রবিবার,১৭ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

হয়তো সেই বৃদ্ধা ও তার বিধবা কন্যার দোয়ায় আমার সন্তান বিশ্বের সর্ববৃহৎ গবেষণাগারের গবেষক

মুক্তখবর :
ডিসেম্বর ২৭, ২০২০
news-image

-এড. এম এ মজিদ-

আজ থেকে প্রায় ২০ বছর পূর্বের একজন অন্ধবৃদ্ধা ও তার বিধবা কন্যার একটি ঘটনা হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় আজকের এই লেখা। ২০০০ সালের অতীত স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি স্মরণীয় ঘটনা আমার স্মৃতিপটে ভেসে উঠলো। এগুলোর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো; পরপারে আমার পিতার চিরবিদায়, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এবং একজন অন্ধবৃদ্ধা ও তার বিধবা কন্যার প্রার্থনা কবুলের স্মৃতি। আজ থেকে ২০ বছর পূর্বে অর্থাৎ ২০০০ সালে আমি শুধু দিনাজপুর জেলারই নয়, বরং সাংবাদিকতার জগতে সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যেই এক আলোকিত, আলোচিত ও আলোড়িত সাংবাদিক হিসেবে অতি সুপরিচিত ছিলাম। ২০০০ সালের ২২ নভেম্বর আমার পিতার মৃত্যুর দুই দিনের মাথায় ২৪ নভেম্বর সারা দেশের সাংবাদিকদের প্রত্যক্ষ ভোটে আমি জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হই। জাতীয় সাংবাদিক সংস্থাকে পুনর্গঠিত ও চাঙ্গা করার জন্য আমি সমগ্র বাংলাদেশের সকল জেলাতে তো গিয়েছি, এছাড়াও দেশের অর্ধেকের বেশি উপজেলাগুলোতে একনাগারে তিন মাস মাইক্রোবাসযোগে ঘুরেছি সাংবাদিকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ, মতবিনিময়, সংগঠনের শাখা গঠন, পূনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবিত করণের লক্ষ্যে। আমার সঙ্গে মাইক্রোবাসে ৯ জন সফরসঙ্গীকে সবসময়ই থাকতেন। তবে একনাগাড়ে তিন মাসের সফরসঙ্গী হিসেবে কাউকে না পেলেও ঘুরেফিরে তাদেরকেই অকৃত্রিম ও আন্তরিকভাবেই পেয়েছিলাম। আমি সেসময়ের পূর্বেই জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের নির্বাচিত সহ-সভাপতি তো ছিলামই, উপরন্তু কেন্দ্রীয় ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন ও প্রতিনিধি সম্মেলনকে সফল করার জন্য সর্বসম্মতিক্রমে আমাকেই আহবায়ক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল।এছাড়াও সেসময় আমি অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত ছিলাম। এগুলোর মধ্যে দিনাজপুর শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্হিত দিনাজপুর হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বটা খুবই চ্যালেঞ্জিং হিসেবে গ্রহন করেছিলাম। দায়িত্ব গ্রহনের এক মাসের মধ্যেই স্কুলের ১৫১টি সমস্যা চিহ্নিত করে পরবর্তীতে একের পর এক সবগুলো সমস্যা সমাধান করাসহ আরো অনেকে বেশি কাজ করে স্কুলটিকে শুধু দিনাজপুর জেলার মধ্যেই নয়, বাংলাদেশের বেসরকারি বিদ্যালয়ের মাধ্যে সেরা ও মডেল স্কুলের স্বীকৃতি সেসময়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্বশরীরে এসে উপস্থিত হয়ে দেখে-শুনে-বুঝে এই স্বীকৃতির সার্কুলার জারি করেছিলেন।
