রবিবার,১৭ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

২০ সালে বিশ্ব ভ্রমণ

মুক্তখবর :
জানুয়ারি ৫, ২০২১
news-image
তানিয়া সুলতানা হ্যাপি
বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুইপা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশির বিন্দু।।
জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে এসে  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত এই কবিতাটি মনন-মানসে উপলুব্ধ  হচ্ছিল বারবার। পরিচিত জনেরা জানেন আমি কতটা ঘরকুনো।  আর একটু দূরের বন্ধুবান্ধব মানে যারা আমাকে রাজনৈতিক কর্মসূচী কিংবা ফেইসবুক বা অন্য কোন মাধ্যমে চিনেন তারা দেখেন আমি কতটা ছুটে চলা মানুষ। কাজের প্রয়োজনে কোথাও গেলে সেখানে একটা জার্নি হয়েই যায়। তবে আমার কাছে ট্যুর মানে হলো একেবারেই ঘুরাঘুরির জন্য  ঘর থেকে বের হওয়া । যাকে বলে ব্যাগপ্যাক ট্রাভেলার। প্যারাময় জীবন থেকে কিছুটা অবসাদ নেয়ার জন্য ঘুরতে যাওয়া। মুক্তমনে ঘুরে বেড়ানো। ব্রেইন রিচার্জ করা। আগামী দিনে উদ্যম নিয়ে কাজের স্পৃহা খুঁজা।
ভ্রমণকণ্যা শুধুমাত্র মেয়েদের নিয়ে ঘুরাঘুরির সংগঠন।  যদিও তারা আরো অনেক কাজ করে থাকে। দেশে বা দেশের বাইরে  শুধুমাত্র নারীদের নিয়ে ঘুরতে গিয়ে সংগঠনটি ইতিমধ্যে বেশ সুনাম অর্জন করেছে।  তাদের ইভেন্টের সাথে আমার সময় ও সুযোগ ম্যাচ করলে আমি প্রায়ই তাদের সাথে ঘুরতে যাই।
২০২০ সাল কে আমি ভ্রমণবর্ষ হিসেবে পরিকল্পনায় রেখেছিলাম।  ইচ্ছে ছিলো পুরো বাংলাদেশের সৌন্দর্য উপভোগ করবো কাজের মাধ্যমে। ভ্রমণবর্ষে অবশ্য ডেল কার্নেগীর মতামতটা আমলে নিয়ে পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি বলেছিলেন – ঘুরতে যাও কিন্তু সাথে কাজ রেখো। অনেকটা রথদেখা আর কলা বেচার মতো। কি কাজের পরিকল্পনা করেছিলাম সেটা আরেকটু পর বলছি…..
ভ্রমণবর্ষের প্রস্তুতি হিসেবে ২০২০ সাল আসার পূর্বেই ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর অংশ নিয়েছিলাম বাংলাদেশ ভারত ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগে। দুই দেশের ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগের ভেন্যু ছিল কক্সবাজারের ইনানী বীচের রয়েল টিউলিপ রিসোর্টে।  ৩ দিনের সফরের পুরোটা সময় কেটেছে বেশ চমৎকার। উক্ত কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন দুই দেশের সংস্কৃতিচর্চার স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, লেখক কবি- সাহিত্যিক ও সাংবাদিকবৃন্দ। ৩ দিনের ট্যুরের মাঝে অবশ্য আমি ১ দিন ঢাকায় এসে একটি জরুরি মিটিংয়ে অংশ নিয়েছিলাম। কেন মিটিংটা এতো জরুরি ছিলো, দুই দেশের ফ্রেন্ডশিপ ডায়ালগ রেখে ঢাকায় আসতে হয়েছিলো তার বিস্তারিত বিবরণ থাকবে “২০শে বিশ্ব ভ্রমণ” বইতে।
 বাংলাদেশ -ভারত ফ্রেন্ডশীপ ডায়ালগের প্রথমদিন সন্ধ্যায় হয়েছিলো ওরিয়েন্টেশন পর্ব। রিসোর্টের পাশে। রিসোর্টটি খুবই নান্দনিকসাজে সাজানো হয়েছিল। ছিলো সংগীত সন্ধ্যা, শুভেচ্ছা বিনিময় পর্ব। কনফারেন্সে কেউ কেউ পূর্ব পরিচিত ও ছিলেন। কেউ কেউ বলছিলেন কোন কোন সেশনে তিনি অংশ নেবেন।কি নিয়ে কাজ করছেন তার বর্ণনা ও দিচ্ছিলেন কেউ কেউ।  সমুদ্রের পাশে দুই দেশের মানুষের এমন মিলনমেলা সত্যি উপভোগ্য ছিলো। ৩ দিনে এতো দুর্দান্ত সময় কেটেছে যার বর্ণনা ও থাকবে “২০ শে বিশ্বভ্রমণ বইতে”।
