বুধবার,২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

স্মরণীয়-বরণীয়: বাংলা সাহিত্যের এক বিদগ্ধ প্রতিভা মীর মশাররফ হোসেন

মুক্তখবর :
ডিসেম্বর ৩০, ২০২০
news-image

-মো. আলতাফ হোসেন-

সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন একজন বাঙালি ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী ও বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ। কারবালার যুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত বিষাদ সিন্ধু তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম।  তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে (বর্তমান বাংলাদেশ) ১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার চাঁপড়া ইউনিয়নের লাহিনীপাড়া গ্রামে জন্মগহণ করেন। তার লেখাপড়ার জীবন কাটে প্রথমে কুষ্টিয়ায়, পরে ফরিদপুরের পদমদীতে ও শেষে কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়। তাঁর জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় হয় ফরিদপুরের নবাব এস্টেটে চাকরি করে। তিনি কিছুকাল কলকাতায় বসবাস করেন। সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন। মীর মোশাররফ হোসেন এর পিতা মীর মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন জমিদার। নিজগৃহে মুন্সির নিকট আরবি ও ফারসি শেখার মাধ্যমে মশাররফ হোসেনের লেখাপড়ার হাতে খড়ি হয়। পরে পাঠশালায় গিয়ে তিনি বাংলা ভাষা শেখেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় কুষ্টিয়া স্কুলে। পরে তিনি কৃষ্ণনগর কলেজিয়ট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে কলকাতার কালীঘাট স্কুলে ভর্তি হন; কিন্তু লেখাপড়া আর বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। কর্মজীবনের শুরুতে মশাররফ হোসেন পিতার জমিদারি দেখাশুনা করেন। পরে তিনি ফরিদপুর নবাব এস্টেটে চাকরি নেন এবং ১৮৮৫ সালে দেলদুয়ার এস্টেটের ম্যানেজার হন। এক সময় এ চাকরি ছেড়ে তিনি লাহিনীপাড়ায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং পরে ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় গিয়ে ১৯০৩-০৯ পর্যন্ত অবস্থান করেন। মশাররফ হোসেন ছাত্রদের সংবাদ প্রভাকর (১৮৩১) ও কুমারখালির গ্রামবার্তা প্রয়াশিকা-র (১৮৬৩) মফঃস্বল সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন। এখানেই তাঁর সাহিত্যজীবনের শুরু। গ্রামবার্তার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ ছিলেন তাঁর সাহিত্যগুরু। পরে তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী বিবি কুলসুমও এক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখেন। মশাররফ আজিজননেহার (১৮৭৪) ও হিতকরী (১৮৯০) নামে দুটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। মীর মশাররফ ছিলেন বঙ্কিমযুগের অন্যতম প্রধান গদ্যশিল্পী ও উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ।
বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার চার বছর পর মশাররফের প্রথম উপন্যাস রতœবতী (১৮৬৯) প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি একে একে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, আত্মজীবনী, পাঠ্যপুস্তক ইত্যাদি বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা হলো: গোরাই-ব্রিজ অথবা গৌরী-সেতু (১৮৭৩), বসন্তকুমারী নাটক (১৮৭৩), জমিদার দর্পণ (১৮৭৩), এর উপায় কি (১৮৭৫), বিষাদ-সিন্ধু (১৮৮৫-১৮৯১), সঙ্গীত লহরী (১৮৮৭), গো-জীবন (১৮৮৯), বেহুলা গীতাভিনয় (১৮৯৮), উদাসীন পথিকের মনের কথা (১৮৯০), তহমিনা (১৮৯৭), টালা অভিনয় (১৮৯৭), নিয়তি কি অবনতি (১৮৮৯), গাজী মিয়ার বস্তানী (১৮৯৯), মৌলুদ শরীফ (১৯০৩), মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা (দুই ভাগ ১৯০৩, ১৯০৮), বিবি খোদেজার বিবাহ (১৯০৫), হযরত ওমরের ধর্মজীবন লাভ (১৯০৫), মদিনার গৌরব (১৯০৬), বাজীমাৎ (১৯০৮), আমার জীবনী (১৯০৮-১৯১০), আমার জীবনীর জীবনী