দিনাজপুর উচ্চ বিদ্যায়ের দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকে কোনো ঈদেই আমার নিজবাড়ি, শ্বশুরবাড়ি বা আত্মীয়স্বজদের বাসায় আমার যাওয়া, থাকা বা বেড়ানোর সুযোগ হয়নি। কেননা, ঈদের দিন ও তার পরের দিন দু’টিতে আমি দিনাজপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোঃ মিজানুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে বেড়িয়ে পরতাম আমাদের স্কুলের ৫ম শ্রেণি ও ৮ম শ্রেণির বৃত্তি এবং এসএসসি’র পরীক্ষার্থী প্রতিটি ছাত্র ও ছাত্রীর বাসায় গিয়ে তাদেরকে পিতার ন্যায় আদর-ভালবাসা বিনিময় করতাম, সেই সাথে তাদেরকে চরম মমতা ও পরম আদর করে তাদেরকে পরীক্ষায় অনেক ভালো ফলাফল করে আগামী দিনে তাদেরকে ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট, ডাক্তার, অ্যাডভোকেট, রাজনীতিবিদ, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার কর্ণধার হওয়ার স্বপ্নও দেখাতাম।
২০০০ সালের রোজার ঈদের ২০ দিন পূর্বে আমি আমার সহধর্মিণী জেসমিনকে বল্লাম, এবারের ঈদে তোমাকে কি দিতে হবে? সে খুব বিনয়ের সাথে কাচুমাচু হয়ে খুব নিচু স্বরে বল্লো, যদি তোমার অসুবিধা না হয় তাহলে আমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিলে খুব ভালো হতো। আমি কোনো বিলম্ব না করেই আমার কাছে থাকা পাঁচ হাজার টাকা তাৎক্ষণিক তাকে দিয়ে তার দৃষ্টির আড়ালে গিয়ে গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম, বিয়ের পর প্রতিটি ঈদে, জন্মদিনে ও বিবাহ বার্ষিকীতে তাকে এ ধরণের প্রস্তাব আমি দিয়েছি, কিন্তু কখনই সে কিছুই চায়নি, বরং হাসিখুশি মুখে বিনয়ের সাথে আমার প্রস্তাব অগ্রাজ্য করেছে। অথচ এবারে পাঁচ হাজার টাকা চাইলো, কারণটা কি হতে পারে – এটাই তখন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। অন্যান্যবারের ন্যায় ২০০০ সালে আমার গিন্নী আমাকে শেমাই, পায়েশ ও চা খওয়ানোর পর ঈদের জামাতে নামাজ পড়ার জন্য আমার হাতে জায়নামাজ ধরিয়ে দিয়ে আমাকে কদমবুসি করে একটা মিষ্টিহাসি দিয়ে খুব বিনয়ের সাথে অনুরোধ করে বল্লো, আমাকে কথা দাও, তুমি আমার ওপর রাগ করবে না? বল্লাম, এত ঢং না করে বলেই ফেলÑকি বলতে চাও। সে বললো, আজ দুপুরে তুমি আধা ঘণ্টার জন্য আমার সাথে এক যায়গায় যাবে। মনে মনে একটু বিরক্ত হলেও ঈদের দিন মনে করে সেটি প্রকাশ না করে তার প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে দিলাম। কিন্তু মনে মনে ভাবলাম আজ ৪/৫ জন শিক্ষার্থীর বাসায় যেতে পারবো না, সেজন্য মনে মনে একটু বিরক্তও হয়েছিলাম বৈকি! আধা ঘন্টার জন্য দুপুরে বাসায় এলে