শনিবার,১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

করোনায় কৃষির ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনতেই হবে

মুক্তখবর :
মে ১০, ২০২০
news-image

মো. হায়দার আলী
কৃষকের ইরি ধান চাষ করে ধান উৎপাদন করতে সার, বীজ, কীটনাশক, নিড়ানী, কৃষি শ্রমিক ইত্যাদিতে কি পরিমান ব্যয় এবং বর্তমানে ধানের বাজার মূল্যেতে কি কৃষক লাভবান হবেন না ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ধান চাষে অগ্রহ হারাবেন এ সম্পর্কে লিখার জন্য, তথ্য উপাত্ত নিয়ে ল্যাপটপ ওপেন করলাম এমন সময় রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের এক কৃষক বন্ধু আমার বাড়ীতে আসলেন অন্য একটি কাজে, নাস্তা করার পর তিনি বললেন, বিজিবি ও জনপ্রতিনিধিরা পাট চাষ না করতে পরামার্শ দিয়ে, পাটের পরিবর্তে অন্য ফসল চাষ করতে পরামার্শ দিচ্ছেন। আমি প্রশ্ন করলাম কেন? সে উত্তর দিল পাট গাছ বেশ বড় হয় সে জন্য চোরাকারবারী ও মাদকব্যবসায়ীদের ভারতীয় বিএসএফ কিংবা আমাদের বিজিবি তাড়া করলে সহজেই তাড়া খেয়ে পাট ক্ষেতে আত্মগোপন করতে পারেন। খুব সুন্দর তো, একে বারই খোড়া যুক্তি আমি তাকে বললাম কারো মাথা ব্যথা হলে কি মাথা কেটে ফেলতে হবে। না মাথা ব্যথার ওষুধ পান করতে হবে। তার কথা আমি অবিশ্বাস করিনি কেন না মাঝে মধ্যেই বিজিবির প্রতিনিধিরা গোদাগাড়ী উপজেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিং এ পাট, ভূট্টাসহ যে সকল ফসল বেশী উচ্চু হয় সেগুলি যেন সীমান্ত এলাকায় কৃষকেরা চাষ না করেন সে ব্যপারে গুরুত্ব দেয়ার জন্য অনুরোধ করতেন। এ ব্যপারে উদ্ধোর্তন কতৃপক্ষের দৃষ্টি আর্কষণও করতেন বলে জানান ওই সব বাজিবি প্রতিনিধি।
সে যাই হউক ওই কৃষক বন্ধুর কথা শুনে লেখার থিমটি পরিবর্তন করে বাংলাদেশের এক সময়ের সোনালি আঁশ পাট সম্পর্কে আল্লাহর নাম নিয়ে লিখা শুরু করলাম।
পাটকে বলা হত সোনালিআঁশ। এই পাটই ছিল এক সময়ের বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি যোগ্য অর্থকারী ফসল। পাটজাত দ্রব্যই ছিল এদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। পাটের গুরুত্ব অনুধাবন করে পাট সম্বন্ধে যাতে সবাই জানতে পারে সেজন্য পাটকে পাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আজ থেকে পনেরো থেকে বিশ বছর আগেও যিনি অন্তত পক্ষে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছে তিনি অবশ্যই পাট সম্পর্কে অধ্যয়ন করেছে। পাট সম্পর্কে রচনা মুখস্ত করে নি এমন ছাত্র তখন বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যেত না। কোন না কোন বছর কোন না কোন শিক্ষা বোর্ডে পাবলিক পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রে রচনা কিংবা বঙ্গানুবাদে পাট সম্পর্ক প্রশ্নপত্রে দেখা যেত। এদেশের অর্থনীতিতে পাটের গুরুত্ব কি রকম ছিল তা বুঝার জন্যই এ কয়েকটি কথা উল্লেখ করলাম।
বাংলাদেশের মাটি ও জলবায়ু পাট চাষের জন্য এতটাই উপযোগী যে, পূথিবীর সবচেয়ে উত্তম পাট বাংলাদেশে উৎপান্ন হয়।
জানা গেছে, ১৯৮০ দশকের শুরুতে এ দেশে কাঁচা পাট উৎপাদন ছিল ৬০ থেকে ৬৫ লাখ বেল, ১৯৯০ দশকের শুরুতে এটি নেমে আসে ৪৪ লাখ থেকে ৪৭ লাখ বেল। তবে সম্পতি পাট উৎপাদনে অগ্রগতি দৃশ্যমান দেশের মোট রপ্তানী আয়ের ৩% থেকে ৪% আসে পাট ও পাট জাত পুন্য থেকে। পাটের প্রাথমিক মূল্য বাজার বাবদ ৫০০০ থেকে ৬০০০ কোটি টাকা দেশের রবি ফসলের যোগান দেয়। সুতরাং কৃষি এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সোনালি আঁশ পাটের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাট সাধারণত ৮ জাতীয় দেখা যায়, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তোষা পাট-৫, তোষা পাট-৬, তোষা পাট-৬, দেশী পাট-৭, দেশীপাট-৮।
কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও বাস্তব সত্য, সোনালি আঁশের সেই সুদিন এখন আর নেই। পাট এখন আর এদেশের সোনালী আঁশ নয়, এ যেন কৃষকের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে অথবা একটি রুগ্ন শিল্পের নাম। পাট শিল্প মানেই একটি অনিশ্চয়তা, পাট শিল্প মানেই অর্থনীতিতে একটি বোঝা। দীর্ঘদিন ধরেই পাট শিল্পে দুর্দিন চলছে। অব্যাহতভাবে লোকসান দিতে দিতে পাটকলগুলো পঙ্গু হয়ে পড়েছে। প্রতিবছর এই পাটকলগুলোর শ্রমিকদের বেতনভাতা পরিশোধ করতে গিয়ে সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে কয়েকশ’ কোটি টাকা। অবস্থা এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, অনেক পাটকল তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা পর্যন্ত পরিশোধ করতে পারে না। কিন্তু দেশের অর্থনীতির স্বার্থে পাট শিল্পকে অবশ্যই টিকিয়ে রাখতে হবে। তাই পাট শিল্পের উন্নয়নের জন্য আজ দেশের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে পাট শিল্পকে পুনরুজ্জীবন করতে হবে। দেশ এবং জাতির স্বার্থে সোনালী আঁশের সর্বনাশকে রুখতে হবে এবং এর সুদিনকে আবারো ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পাটশিল্পের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখনো এই শিল্পে প্রায় ঢেড়লক্ষ মানুষ কর্মরত আছে। একসময় বিশ্ব পাট বাজারের সিংহভাগই বাংলাদেশ পূরণ করত। বাকিটা পূরণ করত ভারত। মূলতপক্ষে ভারত এবং বাংলাদেশই পাট শিল্পের জন্য বিখ্যাত ছিল। এখানকার জমি পাট চাষের জন্য উপযোগী বিধায় এ অঞ্চলেই পাট চাষ বিকাশ লাভ করেছিল এবং এখানেই গড়ে ওঠেছিল বড় বড় পাটকল। এ অঞ্চল থেকেই উৎপাদিত পাটই সারা বিশ্বে রপ্তানি হত এবং বিশ্ববাজারের পাটের চাহিদা পূরণ করত। স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত এদেশে পাট শিল্পের অবস্থান ছিল ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই এদেশের পাট শিল্পে আস্তে আস্তে বিপর্যয় নেমে আসে। এদেশে যে সমস্ত পাট শিল্প গড়ে ওঠে তার অধিকাংশ মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি। পাট শিল্পের কারিগরি দক্ষতা এবং এই ব্যবসার আমদানি-রপ্তানিসহ সার্বিক নিয়ন্ত্রণ মূলত তাদের হাতেই ছিল। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হবার পশ্চিম পাকিস্তানিরা তাদের পাটকলগুলো এদেশের ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দেয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার পাটকলগুলোকে জাতীয়করণ করে এবং বিজেএমসির তত্বাবধায়নে এসবের পরিচালনা শুরু করে। সরকারি মালিকানায় যাওয়ার পর থেকেই পাট শিল্পগুলো আস্তে আস্তে রুগ্ন হতে থাকে। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, জবাবদিহিতার অভাব, কথায় কথায় সিবিএর আন্দোলন এবং আর্থিক অস্বচ্ছতা আস্তে আস্তে পাট কলগুলোতে স্থান লাভ করে। শুধু কি তাই পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যাগ, বস্তাসহ অন্যান্য দ্রব্যাদি উৎপাদন ব্যবহার, ক্রয় বিক্রয় বেশী হওয়ায় পাটজাত দ্রবাদি বাজার নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় একদিকে অন্যদিকে কৃষক তাদের উৎপাদিত পাট, পুকুর, নদীর পাড়, খাল, বিল, রাস্তার পাশের ডোবাগুলি বিভিন্ন সময় সরকার দলীয় প্রভাবশালি মহল অবৈধভাবে দখল করে নেন। পরে কৌশলে ভরাট করে দোকান, বাড়ীর জন্য বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে অঙ্গুল ফুলে কলা গাছ তারপর বটবৃক্ষ হয়েছে, এগুলি ক্রয় বিক্রয় হয়ে কয়েক বার হাত বদল হয়েছে। আর এসব কারণে পাট চাষীদের পাট জাগ দেয়ার স্থল গুলি ক্রমে বিলুপ্ত যাওয়ায় এবং পাটের নায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষক পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ের কৃষিকর্মকর্তা, কর্মচারীগণ কৃষকদের পাটচাষ না করার জন্য পরামার্শ দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে এবং
কৃষি শ্রমিকেরা ঠিক মত কাজ না করায় উৎপাদনও ব্যাহত হয়। এদিকে অফিস সময়ে কাজ না করলেও, কাজের সময়কে বাড়িয়ে কিভাবে ওভার টাইম আদায় করা যায় সে ব্যবস্থাও চলতে থাকে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবার কারণে বাজারে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকার জন্য পাটকলগুলোকে কখনই আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফলে সময়ের সাথে সাথে পাটকলগুলো আপডেট না হওয়ায় এগুলো বেকডেটেট রয়ে গেছে এবং সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পাটকলগুলো ব্যর্থ হয়েছে।
