বুধবার,২৮শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

কোভিড-১৯ এ আমাদের অবস্থান ও করণীয়…

মুক্তখবর :
মার্চ ৩১, ২০২০
news-image

করোনা ভাইরাস সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের শিরোনামে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এশিয়ার বিভিন্ন অংশ এবং এর বাইরেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস। কোভিড–১৯ বা করোনা সাধারণ ফ্লু ধরনের ভাইরাস। তবে আগে কোনো দিন মানুষের শরীরে এর উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়নি। শরীরের প্রতিরোধ সিস্টেম অতিরিক্ত শক্তি নিয়ে এটাকে আক্রমণ করতে গিয়ে ফুসফুসের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করতে পারে।
সাধারনত মানুষ এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে কোভিড–১৯ রোগে আক্রান্ত হয়। তবে আক্রান্ত হলে এবং ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে কিছুদিনের মধ্যে সামান্য শরীরের অস্বস্তিকর অনুভূতি, কিছু হালকা মাথাব্যথা ও কাশি থাকতে পারে। তারপরে এমনিতে ভালো হয়ে যায়। সম্পূর্ণ ভালো হতে ৫, ৭ অথবা ১৫ দিন লাগতে পারে। যাঁরা ভালো হন না, তাঁদের শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং তাঁদের অনেকে বাসায় থাকলেও শ্বাসকষ্ট কমে যায়। না কমলে তাঁদের হাসপাতালে যেতে হয় অক্সিজেন নেওয়ার জন্য এবং তাঁদের যদি আরও খারাপ অবস্থা হয়, তখন ভেন্টিলেটরের সাহায্য লাগে। তবে ১০ থেকে ১২ দিনে অনেকেই ভেন্টিলেটর থেকে ভালো হয়ে যাবেন আর ১ থেকে ২ শতাংশ মারা যাবেন। কিছু মানুষের জন্য এই ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে খুব কম ক্ষেত্রেই এই রোগ মারাত্মক হয়। এই ভাইরাস সংক্রমণের ফলে বয়স্ক ও আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের মারাত্মকভাবে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি। শিশুদের উপর এই ভাইরাসের প্রভাব বা এতে কতজন আক্রান্ত হতে পারে- সে সম্পর্কে আমরা এখনও বেশি কিছু জানি না। কিন্তু নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরোধ এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। সময় আমাদের সাথে নেই।
সারা বিশ্বে করোনার তাণ্ডব দিন দিন আরো ভয়াবহ হচ্ছে। সোমবার রাত পর্যন্ত এ ভাইরাসে মারা গেছেন ৩৫ হাজার ৩৪৯ জন। আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯ জন। শুধুমাত্র ইতালিতেই মারা গেছেন ১০ হাজার ৭৭৯ জন। এছাড়া স্পেনে মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ৩৪০ জনের। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৮৯ জন। দেশটিতে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২ হাজার ৬০৬ জন।
বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়ঙ্কর শব্দটি হলো- নভেল করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাসের সঙ্গে পূর্বপরিচিত হলেও করোনা ভাইরাসের নতুন এই স্ট্রেইনটি অর্থাৎ কোভিড-১৯ সম্পর্কে কিছুদিন আগেও বিশ্ববাসীর কোনো ধারণা ছিল না। ২০১৯ সালের শেষ দিকে চীনের উবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম এ ভাইরাসটি মানবদেহে শনাক্ত হওয়ার পর চমকে যায় বিশ্ব। নভেল করোনা ভাইরাস বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের মানুষকে আক্রান্ত করেছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ রোগটিকে বৈশ্বয়িক মহামারী বলে ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে দ্রুত সময়ে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে ৩৮ হাজারেরও বেশি লোক মৃত্যুবরণ করেছে। এছাড়া আরো লক্ষাধিক লোক চিকিৎসাধীন। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসে ভারি হচ্ছে লাশের সারি। করোনার ছোবল ধ্বংস করেছে অর্থনীতি। আর এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভুগছে সারা বিশ্ব। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকতে পারেনি। বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৪৯ জন। মারা গেছেন পাঁচ জন। আর সুস্থ হয়েছেন ১৯ জন।
