মঙ্গলবার,২৪শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নেয়ামতের ঋতু হেমন্ত

মুক্তখবর :
নভেম্বর ১২, ২০২০
news-image

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১২ নভেম্বর ২০২০ (ফিচার ডেস্ক): বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এখন বিরাজ করছে স্বর্ণঋতু হেমন্ত। ঋতুরানী শরতের প্রস্থানের পরই হিমবায়ুর পাল্কি চড়ে হালকা কুয়াশার আঁচল টেনে আগমন হয় হেমন্তের। কার্তিক আর অগ্রহায়ণ, এই দুমাস একান্তই হেমন্তের। এ সময় বাংলার আকাশে, বাতাসে, বৃক্ষ চরাচরে ছড়িয়ে পড়ে হেমন্তের সুন্দর রূপবিভা। দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠে নির্মল হাওয়ার মৃদু তরঙ্গে নেচে ওঠে স্বর্ণোজ্জ্বল ধান ক্ষেত। পাকা ধানের সোনালি রং দেখে কৃষকের তনুমনে জেগে ওঠে আনন্দের হিল্লোল। উঠোনভরা সোনালি ধানের স্তূপ হৃদয়ে বয়ে আনে প্রশান্তির বান। সেই বানের জোয়ারে মনের দুয়ারে অদৃশ্য অসীমের যে প্রেমের প্রতিফলন ঘটে, সেই প্রেমের সুরতরঙ্গে অন্তর গেয়ে ওঠে ‘শুকরিয়া জানাই আল্লাহ, শুকরিয়া জানাই তোমার।’

এই যে এত অনুকম্পা ও নেয়ামত, এ সবকিছু তো তারই কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। তিনিই আপন কুদরতে শক্ত মাটির বক্ষ চিড়ে অক্ষতাবস্থায় এই ফসল আর ফলফলাদির ব্যবস্থা করেছেন। যা তিনি পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায়ই জানিয়ে দিয়েছেন মানুষের জন্য। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমি তো অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করেছি। অতঃপর মাটিকে বিদীর্ণ করেছি। আর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্যাদি, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, বহু বৃক্ষ বিশিষ্ট বাগান, ফল-ফলাদি ও ঘাস। এসব তোমাদের ও তোমাদের পালিত পশুকুলের জীবন ধারণের জন্য।’ (সুরা আবাছা, আয়াত : ২৪-৩২)

হেমন্ত মানেই নব উচ্ছ্বাস। নব সুর ও নব শিহরণ। হেমন্তের নব জাগরণে কাননে কাননে ফোটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, পদ্ম, হাসনাহেনা, হিমঝুরি, দেবকাঞ্চন, রাজ অশোকসহ নানান রং ও ঘ্রাণের অসংখ্য জাতের ফুল। সেসব ফুলের পাপড়ি ও গাছের পাতায় ভোরের মৃদু শিশিরের স্পর্শ জানিয়ে দেয় শীত আসছে। তাই হেমন্তকে বলা হয় শীতের পূর্বাভাস। হেমন্তের ব্যস্ত দুপুরে মাঠ থেকে সোনালি ফসল ঘরে তুলে আনার দৃশ্য, নয়া ধানের ম ম গন্ধে কৃষাণীর ব্যস্তমুখর ক্ষণ, কিশোর-কিশোরীদের মেতে ওঠা ডাংগুলি, গোল্লাছুট আর বৌচি খেলা, শেষ বিকেলে রাঙানো পশ্চিম আকাশের মতো এমন শিল্পিত দৃশ্য দাগ কেটে যায় কবিদের মনে। তাদের ভাবুক মনে জেগে ওঠে অফুরন্ত কল্পনাশক্তি। তাইতো সবসময়ের কবিদের থেকে শুরু করে আজকের কবিরাও এই হেমন্তকে নিয়ে লিখেছেন এবং লিখে যাচ্ছেন উদারচিত্তে।

হেমন্তের আগমনী, এর প্রকৃতি ও স্বভাবের এক চঞ্চল রূপ এঁকেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘অঘ্রাণের সওগাত’ কবিতায়। তিনি লিখেছেন

‘ঋতুর খাঞ্চা ভরিয়া এল কি ধরণীর সওগাত?