গিন্নীর নিজ হাতে রান্না করা সকল খাওয়ার আমাকে যতœসহকারে খাওয়াচ্ছে আর দুটি টিফিন ক্যারিয়ারে অনেক পোলাও মাংস শেমাই ফিরনী যা যা আছে সব কিছুই ঠেসে ঠেসে ভরছে। আমি মনে মনে আশ্চর্য ও বিস্মিত হলাম এজন্য যে, বাপের বাড়ির প্রতি মেয়েদের টান ও পক্ষপাতিত্বটা একটু বেশিই থাকে! কিন্তু রিক্সাওয়ালার সাথে আমার গিন্নী যেখন ভাড়া নির্ধারণ করছে, তখন আমার চোখ কপালে। কেননা, সে যাবে আমার শ্বশুরালয় বালুয়াডাঙ্গায়, আর সে কি-না রিক্সা ভাড়ার দরদাম করছে কাঞ্চন কলোনীতে যাওয়ার জন্য।
আমি কথা না বাড়িয়ে তার সাথেই চলছি। রিক্সাটি থামানো হলো চাউলিয়াপট্টিস্হ কাঞ্চন কলোনীর শেষ প্রান্তের একটি নতুন দোচালা টিনের ঘরের সামনে। বাসার ভিতরে গিয়ে দেখলাম, বেশ হাসিখুশি ৪০/৪১ বছরের বছরের এক বিধবা মহিলাকে। সে মাঝেমধ্যেই আমাদের বাসায় এসে ঠেকাকাজ করে দিয়ে চলে যায়। তাকে আমি এভাবেই এতটুকু চিনি।আমাদেরকে দেখে সে যেন আকাশের চাঁদকে হাতের মুঠোতে পেলে যেমনটি খুশি ও উৎফুল্ল দেখা যায়Ñ তার চাইতেও বেশি হাসিখুশির উৎফুল্লতা সেই বিধবা মহিলার চোখেমুখে দেখতে পেলাম। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে সৈয়দপুরের বিহারীরা পাকিস্তানি সেনাদের সাথে এক হয়ে বাঙ্গালীদের নির্বিচারে হত্যা করছিল, এই সংবাদটি দিনাজপুরে এসে পৌঁছালে দিনাজপুরে শুরু হয় বিহারী নিধন কর্মযজ্ঞ। ১৯৭১ সালে সেই বিধবা মহিলাটি ১০ বছরের সদা হাস্যোজ্জল নাবালিকা বালিকা ছিল। সেই ১০ বছরের নাবালিকা মেয়েটির বিয়ের শুধু কাবীনই হয়েছিল ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ছয় মাস পরে তাদের বিয়ের বিদায় অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে তার বাবা ও স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করাসহ তার মাকে খুচিয়ে দুই চোখ নষ্ট করে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে বাসা লুটপাট শেষে অগ্নিসংযোগ করে চলে যায় দূর্বৃত্তরা। কিন্তু দূর্ভাগাক্রমে বেঁচে যায় তার অন্ধ মা এবং সেই ১০ বছরের সুন্দরী নাবালিকা বালিকাটি। পরবর্তীতে সুন্দরী বিধবার বিবাহের জন্য অনেক ভালো ভালো প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু সে বিবাহে রাজী হয়নি এজন্য যে, তার বিয়ে হয়ে গেলে তার অন্ধ ও সহায়সম্বলহীনা মাকে কে দেখবে! নিচু বাড়ির নিচু বারান্দা দিয়ে মাথা নিচু করে ঘরে প্রবেশ করতেই দেখলাম, এক অন্ধবৃদ্ধা লাঠি ছাড়াই তার দুহাত এদিক ওদিক হাতাতে হাতাতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেÑ আর আধা বাংলা ও উর্দু মিশিয়ে তার বিধবা মেয়েকে উদ্দেশ্যে করে বলছে, আমার বাবা-মা কোথায়? যারা আমাকে এত কিছু দেয়, ভালো ভালো খাবার পাঠায়, আমরা বৃষ্টিতে ঘরে বসে ভিজিÑ সেজন্য আমাদেরকে নতুন টিন দিয়ে এই নতুন ঘর করে দিয়েছেÑ তারা কোথায়? তাদের