বৃহস্পতিবার,২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

স্মরণীয়-বরণীয়: অবিসংবাদিত নেতা  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

মুক্তখবর :
ডিসেম্বর ২৪, ২০২০
news-image

-মো. আলতাফ হোসেন-
শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বাঙালির অধিকার রক্ষায় যিনি ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত বিভাজন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কেন্দ্রীয়ভাবে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন অর্জনের প্রয়াস এবং পরবর্তীকালে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেছনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে মুজিবকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে কৃতিত্ব দেওয়া হয় এবং পাশাপাশি প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। এসকল কারণে, তাঁকে বাংলাদেশের “জাতির জনক” বা “জাতির পিতা” হিসেবে গণ্য করা হয়। জনসাধারণের কাছে তিনি “বঙ্গবন্ধু”,নামেই অধিক পরিচিত।  শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্ভুক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের বাইগার নদীতীরবর্তী টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান শেখ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। শেখ বোরহানউদ্দিন এই বংশের গোড়াপত্তন করেন। শেখ মুজিবের বাবা শেখ লুৎফুর রহমান, যিনি গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার (যিনি আদালতের হিসাব সংরক্ষণ করেন) ছিলেন, এবং মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। চার কন্যা এবং দুই পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শেখ মুজিবুর রহমানের বড় বোনের নাম ফাতেমা বেগম, মেজ বোন আছিয়া বেগম, সেজ বোন হেলেন ও ছোট বোন লাইলী এবং তাঁর ছোট ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের। “শেখ মুজিবুর রহমান” নামকরণটি করেন তাঁর নানা শেখ আবদুল মজিদ। শেখ মুজিবুরের ছোটবেলার ডাকনাম ছিলো “খোকা”।
১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে শেখ মুজিব যখন তাঁর সাত বছর বয়স তখন গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। নয় বছর বয়সে ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে গোপালগঞ্জ পাবলিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। পিতার বদলিসূত্রে ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চতুর্থ শ্রেণিতে মাদারীপুর ইসলামিয়া বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বেরিবেরি নামক জটিল রোগে আক্রান্ত হন এবং তাঁর হৃৎপিন্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর চোখে গ্লকোমা ধরা পড়ে। ফলশ্রুতিতে, তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার করাতে হয় এবং এ থেকে সর্ম্পূূরূপে আরোগ্যলাভ করতে বেশ সময় লেগেছিলো। এ কারণে তিনি ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত চার বছর বিদ্যালয়ের পাঠ চালিয়ে যেতে পারেননি। তিনি ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সুস্থ হবার পর গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ সময়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়কর্মী এবং বহু বছর জেল খাটা কাজী আবদুল হামিদ (হামিদ মাস্টার) নামে একজন ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমানের গৃহশিক্ষক ছিলেন। পরবর্তীকালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে তিনি ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন।
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময় থেকে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক জীবনের শুরু হয়েছিলো। ঐ বছরই বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসেন তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং খাদ্যমন্ত্রী ও পরবর্তীকালে বাংলা ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী হোসেন শহীদ সোহ্?রাওয়ার্দী। ঐ সময় বিদ্যালয়ের ছাদ সংস্কারের দাবি নিয়ে একটি দল তাঁদের কাছে যায়। দলটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেখ মুজিব স্বয়ং। ব্যক্তিগত রেষারেষির জেরে ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার করা হয়। ৭ দিন হাজতবাস করার পর তিনি ছাড়া পান। একই বছর তিনি গোপালগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি এবং মহকুমা মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন। এ সময়ে তিনি এক বছর মেয়াদের জন্য নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কাউন্সিলর জন্য নির্বাচিত হন।
পাকিস্তানের নতুন সরকার গঠন বিষয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে শেখ মুজিবের আলোচনা বিফলে যাওয়ার পর ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকা শহরে গণহত্যা চালায়। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। একই রাতে তাঁকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার রহিমুদ্দিন খান সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করলেও, তা কার্যকর করা হয়নি। নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়।