নবীন ধানের অঘ্রাণে আজি অঘ্রাণ হলো মাৎ।…

…মাঠের সাগরে জোয়ারের পরে লেগেছে ভাটির টান।

রাখাল ছেলের বিদায়-বাঁশীতে ঝুরিছে আমন ধান!

কৃষক-কণ্ঠে ভাটিয়ালী সুর

রোয়ে রোয়ে মরে বিদায়-বিধুর!

তিনি এই কবিতায় শুধুমাত্র হেমন্তের প্রকৃতির ছবিই আঁকেননি, একই সঙ্গে পারিবারিক সংস্কৃতির চিত্রও তুলে ধরেছেন। নজরুল হেমন্তের দিনের চেয়ে রাতের সৌন্দর্যেই যেন বেশি মোহিত হয়েছেন সে চিত্রই যেন ফুটে উঠেছে তার এই পঙ্ক্তিতে

‘চাঁদের প্রদীপ জ্বালাইয়া নিশি জাগিছে একা নিশীথ

নতুন পথের চেয়ে চেয়ে হল হরিৎ পাতারা পীত।’

হেমন্ত মানেই হচ্ছে নবান্নের আনন্দ। একটা সময় ছিল যখন নবান্নের উৎসবে গ্রামবাংলার লোকেরা মেতে উঠতেন। ধনী-গরিব সবাই মিলে অগ্রহায়ণের প্রথম বৃহস্পতিবার পালন করতেন নবান্নের উৎসব। গাঁয়ের বধূরা গুড়, নারিকেল, কলা, দুধ প্রভৃতির সঙ্গে নতুন আতপ চাল মিশিয়ে ক্ষীর রাঁধতেন। জনে জনে তা বিলাতেন। এতে করে ধনী-গরিব সবার মধ্যে তৈরি হতো সম্প্রীতির এক নতুন বন্ধন। কিন্তু তা যেন আজ কালের গর্ভে বিলীন হওয়া শুধুই অতীত। অথচ কল্যাণের ধর্ম ইসলামে কিন্তু এই রকম আনন্দোৎসবে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘হে হাবিব! বলুন, যখন আল্লাহর অনুগ্রহ, রহমত, সম্মান ও করুণা অর্জিত হয়, তখন তারা যেন আনন্দোৎসব করে।’ (সুরা ইউনুস, আয়াত : ৫৮)

তবে কথা হচ্ছে, এই উৎসবের ব্যাপারে আমাদের খুব সচেতন থাকতে হবে। কোনোভাবেই যেন তা সীমালঙ্ঘন না করে। কেন না ইসলাম সে উৎসবকেই উৎসাহিত করে যে উৎসব মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।

এ কথা প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে খুব ভালো করে গেঁথে নিতে হবে যে, আমরা জমিনে যে বীজ রোপণ করি সেই বীজ থেকে চারা গজানো, ভূ-গর্ভস্থ থেকে সেচ, শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ, প্রত্যেকটি কাজই হয় আল্লাহতায়ালার অপার কুদরতি ব্যবস্থাপনায়। যেমনটি আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা যে বীজ বপন করো সে সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি? তোমরা তা থেকে উৎপন্ন করো, না আমি উৎপন্ন করি? ইচ্ছা করলে, আমি তা খড়কুটা করে দিতে পারি। অতঃপর তোমরা হয়ে যাবে হতভম্ব।’ (সুরা ওয়াকিয়া, আয়াত : ৬৩-৬৫)।

অতএব, উৎসবের নামে কুসংস্কারে না জড়িয়ে, বরং এই নবান্নের উৎসব পালিত হোক মহান আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপনের মাধ্যমে। আর এটাই হবে প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘যদি তোমরা আমার অনুগ্রহ বা নেয়ামত প্রাপ্তির শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেওয়া হবে, আর অকৃতজ্ঞ হলে কঠিন আজাবে (শাস্তিতে) নিপতিত করা হবে।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ০৭)