বিবি কুলসুম (১৯১০) ইত্যাদি। তাঁর অমর কীর্তি বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসে কারবালার বিষাদময় ঐতিহাসিক কাহিনী বিবৃত হয়েছে। তবে অনেক ঘটনা ও চরিত্র সৃষ্টিতে উপন্যাসসুলভ কল্পনার আশ্রয়ও নেওয়া হয়েছে। তাঁর জমিদার দর্পণ নাটকটি ১৮৭২-৭৩ সালে সিরাজগঞ্জে সংঘটিত কৃষক-বিদ্রোহের পটভূমিকায় রচিত। উনবিংশ শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ট মুসলিম সাহিত্যিক রুপে খ্যাত ‘বিষাদ সিন্ধুর’ অমর লেখক মীর মশাররফ হোসেন সৈয়দ সা’দুল্লাহ-মীর উমর দরাজ-মীর ইব্রাহীম হোসেন-মীর মোয়াজ্জম হোসেন-মীর মোশাররফ হোসেন। তাঁর পূর্ব পুরুষ সৈয়দ সা’দুল্লাহ বাগদাদ থেকে প্রথমে দিল্লিতে এসে মোগল সেনা বাহিনীতে চাকুরী গ্রহন করেন। পরে তিনি ফরিদপুর জেলার স্যাকরা গ্রামে আগমন করে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ কন্যার পানি গ্রহন করে রাজবাড়ী জেলার পদমদী গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করেন। বাংলাদেশের ঐতিহ্য অনুসারে গর্ভাবস্থায় মহিলারা মাতা-পিতার বাড়িতে চলে যায়। তার-ই ধারাবাহিকতায় মীর মশাররফ হোসেন মাতৃগর্ভে থাকাবস্থায় তাঁর মাতা দৌলতন নেছাকে নিয়ে মীরের পিতা মোয়াজ্জেম হোসেন কুষ্টিয়া শহর থেকে তিন মাইল পূর্ব গড়াই ব্রিজের নিকট লাহিনীপাড়া গ্রামে অর্থাৎ মীরের মাতামহের নানা বাড়ি চলে যায়। মীরের পিতামহের মতোই মাতামহও ছিলেন খুই সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যক্তি।  মীর মশাররফ হোসেন বাল্যকালে প্রথম গৃহে পরে গ্রামের জগমোহন নন্দীর পাঠশালায় লেখাপড়া আরম্ভ করেন। এরপর অল্পকিছুদিন কুমারখালী এম এন স্কুল, কুষ্টিয়া হাই স্কুলে পড়াশুনা করেন। ১৮৬০ সালে মীর মশাররফের মা দৌলতুন্নেসা মারা যান।  মায়ের মৃত্যুর পর মীর নিজ বাড়ি রাজবাড়ী জেলার পদমদী গ্রামে ফিরে আসেন এবং পদমদী হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা করতে থাকেন। পরে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। সেই সময় মীরের বয়স ছিলো মাত্র ১৩ বছর। এ বয়সেই তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই তাঁর উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখে গেছেন। গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ ও ধর্ম বিষয়ক প্রায় ৩৭টি বই রচনা করে গেছেন। এরমধ্যে রতœাবতী, গৌরী সেতু, বসন্তকুমারী, নাটক জমিদার দর্পণ, সঙ্গীত লহরী, উদাসীন পথিকের মনের কথা, মদীনার গৌরব, বিষাদসিন্ধু বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য রচনার পাশাপাশি তিনি কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন। প্রথমে তিনি কাঙাল হরিণাথ মজুমদারের সাপ্তাহিক গ্রামবার্তা প্রকাশিকা পত্রিকা ও কবি ঈশ্বরগুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় কিছুদিন কাজ করেন। এরপর ১৮৮০ সালে তিনি নানা বাড়ী এলাকা লাহিনীপাড়া থেকে ‘হিতকরী’ নামের একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। মীরমশাররফ হোসেন বিবাহের পর নানা বাড়ী লাহিনীপাড়া থেকে ১৮৭৪ সালে প্রথম স্ত্রীর নামে আজিজন নেহার নামক একখানি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সামান্য কয়েক মাস পর পত্রিকাখানি বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৯০ সালে তিনি পুনরায় লাহিনীপাড়া থেকে হিতকরী নামে একখানি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকার কোথাও সম্পাদকের নাম ছিলো না। হিতকরীর কয়েকটি সংখ্যা টাঙ্গাইল থেকেও প্রকাশিত পয়েছিলো। মীর একখানি (রবেনা সুদিন কুদিন কয়দিন গেলে) বাউল গান লিখে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউল দলের সদস্য হন। মশা বাউল ভণিতায় তিনি কয়েকখানি উতকৃষ্ট বাউল সংগীত রচনা করেছিলেন। সংগীত সম্বন্ধে মীরের বেশ ভালো জ্ঞান ছিলো। তাঁর সংগীত লহরীতে বিভিন্ন তালের অনেকগুলি উতকৃষ্ট সংগীত আছে। মীর মশাররফ হোসেন উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। তাঁর