কাছে আমাকে নিয়ে চল। সেই অন্ধবৃদ্ধা মা আরও অনেক কিছু বির বির করে বলেই চলেছিল। আমার গিন্নী দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরে পাশে বসিয়ে সেই বৃদ্ধার হাত-মুখ ধুয়ে দিয়ে পরম মমতা ও চরম যতœসহকারে অনেকটা জোর করেই একটু একটু করে বেশ অনেকটাই খাইয়ে দিয়ে পানি দিয়ে মুখ ধোয়ানোর পর নিজের শাড়ির আঁচল দিয়েই বৃদ্ধার মুখ মুছে দিল। অন্ধবৃদ্ধা পরমানন্দে পশ্চিমমুখী হয়ে দু’হাত তুলে চোখের পানিতে মুখ ও বুক ভিজিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমাদের জন্য আল্লাহর কাছ থেকে জোর করেই বিশ্বের সর্বোচ্চ সুখ, শান্তি, সম্মান ও মর্যাদা আদায় করে নিচ্ছিল বলেই আমার মনে হচ্ছিল। আরো মনে হচ্ছিল, হে আল্লাহ তুমি আমার প্রতি খুবই সন্তুষ্ট ও সহানুভূতিশীল বলেই এমন ভালো, নিশ্পাপ, নিরংকার, ধার্মিক, দয়ালু, বড়মন ও বড়মাপের একজনকে আমার স্ত্রী হিসেবে নিয়ামত দান করেছ। সে আজ পর্যন্ত আমার কাছে কখনো কোনো ঈদ বা পর্বে কোনো কিছুই চায়নি বরং তার গহনাগাঁটি আমার চরম দূঃসময়ে অকাতরে আমাকে দিয়ে দিয়েছে এবং কোনদিন ফেরতও চায়নি, সেই বউ আমার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা অতি বিনয়ের সাথে চেয়ে নিয়ে এই অসহায? অন্ধবৃদ্ধা ও তার বিধবা কন্যার জন্য একটি টিনের ঘর নির্মাণ করে দিয়ে কি বিশাল মহৎ কাজটাই না সে করে দিয়েছে, আমি কতই না ভাগ্যবান স্বামী!
আজ কেন যেন বার বার মনে পড়ছে সেই অন্ধবৃদ্ধা ও তার বিধবা কন্যার কথা। হয়তো সেই অন্ধবৃদ্ধা ও তার বিধবা কন্যার দোয়া ও কান্না সেদিন আল্লাহপাক কবুল করেছিলেন বলেই আজ আমার একমাত্র সন্তান ড. ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল কাদের সাগর বিশ্বের চিকিৎসা-প্রকৌশল বিজ্ঞানে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ চিকিৎসা গবেষণাগার যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের অধীনে ন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অব হেলথ (এন.আই.এইচ) এর বায়োইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ফেলো হিসেবে অফার পাওয়ার পর সেখানেই যোগদান করে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে – বিশ্বের মানব কল্যাণে নতুন কিছু দেওয়ার লক্ষ্যে।
টিকাঃ অসহায়দের জন্য মন থেকে কিছু করলে আল্লাহপাক তার জন্য অনেক বেশি প্রতিদান দিয়ে থাকেন-এটা আল্লাহর ওয়াদা। নিচের প্রথম ছবিটি ১৯৮৫ সালের ২২ জুলাই বিয়ের আকদ অনুষ্ঠানের, বৌভাত অনুষ্ঠান হয়েছিল ২২ ডিসেম্বর ১৯৮৫ সালে। দ্বিতীয় ছবিটি করোনাকালীন ২০২০ সালের ২২ জুলাই বিবাহের ৩৫তম বিবাহ বার্ষিকীতে নিজঘরে তোলা ছবি।

-লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের এ্যাডভোকেট, জাতীয় সাংবাদিক সোসাইটি এবং ওয়ার্ল্ড পীস এন্ড হিউম্যান রাইটস্ সোসাইটির চেয়ারম্যান।