পাটকলগুলো লাভজনক না হওয়া সত্ত্বেও, সরকারকে প্রতিবছর এই মিলগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা পরিশোধ করতে গিয়ে কয়েকশ’ কোটি টাকা করে ব্যয় করতে হয়, যার পুরোটাই লোকসান ছাড়া আর কিছুই নয়। এভাবে চলার একপর্যায়ে সরকার বিভিন্ন পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে। এ ধারাবহিকতায় ২০০২ সালে বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল আদমজী বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে খুলনায় বন্ধ করা হয় আরো চারটি পাটকল। এ অবস্থায় এদেশে পাট শিল্পের অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। এ অবস্থায় পাট শিল্পকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে এবং একে পুনরুজ্জীবনের জন্য কাজ করতে হবে।
সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ১৭৭টি পাটকল রয়েছে। তন্মধ্যে সরকারি মালিকানায় ২৭টি এবং বেসরকারি মালিকানায় ১৫০টি। পাটকলগুলো মূলত দু’ধরনের। একটি হচ্ছে প্রচলিত পণ্য উৎপাদনকারী অর্থাৎ কনভেনশনাল পাটকল, যেগুলো পাটের বস্তা, হেসিয়ান ও সিবিসি উৎপাদন করে থাকে। অপরগুলো হচ্ছে পাটসুতা উৎপাদনকারী পাটকল, যেগুলো পাটসুতা উৎপাদন করে থাকে। অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী এদেশে ২০১০-১১ সালে প্রায় ৮৪ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়, যা ২০১৪-১৫ সালে-এর পরিমাণ ৭৬ লাখ বেলে নেমে আসে। কিন্তু বর্তমানে তা আবার বাড়তে শুরু করেছে। ফলে ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে পাট উৎপাদনের হয়েছে ৭৫ দশমিক শূন্য ১ লাখ বেল। ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ৯১ দশমিক ৭২ লাখ বেল।
গত ২০১৭ ইং সালে ৮ দশমিক ১৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করে ৯১ দশমিক ৭২ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়েছে।
৬ বছর আগে বছরে ২২/২৩ লাখ বেল কাঁচা পাট রপ্তানি হত। মূল ক্রেতা ছিল ভারত ও পাকিস্তান। কিন্তু বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশ দুটি পাট কেনা কমিয়ে দেয়, ফলে তা ১০/১২ লাখ বেলে নেমে আসে। এবছর করোনার কারণে অনেক নীচে নেমে আসবে। কিন্তু বর্তমানে রপ্তানির পরিমাণ আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এই অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কাঁচা পাট রপ্তানি ৬০ শতাংশ বেড়েছে। এটা অবশ্যই আমাদের পাট শিল্পের জন্য সুখবর। জুট স্পিনার্স এসোশিয়েশনের তথ্য মতে দেশের ৭৭টি পাটকলে প্রায় পাঁচ লাখ টন সুতা উৎপাদিত হয়, যার ৭০ শতাংশ রপ্তানি হয় এবং বাকি ৩০ শতাংশ দেশে ব্যবহৃত হয়।
যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এদেশের পাট শিল্পের উন্নতি সাধন করতে হবে এবং এর সুদিন ফিরিয়ে আনতে হবে। আর এটা সম্ভব। কারণ বিশ্বব্যাপী পাটজাত পণ্যের এখনো বিশাল বাজার রয়েছে। পাটজাত দ্রব্য পরিবেশবান্ধব বিধায় এর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে এর ব্যবহার আরো বাড়বে। সুতরাং পাটজাত পণ্যের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল এবং একই সাথে পাট শিল্পের ভবিষ্যৎও উজ্জ্বল। তাই পাট শিল্পের উন্নয়নে সরকারি উদ্দ্যোগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং সাথে সাথে বেসরকারি উদ্দ্যোগের সমন্বয় ঘটাতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন ২০১০ বাস্তবায়ন করেছে। ফলে দেশীয় বাজারে পাটের বস্তার চাহিদা ৩০% বেড়েছে। আগে বছরে সাড়ে তিন কোটি পাটের বস্তার চাহিদা থাকলেও এখন তা সাড়ে চার কোটিতে উন্নীত হয়েছে। চলতি অর্থবছর শেষে তা ছয় কোটিতে উন্নীত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই আইনটি শতভাগ বাস্তবায়ন হলে বছরে ৬৯ কোটি পাটের বস্তার প্রয়োজন হবে, যা জন্য প্রায় ২২ লাখ বেল পাটের প্রয়োজন হবে।
পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবনের স্বার্থে সরকার প্রস্তাবনাসমূহ বিবেচনা করতে পারে এবং আমি মনে করি এই প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে এই শিল্পের অবস্থা আস্তে আস্তে উন্নতি লাভ করবে।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ চাষী প্রত্যক্ষভাবে পাট চাষের সাথে সম্পৃক্ত এবং পাট চাষ, পাট প্রক্রিয়া জাত ও পাট জাতীয় বিভিন্ন দ্রব্যের ব্যবসার সাথে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবন জীবিকা সম্পর্কিত। বাংলাদেশের কাঁচা পাট রপ্তানী হয় ভারত পাকিস্থান, ইউরোপ, আইভকোস্ট, থাইল্যন্ডসহ অন্যান্য দেশে। পাটজাত পুন্য রপ্তানী হয় ইউরোপ, তুরস্ক, ইরান, আমেরিকা, অস্টোলিয়া, সৌদি আরব, জাপান, সুদান, ঘানাসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে। এখন পাটজাত পুন্যের বাজার আরও বৃদ্ধি করা জরুরী।
পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবনের স্বার্থে সরকার নিম্মোক্ত প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করেন তা হলে এ শিল্পের অবস্থা দিনে দিনে উন্নতি লাভ করবে ইনশাল্লাহ।
যেসব পাটকল আর্থিক সমস্যায় জর্জরিত তাদেরকে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ব্যাংক ঋণ দিতে হবে। এইসব পাটকলের বিপরীতে যদি খেলাপি ঋণ থাকে, তাহলে সেই খেলাপি ঋণকে পুনঃতফশিলের ব্যবস্থা করে দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে। সরকারি মালিকানায় যে সমস্ত পাটকল রয়েছে, এগুলোতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে এবং একই সাথে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এগুলোতে কাজের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে। পুরাতন মেশিনারিজসমূহ পরিবর্তন করে নতুন এবং আধুনিক মেশিনারিজ স্থাপন করতে হবে। পাট শিল্পে যে সমস্ত নতুন টেকনোলজি আবিষ্কৃত হয়েছে সেগুলোর প্রয়োগের মাধ্যমে পাটকলগুলোকে আধুনিকায়ন করতে হবে।
সরকারি মিলগুলোকে ক্রমান্বয়ে বেসরকারি মালিকানায় হস্তান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রসঙ্গত একটি কথা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, আর তা হচ্ছে সরকারি মালিকানায় শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়। এটা অতীতেও যেমন কোন দেশে হয়নি, তেমনি ভবিষ্যতেও হবে না। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মাধ্যেমেই শিল্পায়ন সম্ভব। সুতরাং সরকারি মালিকানার পাটকলগুলোকে যথাযথ উপায়ে যদি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে এই শিল্প আবারো বিকশিত হবে।
পাটজাত দ্রব্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং এজন্য দেশে এর বাজার সৃষ্টি করতে হবে। পাটজাত দ্রব্য পরিবেশবান্ধব বিধায় এর ব্যাপক ব্যবহারের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
সরকার পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন বিপনন, ব্যবহার আইন করে নিষিদ্ধ করেছেন, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তদারর্কী না থাকায় এর ব্যবহার ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। এমন কোন পরিবার নেই যে পরিবারের সদস্যরা পলিথিন ব্যবহার করেন না। পলিথিনের যত্রতত্র ব্যবহার শুধু পাট শিল্পকে ধ্বংস করছেনা গোটা বাংলাদেশের ড্রেনেজ সিষ্টামকে অকেজো করে দিচ্ছে, সামান্য বৃষ্টিতে জলবদ্ধতার সৃষ্টি করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলছে।চাষযোগ্য জমিতে যত্রতত্র পলিথিন পড়ে থাকায় জমির উর্বরতা শক্তি দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। তাই পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে এ পাটের ব্যাগ এই চাহিদা সহজেই পূরণ করতে পারে। অধিকন্তু চাল, ডাল, আলু, মরিচ, গম, ভুট্টা, ছোলা প্রভৃতি পণ্য রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সহজেই পাটের বস্তা ব্যবহার করা যায়।