প্রথম জীবনীকার ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় তাঁকে বাংলা সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংগে তুলনা করেছেন। মীর মশাররফ হোসেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্রপাধ্যায়ের সংগে তুলনা করা হলেও অসঙ্গত হয় না। তাঁর গদ্যরীতি ছিলো বিশুদ্ধ বাংলা যা তদানীন্তনকালে অনেক বিখ্যাত হিন্দু লেখকও লিখতে পারেননি। তবে তাঁর পদ্যনীতি প্রায় সবই অনুকৃতি ও কষ্টকল্প রচনা বলে তেমন সমাদার পায়নি। তিনি ‘জমিদার দর্পন’ নাটক লিখে তদানীন্তনকালে অন্যতম শ্রেষ্ট নাট্যকারের মর্যদা লাভ করেন। এ নাটকখানির কাহিনী, সংলাপ, চরিত্র চিত্রণ ও নাটকীয়তাগুণে দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণের চেয়ে অনেকাংশে শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করে। কৃষক বিদ্রোহে উস্কানী দেওয়ার ভয়ে বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শন পত্রিকায় নাটকখানির প্রকাশ ও অভিনয় বন্ধের সুপারিশ করেছিলেন। মশাররফ হোসেন গতিশীল গদ্য রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। নাটক ও আত্মজৈবনিক উপন্যাসগুলিতে তিনি সমকালীন সমাজের অসঙ্গতি ও সমস্যার ওপর তীক্ষè কটাক্ষপাত করেন। তিনি সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে মুক্ত ছিলেন। উদার দৃষ্টিকোণ থেকে ‘গোকুল নির্মূল আশঙ্কা’ প্রবন্ধ লিখে তিনি স্বসমাজ কর্তৃক নিগৃহীত হন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মীর মশারফ হোসেনের পূর্ব বাংলা গদ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য মুসলমান সাহিত্যসেবী দেখা যায় না। তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা ‘বিষাদসিন্ধু’ হলেও বাংলা নাটকেও অবদান কম নয়। মুসলমানদের মধ্যে তিনিই প্রথম নাট্যকার। তাঁর প্রথম নাট্য-রচনা ‘বসন্তকুমারী নাটক’ ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত হয়। মুসলিম নাট্যকার রচিত প্রথম নাটক হিসেবে এর গুরুত্ব বিদ্যমান। মীর মশারফ হোসের দ্বিতীয় নাটক ‘জমিদার দর্পন’। এটি তাঁর সবচেয়ে উজ্জল ও বস্তুনিষ্ঠ নাটক। ১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত বাংলার প্রথম গণমুখী নাটক ‘নীলদর্পন’। এতে মাটি সংলগ্ন মানুষের প্রকৃত সংলাপ রূপায়িক হয়েছে। একই সূত্রে রচিত মীর মশারফ হোসেনের ‘জমিদার দর্পন’। ‘জমিদার দর্পন’ নাটকের কাহিনী সরল ও আড়ম্বহীন। নারীলোভী এব জমিদার এবং সুন্দরী পতœীর অসহায় কৃষক স্বামীর প্রসঙ্গ এ নাটকের কাহিনীর মূল অংশ। জমিদার শ্রেণীর চরিত্র, তোষামোদের ছলচাতুারি, চাষা আবু মোল্লা এবং তার পতœী নুরন্নেহারের নির্যাতন প্রভৃতি নিয়ে ‘জমিদার দর্পন’ অতি বাস্তব ধর্মী নাট্যকর্ম। এ নাটকেও নটনটী আছে, গান আছে। বিচারালয়ে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট, ডাক্তার, দেশি দারোগা, পেশকার ইত্যাদি সমন্বয়ে যে নৈরাজ্য চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, তা বাস্তবতার দিক থেকে অতুলনীয়।  আধুনিক যুগের মুসলিম বাংলা সাহিত্যিকদের প্রথম সারির সর্বাগ্রগণ্য ব্যক্তি ছিলেন মীর মশাররফ হোসেন। তিনি সেকালের খ্যাতনামা সাহিত্যিক বঙ্কিম চন্দ্রের কনিষ্ঠতম সমসাময়িক লেখক ছিলেন। বহু প্রতিভার অধিকারী, মানবদরদী, সমাজহিতৈষী মীর মোশারফ হোসেন বাংলার মুসলমান সমাজে আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্য ধারার সূচনা করেন। আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাহিত্যকদের অগ্রদূত ও বাংলা গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ হিসাবে তাঁকে গণ্য করা হয়। মীর মশাররফ হোসেন তাঁর বহুমূখী প্রতিভার মাধ্যমে উপন্যাস, নাটক, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে তিনি তাঁর রচনাবলীর বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে রূপদান করেছেন।