পৃথিবীতে কিছু রাজনীতিবিদ আছেন যাদের নামের সঙ্গে তাঁর দেশ একাত্ম হয়ে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলা, চিনে মাও সেতুং, রাশিয়ায় লেনিন, ভিয়েতনামে হো চি মিন, তুরস্কে কামাল আতাতুর্ক, যুগোশ্লাভিয়ায় মার্শাল টিটো আর বাংলাদেশে শেখ মুজিবুর রহমান। এসব দেশের নাম আসলে অবধারিতভাবেই এসব ব্যক্তির নামও আসে। এসব ব্যক্তির দীর্ঘ সংগ্রাম ও বিপ্লব, ত্যাগ এবং আপসহীন মানসিকতার কারণেই পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিয়েছে দেশগুলো। মৌলিক জায়গায় মিল থাকলেও এদের একেকজনের ভূমিকা একেক ধরনের। বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের ব্যপ্তি ও বৈশিষ্ট স্বতন্ত্র। বাঙালি এমন এক জাতি যারা বারবার পরাধীন ছিলো। কখনো ব্রিটিশ, কখনো মুঘল আর সর্বশেষ পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা শোষিত হয়েছে তারা। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি শুরু হয়েছিলো পাকিস্তানি শাসনের বাস্তবতা মেনেই কিন্তু ভারত ভেঙে পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি যখন দেখলেন ধীরে ধীরে কেড়ে নেয়া হচ্ছে বাঙালির অধিকার, চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে শোষণ-বঞ্চনার জগদ্দল পাথর, তিনি অন্যভাবে চিন্তা করলেন। তাঁর সুপ্তচিন্তা স্বাধীন বাংলাদেশের সত্তা আস্তে আস্তে প্রসারিত হতে শুরু করলো। সে অনুযায়ী তিনি পদক্ষেপও নিতে শুরু করলেন। যার ছাপ আমরা দেখি মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন ও পরে তা ভেঙে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা এবং ছয় দফার ঘোষণায়। তাঁর লক্ষ্যে তিনি ছিলেন অবিচল, অটল। তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা একে একে অনেকেই তাঁকে ছেড়ে যান। কেউ কেউ ভিন্ন দল গঠন করে তাঁর বিরোধিতাও করেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু পিছ পা হননি। সে অর্থে তাঁকে প্রথমে লড়তে হয়েছে তাঁর রাজনৈতিক সহযাত্রীদের সঙ্গেই। আর পরে পাকিস্তানিদের সঙ্গে। ঘরের শত্রুদের জয় করেই বাইরের শত্রুদের তাড়াতে হয়েছে তাঁকে। এর আরও সুস্পষ্ট প্রমাণ দেখা যায়, যখন ছয় দফার প্রশ্নে তাঁর নিজ দলেই বিভেদ তৈরি হয়। জাতির পিতা তাঁর আত্মজীবনীতে সে কথা নিজেই লিখে গেছেন।
শেখ মুজিবুর রহমান এখনো আওয়ামী লীগের আদর্শগত প্রতীক হয়ে আছেন এবং দলটি মুজিবের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা ধারণ করে চলেছে। তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রচারণায় যে কোট পরতেন, সেটিকে “মুজিব কোট” নামে ডাকা হয় এবং আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলের রাজনীতিবিদগণ আনুষ্ঠানিকভাবে মুজিব কোট পরিধান করে থাকেন। শেখ মুজিবুরের আদর্শে অনুপ্রাণিত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীবৃন্দ নিজেদের মুজিব সেনা বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করে। তিনি বাংলাদেশ, ভারত ও বিশ্বের বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং গোষ্ঠীগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও বাঙালিদের আন্দোলনকে স্বাধীনতার পথে ধাবিত করার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত।
বাংলাদেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে যার প্রায় সবই শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা। মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম উৎক্ষেপিত কৃত্রিম উপগ্রহ “বঙ্গবন্ধু-১” এর নামকরণ শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু যমুনা বহুমুখী সেতুর নাম “বঙ্গবন্ধু সেতু”। এছাড়াও ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে গুলিস্তানে অবস্থিত বাংলাদেশের জাতীয় স্টেডিয়াম “বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম”। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার শেরে বাংলা নগরের আগারগাঁওয়ে অবস্থিত চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের নাম “বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র” নামে পুনর্বহাল করা হয়। “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার”।“বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়”। “শেখ মুজিব সড়ক” নামে চট্টগ্রাম শহরের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদের প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির একটি সড়কের নাম “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মার্গ” রাখা হয়। কনট প্লেসের নিকটবর্তী স্থানটি ইতোপূর্বে “পার্ক স্ট্রিট” নামে পরিচিত ছিলো। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন “বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ” নামে একটি আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগকে (বিপিএল) “বঙ্গবন্ধু বিপিএল” নামে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। এছাড়াও মুজিব বর্ষ উপলক্ষে শেখ মুজিবের নামে ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের বাংলাদেশ গেমসের ৯ম আসরের নামকরণ “বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমস” করা হয়।
পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেই একটি জাতিকে জন্ম দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল সুযোগ পেতে দেখা যায়। রক্তস্নাত মহান মুক্তিযুদ্ধের সুযোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রতিষ্ঠাতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা। তাঁর দীর্ঘদিনের নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ তথা পাকিস্তানি আধিপত্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছে আমাদের স্বদেশ ভূমিকে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্যোক্তা বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন আদর্শে জাতীয়তাবাদী ও বিশ্বাসে গণতন্ত্রী। তাই তো তিনি কর্মী থেকে হয়েছেন নেতা, আর নেতা থেকে হয়েছেন জননেতা, জননেতা থেকে হয়েছেন জাতির জনক। অতুলনীয় এই মহানায়ক রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে একটি দলের নেতা থেকে হয়েছেন দেশনায়ক,রাষ্ট্রনায়ক।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালিদের অবিসংবাদিত ও একক নেতা। যার কালজয়ী নেতৃত্ব ছিলো বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস এবং বহু দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বা নেতৃত্বের চেয়ে ভিন্নতর। ৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী ও স্বাধিকার এবং স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত পর্যায়ক্রমিক আন্দোলনের তিনি ছিলেন পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ নায়ক।
বিশ্ব ইতিহাসে সর্বোচ্চ নৃশংস ও জঘন্যতম বর্বর হত্যাকান্ডের এক নজিরবিহীন যন্ত্রনাকাতর দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। পাকিস্তান কোনো দিনই চায়নি বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। চক্রান্ত তারা নানাভাবেই করেছে। ফলে এদেশীয় পাক দোসরদের নির্মমতায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হয়ে ওঠে বাঙালি ইতিহাসে কালিমাদিপ্ত একটি শোকাবহ দিন। এই দিন বাঙালির বাংলাদেশের স্থপতি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের অনেক সদস্যকে হত্যা করেন দেশের কুচক্রী কিছু সেনাসদস্য। কিন্তু দেশের জন্য তাঁর ভালোবাসা আর কালজয়ী নেতৃত্ব যুগে যুগে তাঁকে করে তুলেছে এক অবিসংবাদিত নেতা। তাঁর শৈর্যে, বীর্যে, চেতনায়, নেতৃত্বে বাঙালি আজো তাঁকে স্মরণ করেন শ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ঐতিহাসিক ক্ষণজন্মা এক মহান পুরুষ। তাই তাঁকে স্বাধীনতার প্রতীক বা রাজনীতির কবি খেতাব ছাড়াও নানাভাবে অ্যাখ্যায়িত করেছেন অনেকে। বিদেশি ভক্ত, কট্টর সমালোচক, এমনকি শত্রুরাও প্রশংসা করেছেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ববোধ ও নেতৃত্বের।
১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘পৃথিবী আজ দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগে শোষক শ্রেণি, আরেক ভাগে শোষিত। আমি শোষিতের দলে।’ ওই ভাষণের পর কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেছিলেন, ‘তুমি আজ যে ভাষণ দিলে, এখন থেকে সাবধানে থেকো। আজ থেকে তোমাকে হত্যার জন্য একটি বুলেট তোমার পিছু নিয়েছে।’ ফিদেল কাস্ত্রোর সেদিনের কথাটিই সত্য হয়ে যায় ঠিক দুই বছরের মাথায়। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্টের ভোরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাংলাদেশের স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী ও উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক অফিসারদের হাতে স্বপরিবারে নিহত হন। আর এই খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে বিশ্বসম্প্রদায়। শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার খবরটি শুনে স্তম্ভিত বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধু হত্যায় তাঁদের প্রতিক্রিয়ায় দীর্ঘশ্বাসের পাশাপাশি হৃদয় নিংড়ানো মন্তব্য করেছেন। বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন- ‘আমি হিমালয় দেখিনি, বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারাল তাদের একজন মহান নেতাকে, আমি হারালাম একজন অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন- ‘শেখ মুজিব নিহত হওয়ার খবরে আমি মর্মাহত। তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তাঁর অনন্য ও অসাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য প্রেরণাদায়ক ছিলো।’ হত্যাকারীদের কাছে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচরদের একমাত্র অপরাধ ছিলো বাংলাদেশের সৃষ্টি। এ কথা যাঁরা বোঝেন না, তাঁদের বোঝাতে চাওয়া বৃথা। যাঁরা বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার চেষ্টা করেন কিংবা আরো বড় করতে গিয়ে ছোট করে ফেলেন, তাঁদের জানতে হবে, ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু অমরত্ব লাভ করেছেন, তিনি যা তিনি তাই, তাঁর আসন ধূলিমলিন হবার নয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির ইতিহাসে অন্ধকারতম দিন। বাঙালি জাতি এই দিনটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করে এবং সাথে সাথে স্মরণ করে বিশাল হৃদয়ের সেই মহাপ্রাণ মানুষটিকে যিনি তাঁর সাহস, শৌর্য, আদর্শের মধ্য দিয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন বাঙালি জাতির অন্তরে।
লেখক : গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট