বুধবার,২৫শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ডায়েটে যেসব ভুল ধরেছেন ব্রিটিশ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ

মুক্তখবর :
মে ২০, ২০২০
news-image

ভারতীয় উপমহাদেশের খাবারগুলো বিশ্বজুড়েই জনপ্রিয়। বিভিন্ন ধরনের স্বাদ ছাড়াও ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ডায়েটে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টির সুষমতাও রয়েছে। এরপরেও খাবারগুলো স্থূলতা ও ডায়াবেটিস জনস্বাস্থ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেটের মতে, বর্তমানে ভারতে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৭২.৯৬ মিলিয়ন। ভারতকে ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে বিশ্বের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ উপমহাদেশে ডাল, তাজা ফলমূল এবং শাকসব্জি উল্লেখযোগ্য খাদ্য হওয়ার পরও কেন এমনটি ঘটছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। এই সমস্যার পেছনে কি পশ্চিমা খাবার (পিজ্জা, বার্গার, ফ্রাই ইত্যাদি) দায়ী নাকি আমাদের নিজস্ব খাবারের ডায়েটে ভুল রয়েছে?

টাইমস অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে কথা বলেছেন ব্রিটিশ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ স্বনামধন্য লেখক ডা. অসীম মালহোত্রা। তিনি যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছেন সেটি এখানে উল্লেখ করা হলও-

করোনা ভাইরাসে ডায়াবেটিসের ভূমিকা

ডা. অসীম বলছিলেন, বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস মহামারি চলছে, সেটি সবচেয়ে প্রভাব বিস্তার করছে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে। ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এটি গড়ে দশ বছর আয়ু হ্রাস করতে পারে।

ভারতীয় এবং ক্রনিক বিপাক সিনড্রোমের মধ্যে সম্পর্ক

ভারতে সাধারণ বিএমআই (বডি মাস ইনডেক্স) সহ ৪৩ শতাংশ মানুষ বিপাকীয়ভাবে স্বাস্থ্যহীন। এর অর্থ হলো বিপুল পরিমাণ মানুষ এই কথা ভেবে বাস করছে যে, তারা বেশি ওজন বা অস্বাস্থ্যকর নয়।

ডা. অসীম পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করেছেন যেগুলো বিপাকীয় স্বাস্থ্য ঠিক রাখবে। সেগুলো হলও-

১. আপনার রক্তচাপ ১২০-৮০ থাকতে হবে।

২. আপনার প্রাক-ডায়াবেটিস বা টাইপ২ ডায়াবেটিস থাকা উচিত নয়।

৩. আপনার ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা প্রতি লিটারে ১.৭ মিলিমোলের চেয়ে কম হওয়া উচিত।

৪. আপনার ভাল কোলেস্টেরল (এইচডিএল) প্রতি লিটারে ১ মিলিমোলের বেশি হওয়া উচিত।

৫. আপনি যদি একজন পুরুষ হন তবে আপনার কোমরের পরিধি ৯০ সেন্টিমিটারের (৩৫ ইঞ্চি প্রায়) কম হওয়া উচিত এবং কোনও মহিলার ক্ষেত্রে এটি ৮৫ সেন্টিমিটারের (৩৩ ইঞ্চি প্রায়) কম হওয়া উচিত।

এর অর্থ হলও আপনার বিএমআই ঠিক থাকলেও উপরের যেকোনো একটি বিষয় যদি ঠিক না থাকে তাহলে আপনি পুরোপুরি সুস্থ নন, যেটি আপনি ভাবছেন। ডায়েট শব্দটি উল্লেখ করতে গিয়ে ডা. অসীম এর উৎস গ্রীক শব্দ ‘ডায়াটা’ এর বিষয়ে বলেন। ‘ডায়াটা’ শব্দের অর্থ হলও ‘জীবনযাত্রা’।

ভারতীয় ডায়েটের ৭০ শতাংশ ক্যালোরি আসে কার্বোহাইড্রেট খাবার থেকে আসে। আর এসব কার্বহাইড্রেট খাবার সেরা মানের নয়। এই নিম্নমানের কার্বোহাইড্রেটগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে চিনি, ময়দা জাতীয় পণ্য, রুটি এবং সাদা ভাত।

ডা. অসীম জানিয়েছেন, সাধারণ ভারতীয়রা গড়ে প্রতিদিন ফলের রস, মিষ্টি, চিনিজাতীয় পানী এবং স্ন্যাক্সের মাধ্যমে অন্তত ১৫ চা চামচ চিনি গ্রহণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই পরিমাণ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৫চা চামচ নির্ধারণ করে দিয়েছে। এর অর্থ হলও যেটুকু খাওয়া উচিত তার চেয়ে তিন চারগুণ বেশি চিনি গ্রহণ করছে উপমহাদেশের মানুষ।