এছাড়া স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার করতে পারে। প্রতিটি ছাত্রছাত্রী যদি স্কুল ব্যাগের জন্য পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার করে, তাহলে পাটজাত পণ্যের বিশাল বাজার সৃষ্টি হবে। এ ছাড়া শপিং ব্যাগ হিসেবে পাটজাত ব্যাগ সহজেই ব্যবহার করা যায়। তখন অটোমেটিক্যালি দেশে পাটজাত পণ্যের বিশাল বাজার সৃষ্টি হবে। এজন্য সরকারকে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
পাটজাত পণ্যের রপ্তানির বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ইনসেনটিভের পরিমাণকে বাড়াতে হবে। বর্তমানে পাটপণ্য রপ্তানির বিপরীতে সরকার এফওবি মূল্যের ভিত্তিতে ১০% ইনসেনটিভ দিচ্ছে। পাট শিল্পকে বিকশিত করতে এবং এর উৎপাদিত পণ্য সমূহের রপ্তানি বাড়াতে এই ইনসেনটিভের পরিমাণ বাড়িয়ে কমপক্ষে ১২% করা উচিত।
এই শিল্পে নতুন উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে এবং কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং পাট শিল্পকে কমপক্ষে পাঁচ বছর ট্যাক্স ফ্রি করতে হবে।
সপ্তমঃ পাট চাষে কৃষকদের আগ্রহী করাতে উপজেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। উৎপাদিত পাটের নায্যমূল্য যেন কৃষকপান সে জন্য সরকারকে কৃষকদের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং কৃষক যেন সহজ শর্তে কম সুদে লোন পান সে ব্যবস্থা করতে হবে।
সর্বোপরি পাট শিল্পকে মনিটরিং করার জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করতে হবে, যেটি পাট শিল্পের সমস্যাসমূহ দূর করতে এবং একই সাথে এই শিল্পকে বিকশিত করতে কাজ করবে।
যে সব খাসপুকুর, বিল, খাল, নদীর পাড়, রাস্তার পাশের ডোবা অবৈধ দখল হয়ে গেছে সুগুলি দখল মুক্ত করে কৃষক যেন তাদের উৎপাদিত পাট জাগ দিতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।
নবমঃ মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে কৃষক বর্তমানে যে পরিমান পাঠ চাষ করেন তার বিশাল অংশ শাক হিসেবে কিংবা গোখাদ্য হিসেবে কৃষক জমি থেকে কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এগুলি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা ও সচেতেনতার মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে।
কাঁচা পাট ও পাটজাত পুন্য রপ্তানীতে পূথিবীর অন্যান্য দেশে নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি করতে হবে।
আশা করা যায় এর মাধ্যমে সোনালি আঁশের সুদিনকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। একসময় বাংলাদেশ পাট শিল্পে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছিল, যা অনেক দেশের কাছেই অসহনীয়। আমরা আবারো সোনালী আঁশের সেই সুদিন ফিরিয়ে আনতে চাই। অতএব আসুন, দেশ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে পাট শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হই এবং কাজ করি।
করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের কৃষি সেক্টরের ব্যপক ক্ষতি হয়েছে, এ ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এক কালের সোনালি আঁশ পাটের সুদিন ফিরিয়ে আনা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। এর বিকাশ ঘটাতে পাট ভিক্তিক নতুন নতুন আধুনিক কলকারখানা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা। কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, সবার আগে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করতে পাটের সোনালি অতীত ফিরিয়ে আনতে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এক সাথে কাজ করতে হবে।  বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে মানবতার মাতা, প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিসার নেতৃত্বে ঐতিহ্যবাহী পাটের হারানো গৌরব অদূর ভবিষ্যতে ফিরে আসুক এটা দেশবাসী প্রত্যশা করেন।