কনফারেন্সের সমাপনী দিনে এসে ঘোষণা আসলো কনফারেন্স শেষ হলেও  অতিথিদের সম্মানে আরো দুদিনের জন্য ট্যুর প্ল্যান বর্ধিত করা হলো। সে সমস্ত প্ল্যানে আমন্ত্রিত  অতিথিদের আবারো আমন্ত্রণ জানানো হলো। একটি ছিলো স্হানীয় সংসদের আমন্ত্রণে মহেশখালীর বৌদ্ধমন্দির পরিদর্শন এবং শেষের দিনে ছিলো রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করা। আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দদের জন্য হোটেল সার্ভিস অব্যাহত থাকলো এবং তাদের বিমানের টিকিট পরিবর্তন করে দেয়া হলো।
কক্সবাজারের  মহেশখালীতে আমরা গিয়েছিলাম শীপে করে।শীপে ছিলো সংগীতের আয়োজন। সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে শীপ চলছে আর সবাই সৌন্দর্য উপভোগ করছে। কেউ কেউ সেলফি তুলছে। ৩ দিনের রুটিন সিডিউল শেষে এটি ছিলো রিলাক্স ট্যুর। শীপেই চলছিল হালকা স্ন্যাকস আর দুপুরের লাঞ্চ। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মন্দিরে প্রার্থনা করলেন। তারপর অতিথিদের ফুল আর উত্তরীয় পরিয়ে সংর্বধনা  দেয়া হলো। সেখানে ও ছিলো  সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পর্ব ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মহেশখালীর সৌন্দর্য উপভোগ, শীপে যাতায়াত, বৌদ্ধ মন্দির পরিদর্শন করা ছাড়াও ছিলো মহেশখালীর বিখ্যাত পান খাওয়া নিয়ে অনেক মজার মজার ঘটনা। প্রিয় পাঠকবৃন্দ মজার মজার  ঘটনাগুলো  জানতে বইটি সংগ্রহ করে পড়বেন কিন্তু!
২০১৯ সালে আমি quantum Graduate  কোর্স করেছি। কোর্সটি হচ্ছে জীবনচলার জন্য জ্ঞানার্জন । ৪ দিনে ৪০ ঘন্টায় কোর্সটি সম্পন্ন হয়। আমার জানা মতে বিশ্বের কোথাও এতো লম্বা সময় একসাথে কোন কোর্স পরিচালিত হয় না। এবং কোর্স ফি ও অনেক কম। বাংলাদেশের অনেক মন্ত্রী, এমপি, বুদ্ধিজীবী, আমলা, শিক্ষক- শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষসহ অনেকেই কোর্সটি করেছেন।
এই কোর্স শেষে আমি প্রো মাস্টার্স কোর্স করার জন্য আরো কিছু কোর্স করছিলাম, সেটা হচ্ছে পরকাল সম্পর্কে জানা এবং পরকালে পরম প্রভুর দয়া লাভের বিষয়াবলি সম্পর্কে আরো বিশদ  জ্ঞানার্জন করা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই কোর্সে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে নির্ধারিত বাসে উঠার পর যানবাহনের দোয়া পাঠ করার পর পরই সেবক  সবাইকে মৌন থাকার আহবান জানাবেন।  সবাই মৌন থেকেই ৩ দিনের কোর্সটি সম্পন্ন করেন। খাওয়া-ঘুম-গোসল- বিশ্রাম আর প্রার্থনা এই হচ্ছে পালনীয় বিষয়। মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না, ইশারায় ও কারো সাথে কথা বলা যাবে না। করলে কোয়ান্টায়ন নিয়ম ভঙ্গ হবে। কিছু জানার বা সমস্যা অনুভূত হলে কাগজে লিখে জানতে হবে, মুখে বলা যাবে না। অন্যসময় একটি সময় কাটে বান্দরবানের লামায় গিয়ে কোয়ান্টায়ন কোর্স করলে।
কোয়ান্টায়নের দ্বিতীয় দিন সকালে করসেবা করার সময় উপলব্ধি করেছিলাম একটা  মীরাক্কেল মর্নিংয়ের এবং আমার বাসায়  চড়ুই পাখিগুলো কেন সেসময় উড়ে উড়ে সেই সুদূরে গিয়েছিল আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে তার বর্ণনা ও পারেন “২০শে বিশ্ব ভ্রমণ” বইটিতে। বইটি সংগ্রহ করতে ভুলবেন না যেন প্রিয় পাঠকবৃন্দ !
