রবিবার,১৮ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

দেশের আলুর বাম্পার ফলন হলেও কাঙ্খিত সুফল পাচ্ছে না কৃষক

মুক্তখবর :
ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১
news-image

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ (মুক্তখবর রিপোর্ট) : ধারাবাহিকভাবেই দেশে আলুর বাম্পার ফলন হচ্ছে। চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবছর প্রচুর আলু উদ্বৃত্ত থাকলেও দেশের অর্থনীতি ও কৃষকরা তা থেকে কাক্সিক্ষত সুফল পাচ্ছে না। কারণ দেশে বাণিজ্যিকভাবে আলুর বহুমুখী ব্যবহার নেই। আর রপ্তানির ক্ষেত্রে যে ধরনের আলুর চাহিদা রয়েছে এখনো তার উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে আলুর বাম্পার ফলনেও দাম না পাওয়ায় অনেক সময় তা কৃষকদের গলার ফাঁসে পরিণত হয়। যদিও গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত আলুর দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও এখন তা নি¤œমুখী। বর্তমানে কৃষক পর্যায়ে প্রতি মণ আলু মাত্র ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে এক কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যা গত বছরের প্রকৃত উৎপাদনের চেয়ে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টন বেশি। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ৯ লাখ ১৭ হাজার টন। দেশে বছরে আলুর চাহিদা মাত্র ৭৭ লাখ টন। অর্থাৎ বছরে ২৬ থেকে ৩৭ লাখ টন আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাচ্ছে। আর বছরে রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টন। কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এদেশে উৎপাদিত আলুর রপ্তানি এবং শিল্পে ব্যবহার উপযোগী গুণাবলি না থাকায় তার বহুমুখী ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে একদিকে চাষী পাচ্ছে না ন্যায্যমূল্য, অন্যদিকে দেশ হারাচ্ছে বিশাল রপ্তানি ও শিল্পবাজার। আলু ক্ষেত থেকে তোলার পর পরিস্কারের জন্য বাংলাদেশের কোথাও ওয়াশিং মেশিন নেই। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও আলু নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। আর কৃষকের রোগমুক্ত আলু উৎপাদনের জন্য পদ্ধতি জানা নেই। যদিও বিগত ২০০৭ সালে দেশে বেশি করে আলু খান, ভাতের ওপর চাপ কমান শ্লোগানে সরকার খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহার বাড়াতে নানা প্রচার কার্যক্রম হাতে নিয়েছিল। কিন্তু ওই প্রচারণা টেকেনি বেশিদিন। অথচ পৃথিবীর ৪০টির বেশি দেশে প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় আলু। বিদেশে আলু থেকে প্রস্তুত মুখরোচক খাদ্য বহুমূল্যে বিক্রি হয়। অথচ বাংলাদেশে আলুর তেমন বহুমুখী ব্যবহার নেই। যদিও বিশেষজ্ঞরা উদ্বৃত্ত আলু কাজে লাগাতে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি ত্রাণ কার্যক্রম, রেশনিং, ভিজিএফ কার্ড ও কাবিখা কর্মসূচিতে চাল কমিয়ে আলুর পরিমাণ বাড়ানোর কথা বলছেন।
সূত্র জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বছরে গড়ে ৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের আলু আমদানি হয়। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিবছর গড়ে আলু রপ্তানি করে মাত্র ৯ লাখ ডলার আয় করে। মোট উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ আলু রপ্তানি হচ্ছে। আর মোট উৎপাদনের মাত্র ২২ শতাংশ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করা যায়। ফলে বেশিরভাগ আলুর গুণগত মান ঠিক থাকে না। বাংলাদেশে উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল বিদেশি আলুর জাত আছে প্রায় ৮০টি। তবে বাংলাদেশে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আলুচাষের পবণতা কম। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গত বছর তারা আলুর উৎপাদন খরচ ঠিক করেছিল কেজিপ্রতি ৮ দশমিক ৩২ টাকা এবং পরে বাজারে বিক্রির জন্য গড় দাম ২১-২২ টাকা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। তার পরও প্রতিবছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে উৎপাদন মৌসুমে আলুর দরপতন ঘটে। মূলত দেশে যে হারে আলুর উৎপাদন বাড়ছে, সে অনুযায়ী তার বহুমুখী ব্যবহার ও রপ্তানির ব্যবস্থা না থাকায় কৃষককে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, আলু উৎপাদনে কৃষকের দুঃখ দূর করতে কৃষি মন্ত্রণালয় রপ্তানি ও শিল্পে ব্যবহারযোগ্য এবং আগাম জাতের আলু চাষে জোর দিচ্ছে। সেজন্য ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদি ৫৯৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় নীলফামারীর ডোমারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) খামারে আগাম জাতের, উচ্চ ফলনশীল, রপ্তানি ও শিল্পে ব্যবহার উপযোগী আলু এবং আলুবীজের চাষ হচ্ছে। ওই খামারে ৫১৬ একর জমির মধ্যে আলু চাষের উপযোগী ৩১০ একর। চলতি ২০২০-২১ উৎপাদন বর্ষে ২৫৬ একর জমিতে বীজ আলু উৎপাদন হয়েছে। মূলত রপ্তানিমুখী ও শিল্পনির্ভর জাত, উন্নত জাতের আলুর বীজের সংকট, আলুর রোগ, পর্যাপ্ত অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবরেটরি না থাকা, পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও কৃষিজ্ঞানের অভাবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত পরিমাণ আলু রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন ও সংরক্ষণাগারের অভাবে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। এবার এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৮-৯ টাকা। কৃষক পর্যায়ে এর নিচে দাম নামলে চাষিদের লোকসান গুনতে হবে।
এদিকে কৃষকরা বলছে, কিছুদিন আগে আলু ২৬ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও এখন ৭-৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতি মণ আলু মাত্র ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। আর কিছুদিন পর ব্যাপারিরা এক কেজি আলু ৪ টাকায়ও নেবে না। হুজুগে সবাই এবার আলুচাষ করলেও কোল্ডস্টোরে রেখে জমি বেচে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্টদের মতে, মানসম্পন্ন বীজ আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ এবং কৃষক পর্যায়ে বিতরণ জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় ভিত্তি বীজ আলু উৎপাদন হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ২৮টি জোনে চুক্তিবদ্ধ চাষির মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে বীজ আলু উৎপাদন হচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে বারি উদ্ভাবিত মিউজিকা, সাগিতা, জার্মানি থেকে আনা আগাম জাত সানশাইন, প্রাডা, কুইন অ্যানি, ডোনাটা, সানতানা, লাবেলাসহ বেশকিছু জাত। অতীতে বিদেশ থেকে বীজ আমদানি করা হতো। বর্তমানে বিএডিসি জৈবপ্রযুক্তি তথা টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে বীজ আলুর উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। গত বছর বিএডিসি আমদানীকৃত ১৯ জাতের মধ্য থেকে ট্রায়ালের মাধ্যমে রপ্তানিযোগ্য ও শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী ১০টি জাত নির্বাচন করা হয়। এ বছর সারাদেশে ৩০০টি প্রদর্শনী প্লট ও মাল্টিলোকেশন টেস্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২০-২১ উৎপাদন বর্ষে বিভিন্ন মানের ৩৭ হাজার ৫০০ টন বীজ আলু এবং পাঁচ হাজার টন রপ্তানি উপযোগী আলুসহ সর্বমোট ৪২ হাজার ৫০০ টন আলু উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি যন্ত্রের ব্যবহার ও কৃষকদের প্রশিক্ষণও চলছে। তাছাড়া বর্তমানে সারাদেশে ২৮টি জোনের ৩০টি হিমাগার রয়েছে, যার বর্তমান ধারণক্ষমতা মোট ৪৫ হাজার ৫০০ টন। ওই প্রকল্পের মেয়াদে ২ হাজার টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৪টি হিমাগার নির্মাণ করা হবে। ফলে বিএডিসির বীজ আলুর সংরক্ষণক্ষমতা উন্নীত হবে ৫৩ হাজার ৫০০ টনে। এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে বীজ আলু উৎপাদন ৬০ হাজার টনে উন্নীত করা হবে। এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানান, বাংলাদেশে আলুতে পানি থাকে ৮০-৮২ শতাংশ। ইউরোপের দেশগুলোতে আলুতে পানির পরিমাণ সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। তাছাড়া ইউরোপের বাজারের সঙ্গে এদেশে আলু তোলার টাইমিং ঠিক নেই। সেজন্য আগাম চাষ বাড়াতে হবে। বর্তমানে আলুর অনেকগুলো জাত আনা হয়েছে, যেগুলোতে পানি থাকবে ২০ শতাংশেরও কম। ওই জাত জনপ্রিয় করা গেলে রপ্তানিও সহজ হবে।