সোমবার,২৩শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

টাঙ্গাইলে বিপুল ওয়াক্ফ সম্পত্তি বেহাত তদারকির অভাবে রাজস্ব হতে বঞ্চিত

মুক্তখবর :
অক্টোবর ১৯, ২০২০
news-image

আঃ রশিদ তালুকদার, টাঙ্গাইল প্রতিনিধিঃ তদারকির অভাবে টাঙ্গাইল জেলার বিপুল পরিমাণ ওয়াক্ফ সম্পত্তি বেহাত হয়েছে ও যাচ্ছে। সরকার রাজস্ব আয়কর হতে অনেক টাকা বঞ্চিত হচ্ছে। ১৯৩৪ সনের ওয়াক্ফ আইন অনুযায়ী টাঙ্গাইল জেলার ২৯৯টি ওয়াক্ফ স্টেটের আওতায় জমি রয়েছে ১০ হাজার ২’শত ১৫ একর।

টাঙ্গাইল জেলার ১২টি উপজেলাওয়ারী জমির পরিমাণ হচ্ছে, মধুপুর ধনবাড়ীতে ১২টি স্টেটের ৯৫ একর, গোপালপুরে ৩৩টি স্টেটের ৩৮ দশমিক ৩৪ একর, ঘাটাইলে ৩১টি স্টেটের ২৩৮ দশমিক ৫৭ একর, ভূঞাপুরে ৪টি স্টেটের ৮৮ দশমিক ২ একর, কালিহাতীতে ৪৮টি স্টেটের ১০০ দশমিক ১ একর, নাগরপুরে ২৮টি স্টেটের ৯৫ একর, দেলদুয়ারে ১৫টি স্টেটের ৩ হাজার ৭ শত ১৪ দশমিক ৪১ একর, বাশাইলে ৩৪টি স্টেটের ৭৭ দশমিক ১১ একর, সখিপুরে ২টি স্টেটের ৫ একর, মির্জাপুরে ২৯টি স্টেটের ৩ হাজার ৩০১ দশমিক ৫৯ একর ও টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ৬২টি স্টেটের আওতায় ২ হাজার ৪ শত ৬২ দশমিক ২৪ একর ওয়াক্ফ জমি রয়েছে।

মধুপুর-ধনবাড়ী জমিদার নবাবজাদা নওয়াব আলী ওয়াক্ফ স্টেট, সদর উপজেলা করটিয়ার জমিদার হায়দার আলী খান পন্নী ও জাফর আলী খান পন্নী ওয়াক্ফ স্টেট, দেলদুয়ারের হযরত শাহানশাহ ও ফতেহাদাদ খান ওয়াক্ফ এবং কালিহাতীর নাগবাড়ী গ্রামের আব্দুল হামিদ চৌধুরী ওয়াক্ফ স্টেটের জমি হলো এর দুই তৃতীয়াংশ। এতিমখানা, মাজার, মাদ্রাসা, খানকায়ে শরীফ, ঐতিহাসিক মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষনের জন্য এসব জমি ওয়াক্ফ করে গেছেন দানশীল জমিদার ও জেলার বিভিন্ন ব্যক্তিরা।

১৯৩৪ সনের ওয়াক্ফ আইনের ওয়াক্ফ স্টেটের আয়ের শতকরা ৫ ভাগ কর সরকারকে দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু কোন কোন ওয়াকফ স্টেট ৪০/৪৬ বছর ধরে সরকারকে রাজস্ব আয়কর দিচ্ছে না। ফলে সরকার কোটি কোটি টাকা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোন কোন এলাকার প্রভাবশালী মহলের তদবীরে ওয়াক্ফ জমি সরকার প্রজাদের বিতরণ করে দেয়ায় অনেক সম্পত্তি বেহাত হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। কোন কোন স্টেটে মুতাওল্লীরা ওয়াক্ফ আইন অমান্য করে গোপনীয়ভাবে ওয়াক্ফকৃত জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। ১৯৩৪ সনের আইন অনুযায়ী ওয়াক্ফকৃত কোন জমি বিক্রি বা লীজ দেয়ার বিধান নেই।