৬ই ডিসেম্বর ২০১৯
বাংলাদেশ অটিজম স্পেশাল টিচারর্স সম্মিলিত ফোরামের সভাপতি প্রিয় ছোট ভাই জসিমের আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম কুমিল্লার কোট বাড়িতে। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের নিয়ে বিনোদনের জন্য দিনটি বরাদ্দ ছিলো। স্পেশাল বাচ্চাদের  নিয়ে এমন কোন আয়োজনে আমি প্রথমবার অংশ নেই। তাদের নিয়ে ছিলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং পুরষ্কার বিতরনী পর্ব।
দিন শেষে ফেরার পথে কুমিল্লার বিখ্যাত রসমালাই খেলাম এবং বাসার জন্য ও রসমালাই কিনলাম। এই ট্যুরে ভালোলাগার চেয়ে খারাপই লেগেছিল বেশি। স্পেশাল বাচ্চাদের সাথে তাদের পরিবার, পরিজন এবং বন্ধুবান্ধব ও অংশ নিয়েছিলেন।  যে যার মতো আশেপাশের বেশ কিছু জায়গায় ঘুরাঘুরি করতে যেতে পারলে ও স্পেশাল চাইল্ডের অভিভাবকবৃন্দ যেতে পারেন নি, তাদের প্রিয় সন্তানকে রেখে। নিয়ে যাওয়া ও সম্ভবপর ছিলো না। পাশাপাশি চললেও জীবন জগতেই কতো না ব্যবধান! কেবলই মনে হয় হায়!  বিধাতা! তুমি এই ব্যবধান কেন গড়েছো ভবেতে। জেনেছি পরকালে ও রয়েছে ব্যবধান! পরকাল ভাবতে গেলে আবার ইহকাল ছেড়ে পলায়ন করতে মন চায়!
পরের সপ্তাহ ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
বাংলাদেশ ‘ল’ কলেজ এ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সভাপতি শফিক ভাইয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম অতিথি পাখিদের দেখতে।  আমি অবশ্য আমার কাছের কিছু প্রিয় ছোট ভাই এবং এ্যামিলের বউকে ও সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। এর আগে যতবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছি ততবারই এ্যামিলের কোন না কোন প্রয়োজনেই গিয়েছি। এবারই প্রথম ঘুরতে যাওয়ার জন্য গিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি বেশ বড়। একদিনে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা আমাদের মতো অপরিচিত মানুষদের পক্ষে অসম্ভব। অতিথি পাখিদের দেখতে দেখতেই যেন আধা দিন শেষ হয়ে গেল।
পাখি দেখা শেষে এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতেই একবার দেখি আল বেরুনী হলের সামনে চলে এসেছি। এখানটাতে এসেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। ২০১০ সালের ৫ই জুলাই বিপদগামী অনুপ্রবেশকারী ছাত্রলীগের একটি অংশের গ্রুপিংয়ের জের ধরে এ্যামিলের নেতৃত্বাধীন গ্রুপকে এটাক করে। যার জন্য আজ এ্যামিলকে এই শরীর নিয়ে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।  এ্যামিলের বউকে দেখালাম এই জায়গাটাতেই এ্যামিলকে এটাক করে ফেলে দেয়া হয়েছিল।  ট্যুরটা যেন মুহুর্তেই বিষাদে পরিণত হলো। আমার কান্না ভেজা চোখে সেদিন  ট্যুরমেট অনেকের চোখই ভিজতে দেখেছিলাম।
