বুধবার,১৪ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় মুসলমানদের অবদান

মুক্তখবর :
মার্চ ২১, ২০২১
news-image

চিকিৎসাশাস্ত্রের স্বর্র্ণসময় রচিত হয় মধ্যযুগে মুসলমান শাসক ও বিজ্ঞানীদের কল্যাণে।মধ্যযুগে হাসপাতালকে বলা হতো ‘বিমারিস্থান’। এটি ফারসি শব্দ। অর্থ রোগীর স্থান। চিকিৎসাশাস্ত্রে ইবনে সিনা, আল-বেরুনি, আত-তাবারি, আর-রাজি, ইবনে রুশদ, আলী আল মাওসুলি প্রমুখের নাম ইতিহাসের পাতায় খুশবু ছড়াচ্ছে। তারা চিকিৎসাশাস্ত্রের ধারনা ও অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেছেন আল কোরআন ও হাদিস থেকে। মহানবী (সা.)-এর যুগে অসুস্থদের সেবা-শুশ্রুষা করা হতো দুভাবে। মহানবী (সা.) যুদ্ধে আহত সাহাবিদের জন্য যুদ্ধের ময়দানের অনতিদূরে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যোপযোগী স্থানে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিতেন। তাঁবু ছিল আহত অসুস্থ সাহাবিদের অস্থায়ী হাসপাতাল।

খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলমানরা চিকিৎসাসেবার জন্য স্বতন্ত্র তাঁবু স্থাপন করেন। হজরত সাদ ইবনে মুআজ (রা.) যখন যুদ্ধে আহত হন, রাসুল (সা.) তাকে এই স্বতন্ত্র তাঁবুতে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আজকের পৃথিবীর ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল ও চিকিৎসার ধারণাটি এখান থেকেই মানুষ নিয়েছে।

পরবর্তী খলিফা ও শাসকদের আমলেও ভ্রাম্যমাণ এ চিকিৎসা চালু থাকে। উমাইফা খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান (৬৪৬-৭০৫) বিপুল অর্থ ব্যয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এক বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। তখনকার সময়ের প্রথিতযশা বিজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়া হয়। রোগীর শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী পৃথক পৃথক বিভাগ ছিল। প্রতিটি বিভাগের জন্য ছিল ওই বিষয়ের পারদর্শী চিকিৎসক। তারা সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবা দিতেন। আব্বাসীয় খলিফা হারুন-অর-রশিদ (৭৬৬-৮০৯) ৮০৫ হিজরিতে ইরাকের বাগদাদে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অল্প কিছুদিনের মধ্যে তৎকালীন মুসলিম বিশে^র বিভিন্ন জায়গায় ৩০টির অধিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়।

৮৭২ সালে আহমদ ইবনে তুলুন মিসরের কায়রোতে প্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এই হাসপাতালের নাম আহমদ ইবনে তুলুন হাসপাতাল। দশম শতকে কারাগারের কয়েদিদের সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসার জন্য জেলের ভেতর ছোট হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়। হাসপাতালের নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা প্রতিদিনই বন্দিদের চিকিৎসাসেবা দিতেন। দ্বাদশ শতকে কায়রোতে ‘নাসিরি’ এবং ‘মানসুরি’ নামে দুটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়। এ সময় ইরানের রাইত শহরে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন মনীষী বিজ্ঞানী আল-রাজি।

ইসলামি শাসনামলে বাগদাদ, কর্ডোবা, দামেস্ক, কায়রোর প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ শহরে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়। শুধু স্পেনের কর্ডোবা শহরেই ছিল ৫০টির বেশি হাসপাতাল। তার মধ্যে কোনো হাসপাতাল ছিল সামরিক বাহিনীর জন্য নির্দিষ্ট। সামরিক বাহিনীর জন্য প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালের ধারণাটি মুসলমানদের। প্রখ্যাত ড. ডানল্ড ক্যাম্বল লিখেছেন, একমাত্র কর্ডোবায় ইসলামি শাসনামলে প্রায় ৫০০ চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। ‘আল জেকিরাজ’ ছিল অন্যতম। সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত রাজ চিকিৎসকরা পরিদর্শন করতেন। কার্যনির্বাহী পদ শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, অভিজ্ঞ, কৌশলী, পরিশ্রমী অনেক ইহুদি, খ্রিস্টান যুক্ত ছিল।

মুসলিম শাসনামলে ভারতবর্ষের অনেক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সুলতান নুরুদ্দিন মুহাম্মদ জংগী (মৃত্যু ১১৭৪) ছিলেন মুসলিম শাসকদের মধ্যে কীর্তিমান। তিনি দামেস্ক নগরীতে বিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থাপনা ছিল সেখানে। হাসপাতালসংলগ্ন জায়গায় তিনি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপুল বই ছিল সেখানে। বিরাট এই লাইব্রেরি এখনো আছে। হাসপাতালের নাম রাখেন তার নিজের নামেই। হাসপাতালের প্রধান মুখ্য চিকিৎসক ছিলেন আবুল হিকাম ওরফে ইবনুদ দাখওয়ার।

ভারতে মুসলিম শাসকদের মধ্যে ফিরোজ শাহ তুঘলক (শাসনামল-৭৫২ হিজরি) একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। এই হাসপাতালকে ‘সিহহতখানা’ বলা হতো। ঐতিহাসিক আবুল কাসেম ফেরেশতা লিখেছেন, সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক পাঁচটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।

আহমেদাবাদে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন সুলতান আলাউদ্দিন বিন সুলতান আহমদ শাহ বাহামানি (মৃত্যু-৭৫৭ হিজরি)। এই হাসপাতালের ব্যয়ের জন্যও সুলতানের ওয়াকফ করা জমি ছিল। ৮৪৯ হিজরিতে মালোয়ার শাসক মাহমুদ খিলজী শাদিআবাদে একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। হেকিম মাওলানা ফজলুল্লাহকে পাগলদের চিকিৎসা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুঘল বাদশাহদের মধ্যে জাহাঙ্গীর সর্বপ্রথম হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হন। গুরুত্বের সঙ্গে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন।

এভাবে ইসলামি শাসনামলে মুসলমানরা বিভিন্ন শহর ও গ্রামে মানুষের চিকিৎসা প্রদানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। রোগীদের প্রতি যথার্থ সেবা ও মূল্যায়নের দিকে অধিক গুরুত্ব ছিল। আন্তরিকতা ছিল চিকিৎসক ও প্রতিষ্ঠাতার প্রধানতম ধর্ম। মুসলিম মনীষীরা সেসব সেবাধর্মী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, আধুনিক-উত্তর পৃথিবীতে আজ তার বড় অভাব।