ময়মনসিংহ ওয়াক্ফ জোনাল অফিস একাধিকবার অভিযোগ করেন, ওয়াক্ফ আইন লংঘন করে ধনবাড়ী নওয়াব আলী চৌধুরী ওয়াক্ফ স্টেটের মুতাওয়াল্লী ওয়াক্ফকৃত ৮৪ একর জমির দুই তৃতীয়াংশ অনেক দিন হয় বিক্রি, লীজ ও অন্যভাবে স্থায়ী হস্তান্তর করেছেন। ওয়াক্ফ জোনাল প্রশাসনের অনুমতি ব্যতিরেকে মধুপুর-ধনবাড়ী নওয়াব আলী মঞ্জিল ও প্যালেসকে প্রমোদ এবং পিকনিক স্পটে পরিণত করা হয়েছে। এই স্টেট হতে বিপুল পরিমাণ আয় হলেও লক্ষ লক্ষ টাকা ফাঁকি দিয়ে সরকারকে প্রতি বছর মাত্র ৪ হতে ৬ হাজার টাকা আয় কর দেয়া হচ্ছে। টাঙ্গাইল জেলার জন্য কোন ওয়াক্ফ অফিস নেই। ১’শ কি: মি: ময়মমসিংহ ওয়াক্ফ জোনাল অফিস হতে টাঙ্গাইল জেলা সদর। ময়মনসিংহ ওয়াক্ফ জোনাল অফিস থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা এ সকল জেলার ওয়াক্ফ স্টেটগুলো দেখাশুনা আইনগত তদন্ত ও পরিদর্শকরা পরিদর্শন চালাচ্ছেন। কিন্তু কর্মকতার অভাবে সেটি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন হচ্ছে না। অনেক দিন হয় জেলার ওয়াক্ফ স্টেট গুলোতে সরকারিভাবে পরিমাপ করা হয়নি। স্টেটের প্রকৃত আয়-ব্যয় মালিকানা মনিটরিং না করায় অনেক মুতাওয়াল্লী রাজস্ব আয় কর ফাঁকি দিচ্ছে। প্রভাবশালীরা ওয়াক্ফ সম্পত্তি নানা ছুতায় জবর দখল করেছ।

ভূঞাপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেলা আ’লীগ সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ্ব এ্যাডভোকেট মো. আব্দুল হালিম ও ঘাটাইল উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আ’লীগের আহ্বায়ক মো. শহিদুল ইসলাম লেবু প্রতিনিধিকে জানান, জবর দখল ঠেকাতে ওয়াক্ফ প্রশাসনের আইনগত কোন ভূমিকা না রাখায় টাঙ্গাইল জেলার কোটি কোটি টাকার ওয়াক্ফ জমি প্রভাবশালীরা জবর দখল করে নিচ্ছে। বাধা দিলে মুতাওয়াল্লীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। জেলার অনেকেই টাঙ্গাইলে একটি ওয়াক্ফ শাখা অফিস স্থাপন, জরিপের মাধ্যমে ওয়াক্ফ স্টেটের হাল নিরূপন, স্টেটগুলোকে রেজিস্ট্রেশন করতে বাধ্যকরণ এবং বে-দখল হওয়া সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য সরকার প্রধান ও ওয়াক্ফ মহা-পরিচালক বরাবরে এ দাবি জানান।

ময়মনসিংহ জোনাল ওয়াক্ফ অফিসের একজন কর্মকর্তা মুঠো ফোনে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক স্মৃতি চিহ্নগুলোকে সংরক্ষণের স্বার্থেই ওয়াক্ফ সম্পত্তি বেহাত মুক্তি করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল জেলার ওয়াক্ফ সম্পত্তির বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশ হলেও অদ্যবদি নেই কোনো সরকারিভাবে পদক্ষেপ। টাঙ্গাইল জেলার সুধী মহল জরুরী ভিত্তিতে ওয়াক্ফ সম্পত্তির বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।