বিজয় দিবসের দুদিন আগে ট্যুর আয়োজনটি হওয়ায় ক্যাম্পাসে ছিল রীতিমতো পতাকা উৎসব।  আমরা ও কিনেছিলাম ছোট ছোট কিছু পতাকা আর একটা বড়  পতাকা।  সাথে বাঁশের বাঁশি সহ কিছু বুবু জ্বালা বাঁশি। ঘুরাঘুরির এক পর্যায়ে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন একজন সংগীত শিল্পী। তিনি ও বাংলাদেশ “ল” কলেজ এ্যালামনাই এসোসিয়েশনের সদস্য।  এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে ভাস্কর্যের সামনে  আরো দুটো ট্যুর গ্রুপ আর আমরা একসাথে হয়ে যাওয়ায় এবং সংগীত শিল্পী, বাঁশি, পতাকা মিলে রীতিমতো একটা র‍্যালি হয়ে গেল। যেন  বিজয় র‍্যালি। আর এই র‍্যালির মধ্যস্হানে দাঁড়া করানো হলো আমাকে।  বিরাট সৌভাগ্য আমার বটে। আমাদের মতো টুরিস্টদের মধ্যে একজন ছিলেন সাংবাদিক।  তিনি আমাদের র‍্যালির  ছবি দিয়ে বেশ কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল এবং প্রথম সারির জাতীয় দৈনিক যায় যায় দিনে ও নিউজ করেছিলেন।
ডিসেম্বরের শেষ দিকে আমি টিএসসিতে গিয়ে গিয়ে “শিশু মনে শেখ হাসিনা” ও “শিক্ষার্থীদের শেখ হাসিনা” বই দুটোর পান্ডুলিপি তৈরি করতেছিলাম। লিখি আর কাটাকাটি করি। নীলক্ষেতে এসে টাইপ করাই। কিছু কিছু সময় মোবাইলে ও টাইপ করি। লেখালেখির জগতে নতুন বলে খাটতে হয়েছিল ভীষণ।
তখনই আবার শুরু হলো advance Course research on methodology. শুক্র, শনি বার ক্লাস করি। বাকি দিনগুলো বই লেখার কাজে ব্যয় করি। ১৬ সপ্তাহের জন্য অনেক ব্যস্ত হয়ে গেলাম। এদিকে লেখক হিসেবে ২০২০ সালেই আমার প্রথম বই বের হচ্ছে। মনে মনে আমার সেকি আনন্দ! কেমন যে একটা উল্লাস কাজ করছিল মনের ভিতর।
তবুও বইমেলা চলাকালীন সময়ে শেষমেশ বই বের করতে পারবো কিনা তা নিয়ে সংশয় লাগতো। নতুন লেখক হিসেবে বেশ কিছু সমস্যারও সম্মুখীন হয়েছিলাম। তারপর ও “শিশু মনে শেখ হাসিনা” বইটি ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝিতে এবং “শিক্ষার্থীদের শেখ হাসিনা” বইটি বইমেলার শেষ সপ্তাহে মোড়ক উন্মোচন করতে পেরেছিলাম। বই লেখা, বই প্রকাশ করা, রিসার্চ ক্লাস করা “মুজিববর্ষে আমরাই মুজিব” এবং “বঙ্গবন্ধুর গল্প বলি” শিরোনামে স্কুল ভিত্তিক প্রোগ্রামের জন্য  শিশুদের জন্য ডকুমেন্টারি  তৈরী করে সমগ্র বাংলাদেশের ৬৪ জেলার সাথে যোগাযোগ সমন্বয় করার প্ল্যান করাসহ,  এলাকায় ইউনিয়ন  আওয়ামী লীগের বেশ কিছু সম্মেলনে অংশ নেয়া, ঢাকা  সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার বিস্তর জার্নিতে খুবই হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। কেবলই মনে হয়েছিল আমার একটা ট্যুর প্রয়োজন।  জাস্ট একটা রিল্যাক্স ট্যুর।
তার মধ্যে ১ ফেব্রুয়ারী ২০২০ সালে  আমার একজন একনিষ্ঠ  রাজনৈতিক কর্মী প্রিয় শামীমা আপা রোড এক্সিডেন্ট করে মারা যাওয়ায় আমি বেশ মর্মাহত হয়ে পড়ি।  এদিকে  শুক্র, শনি ক্লাস তখনো চলছে।  ট্যুর গ্রুপগুলো শুক্র, শনিবার ইভেন্ট দেয়, আর তখন শুক্র শনিতে আমার একদম সময় ছিলো না ঘুরতে যাওয়ার জন্য।
বৈশ্বিক মহামারী করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে মাতম শুরু হলেও করোনা যে বাংলাদেশে ও হানা দিবে সে চিন্তা আমার মাথায় তখনো আসে নি। Democracy international কর্তৃক আয়োজিত  বিশ্ব নারী দিবস উপলক্ষে  ছায়া সংসদ বিতর্ক অনুষ্ঠানে আমাকে  অংশ গ্রহনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাই  তখন আমি ব্যস্ত ছিলাম বক্তব্যের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছিলাম গুগল করে করে। অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৪ মার্চ হোটেল ওয়েস্টিনে। ১৫ মার্চ বাড়ি গেলাম মুজিববর্ষের প্রোগ্রাম শুরু করার জন্য। বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী সনাক্ত হয় ৮ মার্চ,২০২০।
