শুক্রবার,২৩শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগের নীতি বনাম ব্যয় বহনের সামর্থ্য

মুক্তখবর :
ফেব্রুয়ারি ৮, ২০২০
news-image

———-রেজা সেলিম———-

আমার ক্যানসার প্রকল্পের গুরু প্রফেসর রিচার্ড লাভ, যিনি দুনিয়ার অন্যতম খ্যাতিমান ক্যানসার চিকিৎসক, বাংলাদেশে আমার সঙ্গে তার কাজের রেশ টেনে ধরে প্রায়ই বলেন, এই দেশে ক্যানসার রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অন্যতম বাধা হলো ‘চিকিৎসার সুযোগ, ব্যয় বহনের সামর্থ্য ও মানের ঘাটতি’। ২০০৭ সালে আমি যখন তার সঙ্গে ক্যানসার নিয়ে কাজ শুরু করি তখন মানুষের জন্যে ‘চিকিৎসার সুযোগ’ সৃষ্টিকেই আমরা গুরুত্ব দেই। ফলে গ্রামে কেমন করে সেই সুযোগ তৈরি করা সম্ভব সে রকম চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়ে আমাদের দুজনের পথচলা। রিচার্ড লাভ তখন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। চিকিৎসা বৈষম্যের বিরুদ্ধে নামকরা এক প্রতিবাদী গবেষক,আর আমি মাইক্রোসফটের সহায়তায় বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে তরুণদের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা সম্প্রসারণ নিয়ে কাজ করি। আমার উদ্দেশ্যও একই, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য কেমন করে তথ্য-প্রযুক্তির সেবা-সুযোগ তৈরি করা যায়।
রিচার্ড লাভ আমাকে বললেন ওই মানুষগুলোর জন্যে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করতে, যা তখন নেই বললেই চলে, যদি কাজ করো তাহলে তোমার ‘মিশন কমপ্লিট’ হবে। আমরা তথ্য-প্রযুক্তির সঙ্গে মিলিয়ে ক্যানসার নির্ণয় ও সুলভে মানসম্পন্ন চিকিৎসার একটি ব্রত নিয়ে বাগেরহাটের রামপালে কাজ শুরু করলাম। ২০০৭ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এই দশ বছরে প্রফেসর রিচার্ড লাভ অন্তত অর্ধেক সময় বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেছেন। এ কাজে বাংলাদেশের এমন কোনও পর্যায় নেই যেখানে গিয়ে তিনি এখানকার ক্যানসার চিকিৎসার মান বাড়াতে তদবির করেননি। গবেষণা, প্রশিক্ষণ আর চিকিৎসা সেবা সহায়্তায় বাংলাদেশের অসংখ্য ডাক্তারকে পরামর্শ দিয়েছেন ও তার বন্ধুদের এ দেশে ডেকে এনে হাতে কলমে কাজ শিখিয়েছেন তিনি। আমার ধারণা, বাংলাদেশের ক্যানসার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত প্রায় সবাই প্রফেসর রিচার্ড লাভের নাম জানেন ও সাক্ষাৎ পেয়েছেন। এমনকি আমার মতো ‘অ’-চিকিৎসক মানবিকের ছাত্রকেও তিনি অবিরাম প্রশিক্ষণ দিয়ে ও কাজ করিয়ে ক্যানসার গবেষক বানিয়ে ছেড়েছেন! পৃথিবীর নামকরা বেশ কিছু জার্নালে আমার ১৮টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে তার অনুপ্রেরণা থেকেই। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আগ্রহে ও অনুপ্রেরণায় আমার কর্মস্থল রামপালে একটি ক্যানসার চিকিৎসা ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের কাজে হাত দেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে স্থানীয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পর্যন্ত এমন কোনও মানুষ নেই, যারা আমাদের এই কাজে সহযোগিতা করেননি। তাতেই আমাদের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে লেগেছে ছয় বছর! এই ২০২০ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হবে। শুধু কাজের কাজ যা হয়েছে, রিচার্ড লাভ অভিমান করে এখন আর এই দেশে আসতে চাইছেন না। কারণ, এই দীর্ঘসূত্রতার জন্যে কে দায়ী সেটা তিনি আমাকে নির্ধারণ করে জানাতে বলেছেন,আমি তা খুঁজে পাচ্ছি না। পেলেই তিনি আসতে শুরু করবেন, এ কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গের অবতারণা এই কারণেই যে, আমাদের স্বাস্থ্য পরিষেবার অন্তর্গত সমস্যা ভালো করে বোঝা দরকার।
গত একযুগ ধরে গ্রামাঞ্চলে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ তৈরি ও মানসম্পন্ন সেবা দিয়েছি আমরা প্রায় কুড়ি হাজার মানুষকে। আমাদের গ্রাম প্রকল্পের কর্মীদের কাছে সেবা নিতে আসা প্রতিটি মানুষের সব ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত (নাম ঠিকানা থেকে শুরু করে সমস্যা, নিরীক্ষার বিবরণ, ধাপ অনুযায়ী চিকিৎসা সেবার সব তথ্য) তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে সংরক্ষণ করা আছে। আর সেসব তথ্য কোনও কম্পিউটারে নয়, ক্লাউড সার্ভারে, যাতে সহজে মুছে না যায়। আমাদের কর্মীদের কাছে আছে ইন্টারনেট সমেত মোবাইল ফোন, যার মাধ্যমে নির্ধারিত অ্যাপের মাধ্যমে সে প্রতিদিন গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যতথ্য সংগ্রহপূর্বক হালনাগাদ করে, যার মধ্যে আছে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিরীক্ষা এবং সেসবের তথ্য। আর এসব তথ্য দেশ বিদেশের যেকোনও চিকিৎসক যেকোনও সময় পর্যবেক্ষণ করে ‘চিকিৎসা গাইডলাইন’ অনুসারে মানসম্পন্ন চিকিৎসা সেবা পরামর্শ অনলাইনেই দিতে পারেন। এই দেশে তথ্য-প্রযুক্তিকে উপযুক্ত নিয়মে ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে দুর্বিনীত রোগ প্রতিরোধে, যেমন- ক্যানসার, কিডনি জটিলতা, মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রের অসুখ বা যেকোনও অসংক্রামক রোগের বিষয়ে আমরা কোনও মনোযোগই দেইনি। আজ বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে আছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি)-এর অনুমিত হিসাবসূত্রে প্রতি বছর বাংলাদেশে নতুন করে এক লাখ ৫০ হাজার মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন। আর মারা যান এক লাখ আট হাজার মানুষ। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই হিসাবটা আমাদের নিজেদের কাছে নেই! আমরা যদি আমাদের সবক’টি চিকিৎসাকেন্দ্রে তথ্য-প্রযুক্তির ঠিকমতো ব্যবহার করতাম তাহলে সব রোগের তথ্যই আমাদের কাছে থাকতো। যে কারণে কোনও পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে গেলে একটা দীর্ঘসূত্রতার বাধা এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়। কারণ, বিষয়টা বুঝতে হলে যেসব তথ্য আমাদের নীতিমহলে থাকা দরকার ছিল তার বিন্দুমাত্র তাদের কাছে নেই। যদি ডা. লাভের উদ্বেগ অনুযায়ী মানসম্পন্ন চিকিৎসার কথাও যদি বলি তাহলেও এসে যাবে খরচের হিসাব। অকারণে পরীক্ষা ক্যানসার নির্ণয়ের প্রধান বাধা।
কারণ, এত খরচ আমাদের দেশের মানুষের সাধ্যের মধ্যে নেই। কিন্তু আমাদের জ্ঞানেও নেই এত বাহুল্য পরীক্ষা কেমন করে আমরা বাদ দেবো, এর জন্যে দরকার গবেষণা ও পড়াশোনা, যা আমাদের চিকিৎসক সমাজের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমরা দেখেছি অভিযোগের একটি নির্ধারিত সূত্র ধরে এগুলে ঠিক ঠিক রোগটি ধরে ফেলা যায়, যা সামান্য ইমেজ পরীক্ষা বা টিস্যু পরীক্ষার মাধ্যমেও সম্ভব। সন্দেহজনক না হলে কেন আমরা একটি মানুষের শরীর, মন আর আর্থিক সামর্থ্য নিয়ে এমন খেলায় নামি, যার কোনও কারণ আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। এখানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ত্রুটিকে যারা গালমন্দ করেন, তাদেরও ভুল আছে। ত্রুটি, আমাদের সামগ্রিক সচেতনতার অভাব। আমাদের অজ্ঞতাকে যারা পুঁজি করে রোজগার করেন তাদের বিরুদ্ধে নীতিতে ব্যবস্থা নেই, আর নেই জনগণের মধ্যে প্রতিরোধের সাহস। এটা সম্ভব হতো যদি সরকার সামান্য সময় বিবেচনা করে জনগণের পাশে থাকতো। আজ ৪ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক ক্যানসার দিবস’-এ করজোড়ে জানাচ্ছি, ক্যানসার মোটেই ভয়ের কোনও অসুখ নয়। এটা সঠিকভাবে নির্ণয় হলে আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিত। এটা আর যাই-ই হোক, হৃদরোগ আর মস্তিষ্কের স্ট্রোকের চেয়ে তো ভালো। যারা আমাকে-আপনাকে ক্যানসার নিয়ে ভয় দেখান, তাদের অকারণ পরীক্ষার চেষ্টা থেকে বিরত থাকতে সরকার যেন একটা নির্দেশনা দেয়। আর এর জন্যে সবাই মিলে কথা বলুন। এবারের ক্যানসার দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘আমি আছি, আমি থাকবো, ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’। কীভাবে থাকবো সবাই মিলে সেটা ঠিক করে নিতে হবে।

লেখক: পরিচালক, আমাদের গ্রাম প্রকল্প