আপনার ডায়েট টাইপ-২ ডায়াবেটিস বিপরীত করতে পারে

জনপ্রিয় বিশ্বাসগুলির বিপরীতে, ডাঃ আসিম ব্যাখ্যা করেছিলেন যে আপনার ডায়েটিভ অভ্যাসগুলি পরিবর্তন করতে কখনই দেরি হয় না কারণ এটি আপনাকে সপ্তাহের মধ্যে টাইপ ২ অভ্যাসের বিপরীতে সহায়তা করতে পারে। সাবধানে আপনার ডায়েট পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করে এটি করা যেতে পারে। নিরবচ্ছিন্নদের জন্য ডাঃ অসীম টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন এবং লাইফ-স্টাইল এবং ডায়েটরি পরিবর্তনের সাহায্যে তাদেরকে আবার বিপরীতে পরিণত করার ক্ষমতা দিয়ে চলেছেন।

তিনি যখন রোগীদের তাত্ক্ষণিকভাবে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করার পরামর্শ দেননি, তখন তিনি টাইপ -২ ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ডায়েটরি পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে টাইপ -২ ডায়াবেটিসের ওষুধ এবং ইনসুলিন আজীবন বা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমাতে কাজ করে না এবং এগুলি তাদের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলি নিয়ে আসে।

সঠিক ডায়েট টাইপ-২ ডায়াবেটিসকে হারাতে পারে

ডা. অসীম বলছিলেন, তিনি টাইপ টু ডায়াবেটিসদের শুরুতেই ওষুধ বাদ দিতে বলেন না। বরং ডায়েটে পরিবর্তন করতে বলেন এবং আস্তে আস্তে ওষুধ বাদ দিতে বলেন। তার মতে, ভাত-রুটি-পাস্তা, চিনি বা ইত্যাদি গ্লুকোজ জাতীয় এবং কার্বোহাইড্রেটেট যুক্ত খাবার বাদ দেয়া উচিত। তার পরিবর্তে তাজা ফল, শাকসবজি খাওয়া বাড়িয়ে দেয়া উচিত। ফলের রস না খেয়ে তাজা ফল খাওয়া উচিত।

ডায়েট এবং টাইপ টু ডায়াবেটিসের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। কেটো ডায়েট ডায়াবেটিস দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

বিরতিযুক্ত ডায়েট এর সুবিধা

আপনি চিনি ছাড়া খাবারগুলো খেলে পরিপূর্ণতা পাবেন এবং আগের মতো খিদে লাগবে না। এছাড়া বিরতি দিয়ে দিয়ে খাবার গ্রহণ করলে তা আরও স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। এজন্য ডা. অসীম বলছিলেন যে, তিনি সপ্তাহে দুই তিন দিন দিনে ১৬ ঘণ্টা করে উপোষ থাকেন এবং রাত ১২ থেকে সকাল আটটার মধ্যে একবার খান।

এছাড়া ভারতীয়দের ডায়েটে অন্যতম ঘাটতি রয়েছে প্রোটিনের। মাছ, মাংস প্রোটিনের অন্যতম উৎস হয়ে থাকলেও সাধারণ মানুষের বেশিরভাগই সেই চাহিদা পূরণ করতে পারেন না।

উপমহাদেশে সাধারণত উদ্ভিজ্জ তেল যেমন- সয়াবিন, সূর্যমুখী তেল, ক্যানোলা ইত্যাদি বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু উদ্ভিজ্জ বীজ থেকে উৎপাদিত এসব তেল স্বাস্থ্যকর নয়। এর পরিবর্তে ডা. অসীম নারকেল তেল, দেশি ঘি এবং অতিরিক্ত ভার্জিন তেল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ এই তেল গরম হওয়ার পরও অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু উদ্ভিজ্জ বীজ থেকে পাওয়া তেল গরম হওয়ার পর ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

এছাড়া স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে ধূমপান ছাড়ার পাশাপাশি হাঁটা শুরু করা উচিত। কারণ যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হৃদরোগ থেকে মৃত্যুর হার হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে লক্ষ্য করা গেছে।

আপনি যদি নিরামিষাশী হয়ে থাকেন তাহলে সাদা ভাত, রুটি বা আটা জাতীয় পণ্য কম গ্রহণ করে প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি বেশি পরিমাণে রাখুন। এছাড়া নিরামিষাশীদের খাবারে প্রোটিনের অভাব থাকায় নিয়মিত ডাল, মসুর, ছোলা, পনির এবং পালন শাক অন্তর্ভুক্ত করুন।