সরকারিভাবে, দলীয়ভাবে এবং  ব্যক্তিগতভাবে মানুষের ছিলো মুজিববর্ষ বরণের নানান প্রস্তুতি। আবার করোনা ভাইরাস ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার দাবি ও আসতেছিল বুদ্ধিজীবী মহলের কাছ থেকে। কারন বিশ্বের অনেক দেশেই  তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। চরম উৎকন্ঠার মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা আসলো। স্বভাবতই মুজিববর্ষের সকল প্রোগ্রাম ও স্থগিত করা হলো। তবুও এলাকায় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে জাতির পিতার জন্মক্ষণ এশার আযানের পর রাত ৮ টায় কেক কাটা এবং  আতশবাজি ফোটানো এবং ১০০টি গাছ লাগানোর মাধ্যমে কর্মসূচি পালন করে ১৮ মার্চ ঢাকাগামী এগার সিন্ধু প্রভাতি ট্রেনে ঢাকায় চলে আসলাম।
ঢাকায় এসেই দেখি আমার হোস্টেল পুরা যেন একটা বিরানভূমি।  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘোষণার সাথে সাথেই মেয়েরা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। দুটোমাত্র মেয়ে আমি আসার পর রওয়ানা হলো। আমার সহকারী মেয়েটিও চলে গেল। কাজের বুয়াকে ও ছুটি দিয়ে দিলাম দুমাসের বেতন হাতে গিয়ে।কারন তার ও তো সংক্রমণের ভয় আছে। এছাড়া তার ছোট ছোট তিনটি বাচ্চা রয়েছে। তাছাড়া আমার জন্য একজন বুয়ার ও প্রয়োজন নেই। টুকিটাকি রান্না আমি নিজেই করতে পারি।
সবাই চলে যাওয়ার পর মনে হলো কেমন যেন একটা  পরিস্থিতিতে পরলাম। কিছুই ভালো লাগতেছিল না।বাড়িতে থাকার সময় পরিবার পরিজন, আত্নীয় স্বজন, ইডেনের কলেজে থাকার সময় ও রুমে গিজগিজ করতো মেয়েরা, আর আমার হোস্টেলে ও সবসময় মেয়েরা ভর্তিই থাকে। কেবলই মনে হতে লাগছিল এতোটা একাকী কখনো হইনি আগে। কেমন যেন দম বন্ধ, দম বন্ধ লাগতেছিল।
কোভিড নাইন্টিনের কারনে যখন অনেক সময় হাতে তখন আর ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ নেই।  ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হতে লাগলো এক দেশের সাথে আরেক দেশের যোগাযোগ। দেশের ভিতরে ও ঘোষণা আসলো সাধারণ ছুটির। বাস, ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হলো। মেইল রোডে পাশে বাসা হওয়ায় সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি যেখানে অটোরিকশার টুং টুকানি শব্দ পেতাম সেখানে  বারান্দায় আসলে যেন মনে হয় একটা বিরানভূমিতে আছি। আশেপাশে কোন জন মানবই দেখা যায়। এমনকি ময়লা ফেলার ভাগাড়টাতে কুকুর গুলো ও দেখা যাচ্ছিল না।
টেলিভিশন খুললেই দেখতে পেতাম মৃত্যুর সংবাদ। করোনায় মৃত্যুর করুন কাহিনি। ফেইসবুকে ও ঢুকলেই শুধু মৃত্যুর সংবাদ দেখতে পেতাম ।  ইউরোপ, আমেরিকা, ইটালি, ফ্রান্সে মৃত্যুর হার ছিল সর্বোচ্চ। এ এক এমন রোগ, যে রোগে আপনজন কাছে আসতে পারে না, ছোঁয়াচের ভয়ে। আবার এমন ও দেখা গেল পিতামাতার লাশটা দাফন কিংবা সৎকার করার জন্য সন্তানেরা ও পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি। বাংলাদেশে ও আক্রান্তের হার বাড়তে লাগছিল।  চিকিৎসা ব্যবস্হার বেহাল অবস্থা, নেই করোনা রোগীকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করার মতো আপনজন।