করোনাভাইরাসটি ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস যেন ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে না পড়ে সেব্যাপারে সতর্কতা জারি করেছে বাংলাদেশ সরকার। বিমানবন্দর, নৌবন্দরে বিশেষ নজরদারী বাড়ানো হয়েছে। এর সঙ্গে দেশি প্রকল্পে নিয়োজিত বিদেশি নাগরিকদের ওপরও নজর রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশে এসেছেন, এমন নাগরিকদের পর্যবেক্ষণে রাখছেন কর্তৃপক্ষ। ২৬-শে মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত সকল সরকারি অফিস বন্ধ সহ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বন্ধ রাখা হয়েছে গণপরিবহন সহ নৌযান চলাচল।
করোনা প্রতিরোধে সরকারের এ সকল উদ্যোগের সাথে আমাদেরকেও অতি গুরুত্বের সাথে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। সচেতনতাগুলো তেমন কঠিন কিছু নয়। শুধুমাত্র আমাদের দৈনন্দিন জীবনের করণীয় অংশে একটু সচেতনতা আনতে হবে । যেমন: ১. হাত সব সময় কোথায় আছে খেয়াল করা এবং পরিষ্কার রাখা। সেই জন্য বাইরে কোন কিছুতে হাত দিলে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া অথবা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করা। ২. অসাবধানতাবশত হাত যেন নাকে, চোখে বা মুখে না যায়, সেজন্য বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করা। খুব কাছে থেকে কেউ জোরে কাশি দিলে, তা–ও মাস্ক সেই ড্রপলেট ঠেকাতে পারবে। সে কারণে এই মাস্ক সাধারণ মাস্ক হলেই চলবে, মাস্ক না পেলে রুমালও ব্যবহার করা যাবে। কয়েকটা মাস্ক থাকলে তা গরম পানিতে সাবান দিয়ে ধুয়ে আবার ব্যবহার করা যাবে। ৩. সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ভীষণ জরুরি। সব রকমের ভিড় এখন পরিহার করতে হবে। আপাতত নিজেদের পরিবার বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে একটি ছোট্ট পরিধি তৈরি করে থাকতে হবে। বাইরে হাঁটাচলা করা ভালো, তবে তা অবশ্যই ভিড় এড়িয়ে। দৈনন্দিন মানবিক ব্যবহার, প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়া, কেউ বিপদে পড়লে তাকে ধরে সাহায্য করা সবই চলবে, তবে হাত ধোয়ার আগে নিজের হাত মুখে লাগানো যাবে না। এ বিষয়গুলো কোভিড-১৯ প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থার মতই অত্যন্ত জরুরি।
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চাপ পড়েছে অর্থনীতির ওপর। ভুগতে হচ্ছে নানাবিধ সমস্যায়। এ সমস্যা কীভাবে মোকাবিলা করব তাও এখনো পরিষ্কার নয়। ভাইরাস বিস্তৃতির সঙ্গে কাঁচামালের সংকটে বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন সংকুচিত হয়ে আসছে। একইভাবে কমে আসছে আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে কোনো কোনো খাতে উৎপাদন নেমে আসবে শূন্যের কোঠায়। অপরদিকে চীনে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানি পুরোটাই আটকে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংকগুলো সময়মতো ঋণের কিস্তির টাকা পাবে কিনা তা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এদিকে করোনাভাইরাসের অজুহাতে অস্থির হয়ে উঠেছে নগরীর ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের দাম। এমনিতেই আমরা দুর্নীতির ভাইরাসে আক্রান্ত। করোনাভাইরাস সেসব দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীক  …ব্যবসায়ীকে দুর্নীতি করার সুযোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা এক কঠিনতম সময় অতিক্রম করছি। সেই কঠিন সময়ের কথা স্মরণে রেখে সেসব ব্যবসায়ী বিপৎকালীন যেন অনৈতিক সুযোগ না নেন এটুকুই প্রার্থনা রইল। মনে রাখতে হবে, সমস্যা যতই কঠিন হোক না কেন এ দুর্যোগ আমাদেরই মোকাবিলা করতে হবে। আশা করি, দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য একজন দেশপ্রেমিকের মতো আমরা এর প্রমাণ রাখতে সক্ষম হব।
আমরা মনে করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিকল্প পথের সন্ধান করতে হবে। আমাদের অর্থনীতিকে রক্ষার স্বার্থেই এ কাজ সর্বোচ্চ বিবেচনার দাবি রাখে। এ নিয়ে সরকার অবশ্যই ভাবছেন। তাদের এ ভাবনার দ্রুত প্রতিফলন দেখতে চায় দেশের প্রত্যেক মানুষ। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও ভাবতে হবে। অভ্যন্তরীণ বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে তাদেরই আসতে হবে প্রধান ভূমিকায়। মনে করতে হবে, তারা একটি যুদ্ধের অংশ হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারের একার পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। গোটা জাতিকেই এ যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। সবাই সততার সঙ্গে এ কাজে অংশ নেবেন এটাই প্রত্যাশা।

লেখক:শাহ্ আলম কবীর