বুধবার,২৮শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সপ্তাহে দুটি ডিমও পাচ্ছে না দেশের মানুষ

মুক্তখবর :
আগস্ট ২৪, ২০২০
news-image

বিশ্ব ডিম দিবসে গত বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সুস্থ মেধাবী জাতি চাই, প্রতিদিনই ডিম খাই’। কিন্তু প্রতিদিন তো দূরের কথা সপ্তাহে দুটি ডিমও পাচ্ছে না দেশের মানুষ। প্রতিবছরই ডিমের বাজার চলছে চাহিদার তুলনায় বিশাল ঘাটতি নিয়ে। আর সেই ঘাটতি বেড়েই চলছে। ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে চাহিদার তুলনায় ডিমের ঘাটতি সাড়ে ২৯ কোটি বা প্রায় ২ শতাংশ। আগের বছর ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা কম ছিল। প্রতিবছর এই খাতে যে হারে চাহিদা বাড়ছে সে হারে বাড়ছে না উৎপাদন। কারণ পোল্ট্রি খাদ্যের বাড়তি দাম, খামারিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকা, বিভিন্ন সময় রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব, অপপ্রচার, প্রয়োজনীয় প্রচারের অভাব ও সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর আধিক্য ইত্যাদি কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা ঝরে পড়ছেন। ফলে দেশে চাহিদার তুলনায় ডিমের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। অথচ মাছ ও মাংসের দাম বেশি হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে ডিমের ওপরই নির্ভর করে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষের ন্যূনতম পুষ্টিচাহিদা পূরণে খাদ্যতালিকায় বছরে ১০৪টি বা সপ্তাহে দুটি ডিম থাকা দরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ডিমের ন্যূনতম চাহিদা (জনপ্রতি বছরে ১০৪টি) ছিল এক হাজার ৭৬৫ কোটি ৯২ লাখ, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে এক হাজার ৭৩৬ কোটি ৪৩ লাখ, ঘাটতি ২৯ কোটি ৪৯ লাখ বা ১.৬৯ শতাংশ। সেই হিসাবে দেশের প্রতিটি মানুষ গত বছর ডিম খেয়েছে ১০২ দশমিক ২৬টি, যা সপ্তাহে দুটিরও কম। অর্থাৎ ন্যূনতম পুষ্টিচাহিদাও পূরণ হচ্ছে না দেশের মানুষের। শুধু আমিষের চাহিদা নয়, দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের অনেকের পরিবারেই দুটি ডিম আর একটি আলুতে এক বেলার খাবারও হয়ে যায়, সেটাও হচ্ছে না।

উদ্যোক্তারা বলছেন চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে বছরে প্রতিজন ৩০০ থেকে ৪০০ ডিম খায়। অথচ আমাদের দেশে ডিমের ভোগ তুলনামূলক কম। এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ জরুরি। এর আগে খামারিদের ন্যায্য দামের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) মো. নজরুল ইসলাম ডিমের উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে দাম না পাওয়াকেই অন্যতম কারণ বলছেন।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, একটি ডিমের জন্য সাড়ে পাঁচ টাকার খাবার দিতে হয়। ওষুধ, শেডভাড়া, লেবার খরচ—সব মিলিয়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ছয় টাকা ৬২ পয়সা থেকে ৮০ পয়সা। এর সঙ্গে খামারির ১৫ পয়সা, পাইকারের ১৫ পয়সা ও খুচরা বিক্রেতার ৫০ পয়সা মুনাফা এবং পরিবহনভাড়া ১০ পয়সা যোগ করলে প্রতিটি ডিমের দাম দাঁড়ায় সাত টাকা ৭০ পয়সা বা ৯২ টাকা ডজন। দাম এর মধ্যে থাকলে এবং সরবরাহ বাড়লে খামারিরা টিকে থাকতে পারেন।

তবে খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মো. মোহসিন বলেন, ‘ব্যাপক উৎপাদনে মাঝে মাঝে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা ডজন ডিম পাওয়া যায়। ওই দামই ভোক্তার মনে গেঁথে থাকে। ৯০ টাকার ওপরে গেলেই মনে হয় দাম অনেক বেড়ে গেছে। তাই উৎপাদন খরচ কমিয়ে ভোক্তার কাছাকাছি রাখতে হবে। দেশে দাম বাড়লে ক্রেতা কমে, ক্রেতা কমলে খামারি লোকসানে পড়েন।’

বাংলাদেশ এগ প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মির মহিউদ্দিন আহমেদ অবশ্য সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীর আধিক্যের কথা বলছেন। তিনি বলেন, ‘উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বেশি। ফলে উৎপাদক ন্যায্য দাম পান না আর ভোক্তাকে খেতে হয় বেশি দামে।’

বর্তমানে খামার পর্যায়ে লাল ডিমের দাম সাত টাকা ১০ পয়সা বা ৮৬ টাকা ডজন। রাজধানীর মালিবাগ, মুগদাসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, খুচরা বাজারে ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি ডজন ডিমে যোগ হয়েছে ২৪ টাকা। সুপারশপগুলোতে ডিম বিক্রি হয়েছে ৬৯ টাকা থেকে ৭৫ টাকা ডজন।

দেশে কয়েক বছর পর পর বার্ড ফ্লু রোগের আক্রমণে একের পর এক খামার বন্ধ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া আরো বিভিন্ন রোগে খামারে মুরগি মরে যাওয়ার হারও কম নয়। রয়েছে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব। বাজারে নকল ডিম পাওয়া যাচ্ছে বলে নানা গুজবও ডালপালা মেলেছে কয়েক বছর ধরে। যদিও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে যেসব ডিম নকল হিসেবে প্রচার করা হতো, তা আসলে প্রাকৃতিক নিয়মে কিছু অস্বাভাবিক আকৃতি ও রঙের।

খন্দকার মো. মোহসিন আলি জানান, প্রতিবছর বিদেশ থেকে ফিরে কিংবা বেকারত্ব ঘোচানোর জন্য অনেক তরুণ ডিমের খামার করেন। এতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ খামার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু লোকসানে পড়ে এর মধ্য থেকে ৫ শতাংশ টিকতে পারে। এবার করোনায় এরই মধ্যে ১৮ শতাংশ খামারি ঝরে পড়েছেন। এখন দেশে গড়ে প্রতিদিন চার কোটি ১৪ লাখ ডিম উৎপাদিত হচ্ছে।