নিম্ন আয়ের মানুষেরা পড়েছে আরো বেকায়দায়। সরকারি বরাদ্দ দেয়া হলেও তা  সাধারণ জনগণের দৌড় গোড়ায় পৌঁছতে বেশ সময় লাগে। যথেষ্ট সচ্ছল মানুষেরা সাধ্যমতো চাল-ডাল দিয়ে মানুষের পাশে সহায়তা করার চেষ্টা করছে। আর আমি মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারার যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম। ধন-সম্পদ নাই বলে আমার কোনদিন আফসোস হয়নি।তবে করোনা কালে এসে মনে একটু হলে ও দুঃখ অনুভব করেছি।
বৈশ্বিক মহামারী করোনা পরিস্থিতি বেড়েই চলেছে। একটা সময় এসে খুব খারাপ লাগতেছিল। করোনা আপডেট আর নিতে পারছিলাম না। তখন সিদ্ধান্ত ছিলাম টেলিভিশনে করোনা আপডেট দেখা বন্ধ করে দিবো। এবং ফেইসবুক স্কল করা ও বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু সময়টা কাটতে কিভাবে? এতো অফুরন্ত সময় কাটানোর জন্য তখন বই পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম।
বিখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের “হোটেল মে ফ্লাওয়ার” এবং যশোদা বৃক্ষের দেশে” বই পড়ে পড়ে আমেরিকা ভ্রমণ করে ফেলাম। জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ মূলত দুটো বইয়ে তুলে ধরেছেন তাঁর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের নানান অভিজ্ঞতা,  সে দেশের তার কাটানো জীবনচিত্র, ব্যাচেলর জীবনের কথা, সাংসারিক জীবনের কথা। লেখকের দ্বিতীয় কন্যার জন্মস্থান ও আমেরিকা,  সেসময়কার কিছু স্মৃতি, সে দেশের শপিং কাহিনি, গুলতেকিনের রাগ- মান অভিমান,  আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান বিশেষ করে নায়াগ্রা জলপ্রপাতের বর্ণনা ও দিয়েছেন চমৎকার ভাবে।
এবং নিউইয়র্কের আকাশে ঝকঝকে রোদের কাহিনীতে মূলত তিনি তুলে ধরেছেন উনার ক্যান্সার চিকিৎসা চলাকালীন সময়ের অবস্থা।  একসময় চিকিৎসকরা জনপ্রিয় এই লেখককে আশার আলো দেখিয়েছিলেন তার বর্ণনাসহ  দুটো ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে শাওনের কথা ও রয়েছে বইটিতে।
লকডাউনের সময়টাতে যেহেতু কোথাও বের হবার সুযোগ ছিলো না তাই আমি ভ্রমণ করতে না পারার কষ্টে ভ্রমণ সাহিত্যের ওপর নির্ভরতা খুঁজে নিয়েছিলাম। তখন আমি পর পর বেশ কয়েকজন জনপ্রিয় সাহিত্যিকের ভ্রমণসমগ্র পড়েছি একে একে। আর তখনই মনে হলো আরে সৈয়দ মুজতবা আলীর বিখ্যাত ভ্রমণ কাহিনি দেশে-বিদেশে কেন এখনো পড়ছি না আমি! ফেইসবুকে বইটির রিভিউ পড়লাম। রিভিউ পড়ে জানতে পারলাম বইটি আফগানিস্তান সম্পর্কে বর্ণনা আছে। স্বজাতি মজলুম হওয়ায় আফগানিস্হানের প্রতি আমাদের একটি বিশেষ ভালোবাসা রয়েছে। তাই প্লে স্টোর থেকে বইটি ডাউনলোড করলাম। বইটির প্রতি এক ধরনের আগ্রহ নিয়েই পড়া শুরু করলাম। ৭০-৮০ পৃষ্ঠা পড়ার পর ও যেন কিছু বুঝতেছি না। কিন্তু আমার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোন বই পড়া শুরু করলে তা শেষ করেই ছাড়ি। ধৈর্য্য ধরে কিছুটা পড়ার পর আমার মনে হচ্ছিল পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা আমাকে সূতোর মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমার কানের কাছে কেউ একজন স্বপ্নপুরীর গল্প বলছিল আর আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সফল ভ্রমণকাহিনীর বিস্ময়কর লেখক সঞ্জীব চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের “পালামৌ” ভ্রমণের ওপর ভিত্তি করে রচিত। নানাদিক থেকে বইটি বাংলা ভাষার অন্যতম উজ্জ্বল রচনা। সঞ্জীব চন্দ্রের প্রতিভার প্রতি উৎসাহী রবীন্দ্রনাথ বইটি ভারসাম্য মধুর মূল্যায়নের ভেতর দিয়ে বইটির অনন্য সাধারণত্বের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন।বইটির মধ্যে দুর্বলতা, অসংলগ্নতা বা ঊষর অংশ নেই এমন নয়,কিন্তু যেসব জায়গায় বইটি ভালো, সেসব অংশ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে আলোকিত অংশগুলোর সমকক্ষ।  বাংলা ভাষার অনেক স্মরণীয় বর্ণনা বা উক্তি যেমন ‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’- জাতীয় লোকশ্রুত বাক্যের সাক্ষাৎ আমরা পাই এই বইয়ের পৃষ্ঠাতেই।
অনলাইন গ্রুপ পেন্সিল থেকে হোমায়রা কণার সাথে ছয়দিনে  সিঙ্গাপুর ট্যুরটি করে পেলাম বিনে টাকায় মানে ফ্রী এমবিতে ৪২ মিনিটে। জানলাম সিঙ্গাপুরের যোগাযোগ ব্যবস্হা, উনি কেন এই সফরে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, সেদেশের খাদ্যাবাস, ভিনদেশ ট্যুর
মেটদের সাথে তার সম্পর্ক, হোটেল ব্যবস্হাপনা ট্যুর অভিজ্ঞতার চমৎকার বর্ণনা। এবং হোমায়রা কণার লেখা পড়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ভ্রমণ করলাম।
হুমায়ুন কবির ঢালীর “জার্নির টু তাজমহল’ পড়ে পড়ে প্রেমের সমাধিসৌধ তাজমহল পরিদর্শন করে এলাম।
এছাড়াও ভ্রমণ সাহিত্য পড়ে পড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত এবং নেপাল তো ও ভ্রমণ করলামই।  দূর দেশ জার্মান, সুইজারল্যান্ড ও ভ্রমণ করে নিলাম। এবং মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের দিদার লাভের আশায় ওমরা হজ্জ্ব ও আদায় করে নিলাম।
ভ্রমণ কাহিনি পড়ার মজাটা এখানেই।। পড়ার বর্ণনাতে লেখকের সাথে সাথে পাঠক ও ভ্রমণ করতে পারেন, একদম কোন ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই। শুধুমাত্র আপনাকে  ভ্রমণ বিষয়ক বই কিনতে হবে অথবা প্লে স্টোর থেকে ভ্রমণ বিষয়ক বই ডাউনলোড করে পড়লেই চলবে।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ,
এতোক্ষণ আপনাদের শোনালাম বিখ্যাত লেখকদের বই পড়ে আমি যেভাবে ঘরে বসে বিশ্ব ভ্রমণ করলাম।৷ আমি যেহেতু ভ্রমণ  করতে পছন্দ করি, ভ্রমণ সাহিত্য পড়তে ভালোবাসি এবং লিখতে ভালোবাসি তাই আপনাদের আহবান করবো আমার লেখা  ভ্রমণ কাহিনিটি  পড়তে। আমার লেখা ভ্রমণ কাহিনিটি আপনাদের কেমন লাগলো আমাকে জানাবেন কিন্তু।
-লেখিকা 
সহ তথ্য ও গবেষনা সম্পাদক 
বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগ
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