক, সবাই যাওয়া-আসার মধ্যে থাকে, কেউ থামে না। এটা ক্রাইম হওয়ার মতো জায়গা ছিল না। কিছু হয়তো ঘাস ও গাছ ছিল, ধর্ষক সেই সুবিধা নিয়েছে। তিনি বলেন, এখানে ঝোপঝাড় রয়েছে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য। কিছু গাছ আছে বড়, নিয়মিত ডাল ছাঁটাই করে দেওয়া হয়। এ এলাকায় সার্বক্ষণিক পুলিশ প্যাট্রোল থাকে। পাশে গলফ গার্ডেন, এয়ারপোর্ট কাছেই, ফলে নিরাপত্তা বিষয়টি দেখা হয়। তিনি আরও বলেন, আমরা তদন্ত করে দেখছি। সিআইডি থেকে যে ক্রাইম সিন এসেছে তারা এখনও আমাদের জানায়নি। পাশাপাশি প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছি, ম্যানুয়ালি চেষ্টা করছি। এখানে বেশকিছু সিসি ক্যামেরা আছে, সেগুলোসহ নিরাপত্তার জন্য আরও কী-কী করা যায় দেখা হবে।
ধর্ষণের শিকার ছাত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছে বিএনপিসমর্থিত নারী ও শিশু অধিকার ফোরাম। গতকাল ফোরামের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নিপুণ রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢামেক হাসপাতালে যায়। অনুমতি নিয়ে ধর্ষণের শিকার শিক্ষার্থীকে দেখে এসে সাংবাদিকদের বলেন, ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়নি। তার শরীরের ক্ষত এতটাই ভয়াবহ চোখে না দেখলে বোঝানো যাবে না। ওই শিক্ষার্থী মানসিকভাবেও ভালো নেই। তার মা একজন শিক্ষিকা। তিনিও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।
আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রতিবাদ ও দোষীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে দেশবাসীকে বলতে চাই, আপনারা জেগে উঠুন, যাতে সরকার দোষীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দিতে না পারে। প্রতিনিয়ত সারাদেশে গুম খুন ধর্ষণ হচ্ছে তার কোনো সঠিক বিচার হয় না। প্রতিবাদে সারাদেশের মানুষ রাজপথে না নামার কারণেই একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে।
নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট নিপুণ রায়চৌধুরী, ফোরামের সদস্য সরাফত আলী সপু, ফুটবলার আমিনুল ইসলাম, ডা. রফিকুল ইসলাম, ফরিদা ইয়াসমিন ঢামেকে যান।
ধর্ষণের ঘটনায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা হয়েছে। গতকাল দুপুরে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তিকে আসামি করে ওই ছাত্রীর বাবা মামলা দায়ের করেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের ক্যান্টনমেন্ট জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার জাকিয়া নুসরাত আমাদের সময়কে বলেন, আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
গত রবিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার সময় ধর্ষণের শিকার হন ওই ছাত্রী। বান্ধবীর বাসা শেওড়া হলেও ভুল করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বাস থেকে নেমে যান। এরপরই অজ্ঞাত পরিচয়ের ওই ধর্ষক তাকে পাশের একটি ঝোপে নিয়ে ধর্ষণ করে।