বিষাদ-সিন্ধু কিংবা জমীদার দর্পণের মতো ধ্রুবদী-সাহিত্যের স্রষ্টা মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) উনিশ শতকের এক গুরুত্বপূর্ণ লেখক। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম-প্রয়াসের সার্থক সূচনা তাঁকে দিয়েই। সব্যসাচী শিল্পীব্যক্তিত্ব মশাররফ ছিলেন নব্য-উত্থিত মুসলিম মধ্যশ্রেণির প্রধান সাংস্কৃতিক মুখপাত্র। মুক্ত মন, উদার শিল্পদৃষ্টি, সমাজমনস্কতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁর জীবন ও সাহিত্যচর্চায় যেমন,সাময়িকপত্র-পরিচালনার ক্ষেত্রেও তেমনই প্রতিফলিত হয়েছে। মশাররফের সাহিত্যজীবনের সঙ্গে তাঁর সাংবাদিকতা-কর্ম ও সাময়িকপত্র-সম্পাদনার যোগসূত্র অত্যন্ত গভীর। সাহিত্যের মতো সাময়িকপত্র-প্রকাশনার মুসলিম-উদ্যোগের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা পথিকৃতের। সাময়িকপত্র-সম্পাদনা, প্রকাশনা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানের আদিপর্বের উদ্যোগ ও অবদান সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে ওই সমাজের আধুনিক যুগের সাহিত্যচর্চার সূচনার ইতিহাসটিও স্মরণে রাখতে হয়। সাহিত্যের মতো সাময়িকপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রেও বাঙালি মুসলমানের বিলম্বিত আত্মপ্রকাশ ঘটে। তার কারণও ওই একই সূত্রে গাঁথা। বাঙালি মুসলমানের প্রয়াসের ক্ষেত্রে মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত-পরিচালিত আজিজন নেহার ও হিতকরী পত্রিকার বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য আছে। এই দুটি আঞ্চলিক পত্র কল্যাণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, জনসচেতনতা সৃষ্টি ও গ্রামীণ মানুষের স্বার্থরক্ষায় যে উদ্যোগ-গ্রহণ ও ভূমিকা-পালন করেছে, তা সমকাল ও উত্তরকালের কোনো কোনো পত্র-পত্রিকার আদর্শ ও প্রেরণা হতে পেরেছিলো। নিরপেক্ষ ও সৎ-সাংবাদিকতা, লোককল্যাণের প্রয়াস, পল্লি-উন্নয়নের চিন্তা, সম্প্রদায়নির্বিশেষে সমদর্শী-দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বাধীন মতপ্রকাশে নির্ভীকতা আজিজন নেহার ও হিতকরী পত্রিকা ও এর স্বত্বাধিকারী-পরিচালক মীর মশাররফকে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে। বাংলার মুসলমান সমাজে আধুনিক সাহিত্য ধারার সূচনা করেছিলেন মীর মশাররফ। আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাহিত্যিকদের অগ্রদূত ও বাংলা গদ্যের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে নাটক, উপন্যাস, প্রহসন, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন তিনি। মীর মশাররফ হোসেন বাংলা সাহিত্যের এক বিদগ্ধ প্রতিভা। জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে বর্ণাঢ্য সৃজনে তাঁর সকল রচনাবলীতে শৈল্পিক আঙ্গিকে রূপদান করেছেন বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান এই পুরুষ। তিনি একাধারে ছিলেন কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, জীবনীকার ও শ্রেষ্ঠ সমাজ সচেতন ব্যক্তি। মীর মশাররফ হোসেন মুসলিম বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাসিক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুসলমান গদ্যশিল্পী। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ গ্রন্থে তাঁর এই পরিচয় সুস্পষ্ট। আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও এবং সাধারণ গ্রামীণ পরিবেশে জীবন-যাপন করেও সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে তিনি যে গভীর জ্ঞান, অন্তর্দৃষ্টি ও নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন তা একান্তই দুর্লভ। শুধু সৃষ্টিশীল সাহিত্য কর্মই নয়। মীর মশাররফ হোসেন আজিজুন নিসা ও ‘হিতকরী’ নামে দুটি মাসিক পত্রিকাও সম্পাদনা করেন। বহুমুখী সাহিত্য প্রতিভার অধিকারী হলেও মীর মশাররফ হোসেনের মৌলিকত্ব ও কৃতিত্ব প্রধানত গদ্যশিল্পী হিসেবে। মীর মশাররফ হোসেন ১৯১১ সালে ১৯ ডিসেম্বর দেলদুয়ার এস্টেটে ম্যানেজার থাকাকালেই সৈয়দ পরলোকগমন করেন। তাঁকে পদমদীতে দাফন করা হয়।

-লেখক : গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট